ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

চট্টগ্রামে পশুর হাট এবারও বিএনপির নিয়ন্ত্রণে

চট্টগ্রামে পশুর হাট এবারও বিএনপির নিয়ন্ত্রণে
×

ফাইল ছবি

চট্টগ্রাম ব্যুরো

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬ | ০১:৩৫

পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে চট্টগ্রাম নগরে মোট ১১টি পশুর হাটের ইজারা বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতারা পেয়েছেন। উপজেলার পশুর হাটগুলোর নিয়ন্ত্রণও বিএনপির নেতাদের হাতে। গত দুই বছর হাটগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বিএনপি। এর আগে এগুলো ইজারা পেতেন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
   
নগরে এবার তিনটি স্থায়ী ও আটটি অস্থায়ী পশুর হাট বসছে। অস্থায়ী হাটগুলোর মধ্যে তিনটিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়। সেগুলোর ইজারা বিএনপি-সংশ্লিষ্টরা পেয়েছেন। পাঁচটি হাট দরপত্র আহ্বান ছাড়াই বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাদের বুঝিয়ে দিয়েছে সিটি করপোরেশন। গত বছর সাতটি অস্থায়ী হাটের ইজারা দেওয়া হয়, তখনও সব পেয়েছিলেন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতারা।

গতবার ৫টি অস্থায়ী হাটের মধ্যে চারটি ইজারা দেওয়া হয়েছিল দরপত্রের মাধ্যমে। সিটি করপোরেশন সেগুলো থেকে রাজস্ব আয় করেছিল এক কোটি ৬৯ লাখ টাকা। এবার তা নেমে এসেছে ৮৯ লাখ ৩০ হাজার টাকায়। সিটি করপোরেশনের রাজস্ব আয় কমেছে ৭৯ লাখ ৬৯ হাজার টাকা। 

স্থায়ী হাটেও গত তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন রাজস্ব এসেছে এবার। সাগরিকার সবচেয়ে বড় পশুর হাটটি ২০২৩ সালে ইজারা দেওয়া হয়েছিল আট কোটি ৮৮ লাখ টাকায়। ২০২৪ সালে দেওয়া হয় ৯ কোটি ২১ লাখ টাকায়। ২০২৫ সালে প্রত্যাশিত দর না পাওয়ায় কোনো ইজারাদারই নিয়োগ দেওয়া যায়নি। আর এবার দর উঠেছে মাত্র আট কোটি আট লাখ টাকা। দুই বছর আগের তুলনায় এই দর এক কোটি ১৩ লাখ টাকা কম। হাটটি পেয়েছেন ফজলে আলিম চৌধুরী। তিনি বিএনপির সমর্থক।  

যারা পেলেন হাটের ইজারা
নগরে আটটি হাট বসানোর অনুমোদন মেলে। এর মধ্যে তিনটি হাটের জন্য ৭ মে দরপত্র বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। তবে দরপত্র ফরম জমা পড়ে দুটি হাটের জন্য। অন্য হাটে ইজারাদার পাওয়া যায়নি। পাঁচটি হাটের জন্য কোনো দরপত্র বিজ্ঞপ্তিই দেয়নি সিটি করপোরেশন। এর মধ্যে একটি হাট নতুন। ৩৯ নম্বর দক্ষিণ হালিশহর ওয়ার্ডের আউটার রিং সিডিএ বালুর মাঠ দরপত্রে অংশ না নিয়েই ৭০ লাখ টাকায় বরাদ্দ পেয়েছেন মিজানুর রহমান। তিনি ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। গত বছর এই হাট ইজারা দেওয়া হয়েছিল এক কোটি ৩০ লাখ টাকায়। ৩৭ নম্বর মধ্যম হালিশহর ওয়ার্ডের আনন্দবাজার-সংলগ্ন রিং রোডের পাশের খালি জায়গা পাঁচ লাখ টাকায় ইজারা পেয়েছেন হাসান মুরাদ। গত বছর এই হাট থেকে রাজস্ব আয় হয়েছিল ২০ লাখ পাঁচ হাজার টাকা। হাসান মুরাদ ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি। টিএসপি মাঠ ৯ লাখ ২০ হাজার টাকায় বরাদ্দ পেয়েছেন মো. পারভেজ। তিনি যুবদল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। গতবার এই হাটের ইজারামূল্য ছিল ১৩ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। হাটটি ৪০ নম্বর উত্তর পতেঙ্গা হোসেন আহম্মদপাড়া সাইলো রোডের পাশে। ৪১ নম্বর দক্ষিণ পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত-সংলগ্ন টানেলের উত্তর পাশের আলমগীর সাহেবের বালুর মাঠ পাঁচ লাখ ১০ হাজার টাকায় বরাদ্দ পেয়েছেন মো. আলমগীর। তিনি চট্টগ্রাম নগর কৃষক দলের সভাপতি। ২৬ নম্বর উত্তর হালিশহর ওয়ার্ডের গলিচিপাপাড়া বারুনিঘাটা মাঠটি এবারে নতুন হাট হিসেবে বেছে নিয়েছে সিটি করপোরেশন। সাড়ে ১২ লাখ টাকায় এটি বরাদ্দ দিয়েছে তারা হালিশহর থানা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত জসীম উদ্দিনকে। 

