‘ক্যাডা মোর ল্যাহাপড়ার খরচ দেবে?’
রাজমিস্ত্রি জাহিদুলের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁর স্ত্রী-ছেলের কান্না। গতকাল বুধবার বরগুনার আমতলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সমকাল
আমতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ | ০৭:৫৬ | আপডেট: ০৪ জুন ২০২৬ | ০৮:০২
| প্রিন্ট সংস্করণ
বরগুনার আমতলীতে নবনির্মিত ভবনের সেপটিক ট্যাঙ্কের সেন্টারিং খুলতে গিয়ে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল বুধবার সকালে আমতলী পৌরসভার দুই নম্বর ওয়ার্ডে এই দুর্ঘটনা ঘটে। এতে মারা যাওয়া ব্যক্তিরা হলেন– রাজমিস্ত্রি জাহিদুল ইসলাম হাওলাদার (৪২) এবং ওয়ার্কশপ মালিক জাফর হাওলাদার (৪৫)।
গতকাল দুপুরে এ দুজনের স্বজনদের পাওয়া যায় আমতলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে। সেখানে কাঁদতে কাঁদতে জাহিদুলের মাদ্রাসাপড়ুয়া ছেলে কাসেম (১১) বলছিল, ‘মুই এহন কারে আব্বা কইয়া বোলান দিমু? ক্যাডা মোর মাদ্রাসায় ল্যাহাপড়ার খরচ দেবে?’
জাহিদুল হলদিয়া ইউনিয়নের হলদিয়া গ্রামের আব্দুল আজিজ হাওলাদারের ছেলে। তাঁর আয়েই স্ত্রী কোহিনূর বেগম, দুই ছেলে কাসেম ও হাসেমের (৭) খরচ। জাহিদুলের আকস্মিক মৃত্যুতে মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে কোহিনূরের। তিনি বিলাপ করতে করতে বলছিলেন, ‘দুই পোলা লইয়া মুই এহন ক্যাম্মে সংসার চালামু? ওগো খাওয়ামু কি?’
এ দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া ওয়ার্কশপ মালিক জাফর হাওলাদার চাওড়া ইউনিয়নের গিলাতলী গ্রামের মৃত ইউনুছ হাওলাদারের ছেলে। জাফরের ছেলে সজীব ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। হাসপাতালে সজীব বলেন, ‘মোর বাহে দোকান দিয়া মোগো তিন ভাই-বোনেরে ল্যাহা পড়া করাইছে। এহন হেয় মইর্যা যাওয়ায় মোরা এহন কি দিয়া ল্যাহা পড়া করমু?’
ওয়ার্কশপ করতে গিয়ে নানা এনজিও থেকে ঋণ করতে হয়েছে জানিয়ে জাফরের স্ত্রী ছকিনা বেগম বলেন, ‘সংসার চালাইতে যাইয়া ব্যামালা দেনা অইছে। এহন (স্বামী) মইর্যা যাওয়ায় কি দিয়া মোরা দেনা দেব? আর কি কইর্যা মোরা খামু?’ বলতে বলতেই মূর্ছা যান তিনি।
দুজনের স্বজনের আহাজারি দেখে হাসপাতালে উপস্থিত অনেকেই চোখ মোছেন। আমতলী থানার ওসি আবু শাহাদৎ মো. হাসনাইন পারভেজ বলেন, দুজনের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ ও এলাকাবাসী জানায়, আমতলী বন্দর হোসাইনিয়া ফাজিল মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ মাওলানা মো. ইউসুফের নতুন ভবনে রাজমিস্ত্রির কাজ করছিলেন জাহিদুল হাওলাদার। গত ১৩ মে ভবনের মাটির নিচে একটি সেপটিক ট্যাঙ্কের ঢালাই করেন তিনি। বুধবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে সেপটিক ট্যাঙ্কের সেন্টারিং খুলতে নামেন জাহিদুল। কিছুক্ষণের মধ্যে তাঁর গোঙানির আওয়াজ শোনা যায়। এ সময় তাঁকে উদ্ধারে ট্যাঙ্কে নেমে পড়েন ঘটনাস্থলে উপস্থিত জাফর ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের মালিক জাফর হোসেন হাওলাদার। তিনিও অচেতন হয়ে পড়েন।
আমতলী উপজেলা ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের ওয়্যারহাউস ইনস্পেক্টর মো. হানিফ বলেন, খবর পেয়ে আমরা ট্যাঙ্ক ভেঙে জাহিদুল ও জাফরকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাই। চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। এলাকাবাসীর ভাষ্য, ঘটনার পরপরই ভবন মালিক মাওলানা মো. ইউসুফ পালিয়েছেন।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক লুনা বিনতে হক জানান, হাসপাতালে আনার আগেই তাদের মৃত্যু হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ট্যাঙ্কের ভেতরে কার্বন মনোঅক্সাইড জমেছিল। সেই গ্যাসের ক্রিয়ায় দুজনের মৃত্যু হতে পারে।
- বিষয় :
- মৃত্যু
- বরগুনা
- ফায়ার সার্ভিস
