ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

সরেজমিন: বগুড়া

মসলায় মেশানো হচ্ছে ক্ষতিকর উপাদান

মসলায় মেশানো হচ্ছে ক্ষতিকর উপাদান
×

 লিমন বাসার, উত্তরাঞ্চল

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬ | ১০:১৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

বগুড়ার মসলার বাজারে দিনে হাঁটলে নাকে লাগে মরিচ, জিরা, এলাচ আর হলুদের ঝাঁজালো গন্ধ। কিন্তু রাত গভীর হলে সেই গন্ধের আড়ালেই শুরু হয় আরেক ব্যবসা। শাটার নামিয়ে, আলো কমিয়ে শহরের বিভিন্ন মসলা মিল ও গুদামে চলে ভেজাল মেশানোর উৎসব। কোথাও মরিচের সঙ্গে ধানের তুষ, কোথাও জিরার সঙ্গে কম দামের ক্যারাসিড, আবার কোথাও কাপড়ের বিষাক্ত রং মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে চকচকে হলুদ ও মরিচের গুঁড়া। কোরবানির ঈদ সামনে রেখে বাজারে এখন ঠিক এভাবেই সক্রিয় হয়ে উঠেছে ভয়ংকর এক ভেজাল সিন্ডিকেট।

সরেজমিন দেখা গেছে, শহরের রাজাবাজার, ফতেহ আলী বাজার, বাদুড়তলা, চেলোপাড়া, মগলিশপুর, এরুলিয়া ও শাজাহানপুর এলাকায় গড়ে ওঠা ছোট ছোট মসলা মিল, গুদাম ও কারখানাকে কেন্দ্র করে চলছে এই কারবার। দিনের বেলায় যেসব মসলা মানুষ বাজার থেকে কিনে বাড়ি নিচ্ছেন, এর বড় একটি অংশের ভেতরে কী মেশানো হচ্ছে, তা সাধারণ ক্রেতার বোঝার উপায় নেই। গন্ধ, রং ও ওজন সবই কৃত্রিমভাবে ঠিক রাখা হচ্ছে।

গত বুধবার রাতে ফতেহ আলী বাজারের ছাতাপট্টিতে গিয়ে কয়েকটি মিলে ট্রলি ও ভ্যানে বস্তাভর্তি নিম্নমানের মরিচ, পুরোনো হলুদ ও বিভিন্ন গুঁড়া ঢুকতে দেখা যায়। গভীর রাত পর্যন্ত এসব মিলের ভেতর থেকে ভেসে আসে মেশিনের শব্দ, বস্তা টানাটানির আওয়াজ আর তীব্র ঝাঁজালো গন্ধ।

সেখানে এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এই মিলগুলোতে ভালো মরিচের সঙ্গে পচা মরিচ মেশায়। পরে রং দেয়। গুঁড়া করলে আর কেউ ধরতে পারে না। ঈদের সময় এই কাজ সবচেয়ে বেশি হয়।

ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুসন্ধানে পরিচয় গোপন করে দেখা মেলে সেই জোচ্চুরি। ফতেহ আলী বাজারের দোলন মসলা স্টোর ও বগুড়া হলুদ ঘর মিলে সেই সময় চলছিল নিম্নমানের হলুদ ও তুষ মেশানোর কাজ। মরিচ গুঁড়া করার আগে বস্তার ভেতরে আলাদা করে ধানের তুষ ঢোকানো হয়। পরে সব একসঙ্গে মেশিনে গুঁড়া করা হয়, যাতে আলাদা করে বোঝা না যায়। উদ্দেশ্য একটাই, ওজন বাড়িয়ে অতিরিক্ত লাভ করা। সেখানে কাজ করা এক শ্রমিক বলেন, এক বস্তা মরিচে কয়েক কেজি তুষ দিলে মালিকের লাভ অনেক বেড়ে যায়। গুঁড়া হওয়ার পর কেউ বুঝতেও পারে না। 
বগুড়া হলুদ ঘর মিলে মসলা গুঁড়া করেন প্রতিষ্ঠান মালিক কাঞ্চন। পাশের দোকান দোলন স্টোরে তাঁর ভাই সেই মসলাগুলো বিক্রি করেন। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে ভেতরে গুঁড়া করার পদ্ধতি দেখতে চাইলে দেখাতে অপারগতা প্রকাশ করেন প্রতিষ্ঠান মালিক। 

পাশের রাজাবাজারেও একই চিত্র। আল-আমিন মসলা মিল নামের একটি কারখানায় কাপড়ের রং, গোখাদ্য ও ধানের তুষ ব্যবহার করে চলছিল মসলা ভাঙানোর কাজ। প্রতিষ্ঠানটির মালিক আল-আমিন বলেন, আমরা অর্ডার নিয়ে মসলা ভাঙি। কিছু ভুলভ্রান্তি থাকলেও ভেজাল দিই না। আবার চেলোপাড়া এলাকায় কালো এলাচের বাজারেও মেলে ভয়ংকর তথ্য।
এই মিলের পাশের একজন আড়তদার বলেন, এক কেজি ভালো জিরা আর ভেজাল জিরার মধ্যে সাধারণ মানুষ পার্থক্য বুঝবে না। পরে তার কথার সূত্র ধরে শহরের বাদুড়তলা এলাকার মেসার্স আলী এন্টারপ্রাইজের একটি গুদামে জিরার সঙ্গে বালু ও পানি মিশিয়ে ওজন বাড়ানোর কাজ করার প্রমাণ মেলে। 

