ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সীমাবদ্ধতা হার মেনেছে দৃঢ় সংকল্পে

সীমাবদ্ধতা হার মেনেছে দৃঢ় সংকল্পে
×

আরিফা আক্তার

 লালমনিরহাট প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ | ০৮:০০

| প্রিন্ট সংস্করণ

জন্ম থেকেই দুই হাত অচল। তবুও থেমে থাকেননি আরিফা আক্তার। পা-ই তাঁর কলম, পা-ই শক্তি, পা-ই এগিয়ে চলার একমাত্র ভরসা। সেই পা দিয়েই লিখে গেছেন জীবনের প্রতিটি অধ্যায়। প্রাথমিক থেকে মাস্টার্স–দীর্ঘ শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপে সংগ্রাম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির গল্প লিখেছেন নিজের মতো করে। এবার লালমনিরহাট সরকারি কলেজের দর্শন বিভাগ থেকে মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষায় অংশ নিয়ে শিক্ষাজীবনের শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে আছেন এই সংগ্রামী তরুণী। অদম্য এই তরুণীর গল্প যেন শুধু সংগ্রামের নয়, অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত; যেখানে সীমাবদ্ধতাকেও হার মানায় দৃঢ়সংকল্প।
লালমনিরহাট শহরের উত্তর সাপাটানা শাহীটারী এলাকার মৃত আব্দুল আলীর মেয়ে আরিফা। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। বাবা ছিলেন তালা-চাবি মেরামতের কারিগর। তিন বছর আগে বাবার মৃত্যুতে সংসারে নেমে আসে অনিশ্চয়তা। মাকে নিয়েই এখন তাঁর ছোট্ট সংসার। এরই মধ্যে শারীরিক জটিলতায় দুটি অস্ত্রোপচারও হয়েছে তাঁর শরীরে। তবুও হার মানেননি তিনি।
শৈশব থেকেই আরিফার লড়াই শুরু। ব্র্যাক স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় ৬০০ নম্বরের মধ্যে ৪২৫ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এরপর ফুলগাছ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জেএসসি, পরে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেন। সবশেষে লালমনিরহাট সরকারি কলেজ থেকে দর্শন বিভাগে অনার্স সম্পন্ন করেন। এখন একই কলেজ থেকে মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। আগামী ১১ মে অনুষ্ঠিতব্য পরীক্ষার মধ্য দিয়ে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনের সমাপ্তি ঘটবে।

শুধু নিজের পড়াশোনা নয়, সংসারের দায়ভারও কাঁধে তুলে নিয়েছেন আরিফা। পা দিয়ে লিখে যেমন পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন, তেমনি প্রাইভেট পড়িয়ে উপার্জন করে সংসার ও নিজের শিক্ষার খরচও জুগিয়েছেন। জীবনের প্রতিটি বাধাকে জয় করে তিনি প্রমাণ করেছেন–ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো প্রতিবন্ধকতাই পথ রোধ করতে পারে না।
আরিফার এ অদম্য সংগ্রামের খবর পৌঁছে যায় সরকারের উচ্চ পর্যায়েও। সম্প্রতি তাঁর বাড়িতে যান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু। তিনি আরিফা ও তাঁর মায়ের সঙ্গে সময় কাটান, খোঁজখবর নেন এবং তাঁর পা দিয়ে লেখার দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হন। মন্ত্রী বলেন, ‘আরিফা শুধু একজন শিক্ষার্থী নন, তিনি জীবন্ত অনুপ্রেরণা। তাঁর কাছ থেকে সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের অনেক কিছু শেখার আছে।’ তিনি সমাজের বিত্তশালীদের এ ধরনের মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

এ সময় জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে আরিফার লেখাপড়ার খরচ বহনের আশ্বাস দেওয়া হয়। পাশাপাশি ঘর মেরামতের জন্য ছয় বান্ডিল টিন ও ১৮ হাজার টাকার একটি চেক তুলে দেওয়া হয় তাঁর মা মমতাজ বেগমের হাতে। ভবিষ্যতে একটি বাড়ি করে দেওয়ার আশ্বাসও দেন মন্ত্রী। পড়াশোনা শেষে আরিফার জন্য চাকরির ব্যবস্থার আশ্বাস দেন তিনি।
মা মমতাজ বেগম বলেন, জন্ম থেকেই মেয়ের দুই হাত অচল হলেও কখনও হাল ছাড়েনি সে। আর্থিক সংকটের মধ্যেও টিউশনি করে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। মেয়ের একটি চাকরি হলে তাঁর জীবনের সব কষ্ট সার্থক হবে বলেও জানান তিনি।
নিজের স্বপ্নের কথা জানাতে গিয়ে আরিফা বলেন, তিনি একজন শিক্ষক হতে চান। সমাজের প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য কাজ করতে চান। তাঁর ভাষায়, ‘প্রতিবন্ধকতা মানেই থেমে যাওয়া নয়; সুযোগ পেলে আমরাও এগিয়ে যেতে পারি। আমাদের অনুদান নয়, প্রয়োজন কাজের সুযোগ।’

আরও পড়ুন

×