আবু হানিফকে জীবিত ফিরিয়ে আনার দাবি মা-স্ত্রীর
কিশোরগঞ্জ সদরের গাগলাইল গ্রামে সোমবার সকালে আবু হানিফের মা ছফুরা খাতুনের কান্না। পাশে স্ত্রী শারমিন। ছবি: সমকাল
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬ | ২০:৩৩ | আপডেট: ০১ জুন ২০২৬ | ২০:৩৬
বৃদ্ধ মা ছেলের অপেক্ষায় দিন গুনছেন। পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী জানেন না– স্বামী বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন। ঘরের মানুষটি বিদেশে গিয়েছিলেন ভাগ্য বদলাতে। এখন তার খোঁজ নেই।
কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার গাগলাইল গ্রামের ২৫ বছর বয়সী আবু হানিফ এক মাস ২৩ দিন ধরে রাশিয়ায় নিখোঁজ। পরিবারের দাবি, রাজমিস্ত্রির কাজের কথা বলে তাঁকে রাশিয়ায় পাঠানো হলেও পরে রুশ সেনাবাহিনীতে যুক্ত করা হয়। গত ১৭ এপ্রিলের পর থেকে তাঁর সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।
সোমবার সকালে গাগলাইল গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, জরাজীর্ণ টিনের ঘরে বসে আহাজারি করছেন হানিফের মা ছফুরা খাতুন। আশপাশের মানুষ ও স্বজনরা তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু সন্তানের কোনো খোঁজ না পেয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে ছফুরা খাতুন বলেন, ‘আমার ছেলের কোনো খোঁজ পাইতাছি না। ছেলের বউডা পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। আমার ছেলেরে তোমরা আইনা দেও। ঋণ কইরা আট লাখ টাকা দিছি চাকরির জন্য। এখন জানিও না– বাঁচে আছে, নাকি মারা গেছে।’

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১০ বছর আগে মারা যান হানিফের বাবা সুরত আলী। দুই ছেলে, তিন মেয়ের মধ্যে হানিফ তৃতীয়। তিনি কোরআনের হাফেজ। আট মাস আগে ইটনা উপজেলার থানেশ্বর গ্রামের শারমিনকে বিয়ে করেন। বর্তমানে শারমিন পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
হানিফের ভাতিজা হারিছ মিয়া জানান, স্থানীয় এক দালাল রাজমিস্ত্রির কাজের আশ্বাস দিয়ে আট লাখ টাকার বিনিময়ে গত ৭ এপ্রিল হানিফকে রাশিয়ায় পাঠান। ১৭ এপ্রিল শেষবারের মতো পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন হানিফ। তখন তিনি জানান, তাঁকে রুশ সেনাবাহিনীতে নেওয়া হয়েছে এবং তিনি বিপদের মধ্যে আছেন। এর পর থেকে আর কোনো যোগাযোগ নেই।
পরিবারের কাছে বিদেশে পাঠানোর কোনো কাগজপত্রও নেই। কোন কোম্পানির মাধ্যমে তাঁকে পাঠানো হয়েছে বা কী ধরনের চাকরির কথা বলা হয়েছিল, তাও তারা জানেন না। অভিযুক্ত দালাল বর্তমানে পরিবারসহ আত্মগোপনে রয়েছেন বলে অভিযোগ স্বজনদের।
এরই মধ্যে কিশোরগঞ্জের দুই যুবক রিয়াদ রশিদ ও জাহাঙ্গীর হোসেন ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত হওয়ার খবর পরিবারটির উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মাঝিরকোণা গ্রামের রিয়াদ রশিদ প্রথমে একটি বেসামরিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়ে রাশিয়া যান। পরে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। গত ২ মে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় তাঁর মৃত্যু হয়। পরিবারের দাবি, তাঁর মরদেহও দেশে আনা সম্ভব হয়নি।
বাগপাড়া গ্রামের জাহাঙ্গীর হোসেন চাকরির উদ্দেশ্যে রাশিয়ায় গিয়ে পরে সেনাবাহিনীতে যুক্ত হন। গত ১৮ মে মাইন বিস্ফোরণে তাঁর মৃত্যু হয়। দরিদ্র পরিবারের এই যুবককে বিদেশ পাঠাতে ১০ লাখ টাকা ঋণ করেছিলেন তাঁর মা জাকিয়া বেগম।
এখন একই পরিণতির আশঙ্কায় দিন কাটছে আবু হানিফের পরিবারের। স্ত্রী শারমিন নির্বাক হয়ে বসে থাকেন। তাঁর একটাই দাবি– স্বামীকে জীবিত অবস্থায় দেশে ফিরিয়ে আনা হোক। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে অভিযুক্ত দালাল সোহাগ প্রথমে প্রশ্ন হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাতে বলেন। পাঠানো প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি। এক পর্যায়ে তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মাহফুজ-উল-আদিব বলেন, বৈধ সরকারি প্রক্রিয়ায় বিদেশ গেলে সংশ্লিষ্ট তথ্য সরকারের কাছে থাকে। তবে অনিয়মিত উপায়ে কেউ বিদেশ গেলে তথ্য সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ে। তারপরও যথাযথভাবে আবেদন করা হলে সরকার দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে উদ্যোগ নিতে পারে।