মসলা ব্যবসায়ী জগদীশ প্রসাদের প্রতিষ্ঠানে শুকনা এলাচে পানি স্প্রে করে ওজন বাড়ানো হয় বলে অভিযোগ করে স্থানীয়রা। প্রতিষ্ঠানের এক কর্মচারী বলেন, রাতে মোটর চালিয়ে পাইপ দিয়ে এলাচে পানি দেওয়া হয়। কয়েক ঘণ্টা পর ওজন বেড়ে যায়। এরপর ভোর হওয়ার আগেই বাজারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তবে জগদীশ বলেন, স্প্রে করার তথ্য সঠিক নয়। আমরা অনেক পুরোনো ব্যবসায়ী। গুণগত মান ঠিক রাখার চেষ্টা করি।

শহরের বাইরে সদর উপজেলার এরুলিয়া ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর এলাকায় শাহিন আলমের মসলার গুদামে গিয়ে পাওয়া যায় আরেক ধরনের কারসাজির দৃশ্য। সেখানে আমদানিকৃত দামি জিরার সঙ্গে কম মূল্যের ক্যারাসিড মিশিয়ে বাজারজাত করা হয় বলে জানান সেখানকার শ্রমিকরা। রাতের বেলায় গুদামের ভেতরে নকল মোড়ক লাগানোর কাজও চলে। গুদামের এক কর্মচারী বলেন, ক্যারাসিড দেখতে প্রায় জিরার মতোই। গন্ধও কাছাকাছি। সাধারণ মানুষ বোঝে না। কম দামের এই বীজ মিশিয়ে বাজারে ছাড়লে কয়েক গুণ বেশি লাভ হয়। তবে এ ব্যাপারে শাহিন আলম বলেন, আগে আমার অগোচরে কর্মচারীরা এই কাজ করত। এখন এসব ব্যাপারে সজাগ থাকি।

পাশের শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা ইউনিয়নের কাজীপাড়া এলাকায় আরএসি ইন্ডাস্ট্রি নামের একটি কারখানায় মসলা বাজারজাত করার আগে পচা কাঁচামাল ও বিষাক্ত টেক্সটাইল রং ব্যবহার করা হয় বলে তথ্য মেলে। 
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদের সময় চাহিদা বাড়লেই এই সিন্ডিকেট আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। কারণ, তখন মানুষ কম দামে বেশি কেনার চেষ্টা করেন। আর সেই সুযোগেই বাজারে ছাড়া হয় নিম্নমানের ও ভেজাল মসলা। আর সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ক্রেতারা। প্যাকেটজাত মসলার তুলনায় খোলা মসলা সস্তা হওয়ায় অধিকাংশ মানুষ সেগুলোই কেনে।

যেসব রং মেশানো হয়
মরিচের গুঁড়ায় মেশানো হয় ‘সুডান ডাই’ নামের রং। এটি এক ধরনের শিল্পকারখানার লাল রং। সাধারণত কাপড়, জুতা পলিশ, ওয়াক্স ও তেলজাত পণ্যে ব্যবহার হয়। মরিচের গুঁড়া উজ্জ্বল লাল দেখাতে এটি মেশানো হয়। আন্তর্জাতিক গবেষণায় এটি ক্যান্সার সৃষ্টিকারী হিসেবে চিহ্নিত। দীর্ঘদিন শরীরে গেলে লিভার ও মূত্রথলির ক্ষতি করতে পারে। ইউরোপসহ অনেক দেশে খাদ্যে এটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
এসব তথ্য দিয়েছেন বগুড়ায় দায়িত্বরত নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ রাসেল। তিনি আরও জানান, হলুদ গুঁড়া চকচকে ও গাঢ় করতে মেটানিল ইয়েলো নামের এই রং ব্যবহার করা হয়। এটি আসলে টেক্সটাইল ও কাগজ শিল্পের রং। এ ছাড়া হলুদকে আরও উজ্জ্বল ও ভারী দেখাতে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী লেড ক্রোমেট নামের রাসায়নিক ব্যবহার করে। এতে সিসা থাকে। এটি অত্যন্ত বিষাক্ত। 

যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
ক্যাব বগুড়ার সাধারণ সম্পাদক ফজিলাতুন্নেছা ফৌজিয়া বলেন, শুধু জরিমানা করে এই অপরাধ থামানো যাবে না। কারণ, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বারবার অভিযান হলেও তারা এই অসাধু কর্মকাণ্ড থেকে বের হতে পারেনি।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বগুড়ার সহকারী পরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, অনেক স্থানে মসলার বস্তার ভেতর মরা ইঁদুর, টিকটিকি ও পোকামাকড় পর্যন্ত পাওয়া গেছে। অসাধু এই সিন্ডিকেটকে শুধু জরিমানা করে থামানো যাচ্ছে না। এখন প্রয়োজনে জেল ও লাইসেন্স বাতিলের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোমেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. নাজমুল হক বলেন, মসলায় ব্যবহৃত বিষাক্ত টেক্সটাইল রং, কেমিক্যাল ও পচা উপাদান মানুষের শরীরের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘদিন এসব ভেজাল খাদ্য গ্রহণ করলে কিডনি, লিভার ও মস্তিষ্ক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ ছাড়া পাকস্থলীর জটিলতা, আলসার, শ্বাসকষ্ট, ত্বকের রোগ ও স্নায়বিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

আরও পড়ুন

×