জসীম উদ্দিন জানান, এগুলো তাদের ব্যক্তিগত জায়গা। তাই এই হাট ইজারা না দিয়ে সিটি করপোরেশন তাদের খাস আদায়ের জন্য দায়িত্ব দিয়েছে। সিডিএ বালুর মাঠ বরাদ্দ পাওয়া মিজানুর রহমানকে ফোন করা হলেও ধরেননি তিনি। 

যা বলছে সিটি করপোরেশন 
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘গতবার হাটের জন্য কোনো ইজারাদার পায়নি সিটি করপোরেশন। এবার সেই হাট আট কোটি আট লাখ টাকা দরে ইজারা দিয়েছি। মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব থাকায় কয়েকটি হাটে দরপত্র আহ্বান করা যায়নি। রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে কেউ বাড়তি সুবিধা পায়নি।’ 

উপজেলার হাটেও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের দাপট 
কর্ণফুলী উপজেলায় এবার কোরবানির পশুর হাট বসছে মোট চারটি। সেগুলো হলো মইজ্জারটেক, ফাজিলখারহাট, ফকিরনীরহাট ও কলেজবাজার পশুর হাট। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ হাট হিসেবে পরিচিত মইজ্জারটেক সিডিএ আবাসিক পশুর হাট। ৫ আগস্ট পরবর্তী টানা দুই বছর হাটটির ইজারা পেয়েছেন বড়উঠান ইউনিয়ন বিএনপির মোহাম্মদ আলমগীর। এর আগে ১৪৩২ সালে হাটটির ইজারা নেন চরলক্ষ্যা ইউনিয়ন বিএনপি নেতা জসিম উদ্দীন জুয়েল। 

আনোয়ারা উপজেলা পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে আনোয়ারা উপজেলায় মোট ১৯টি হাটবাজার সরকারি ইজারা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বারখাইন তৈলারদ্বীপ পশুর হাট। হাটটি ইজারা দেওয়া হয়েছে প্রায় ছয় কোটি ৬৬ লাখ টাকায়। এ ছাড়া বটতলী রুস্তমহাট ৮৫ লাখ টাকা, চাতরী চৌমহনী পশুর বাজার প্রায় এক কোটি টাকা এবং মালঘর বাজার ২২ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। হাটগুলোর ইজারাদারদের মধ্যে আছেন বটতলী ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ফেরদৌস হোসেন, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সহসভাপতি জাগির সওদাগরও। তাদের দাবি, দলীয় পরিচয় নয়, সরকার নির্ধারিত দরেই বাজার ইজারা নিয়েছেন তারা। 

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম জেলার সম্পাদক আইনজীবী আখতার কবির চৌধুরী সমকালকে বলেন, ‘ক্ষমতাসীন দলের লোকরাই নামে বেনামে হাট নিয়ন্ত্রণ করছেন। এ জন্য ন্যায্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।’ 
(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন কর্ণফুলী ও আনোয়ারা উপজেলা প্রতিনিধি) 

আরও পড়ুন

×