বাজার ঊর্ধ্বমুখী: কষ্টে মানুষ
তিন বেলা খাবার জোগাড়ই অনেকের জন্য কঠিন
শামসুল মিয়া
রংপুর অফিস
প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ | ০৯:০৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
জ্যৈষ্ঠের তপ্ত রোদে পুড়ছে জনপদ। সামান্য বাতাসেও আগুনের হলকা। এমন গরমে ঘরের বাইরে বের হওয়াই যখন কষ্টকর, তখন অন্যের জমিতে বেগুন ক্ষেতে নিড়ানির কাজ করছিলেন দিনমজুর শামসুল মিয়া।
ঘামে ভিজে গেছে তাঁর শরীর। পরনে ফুলহাতা শার্ট, কাঁধে গামছা। তবু থামার সুযোগ নেই। কারণ এক দিন কাজ না করলে পাঁচ সদস্যের সংসারে চুলা জ্বলে না।
রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার দামোদরপুর ইউনিয়নের মোস্তফাপুর বকশিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা শামসুল মিয়ার বয়স ৫০ পেরিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তিনি বললেন, ‘বাবা, তোমরা রৌইদোত দুই মিনিট থাইকপের পাবার নেন। কী কইমেন? হামার পোড়া কপালের কথা শুনি কী করমেন বাবা! হাঁটো গাছের ছেয়াতে যাই।’
নিড়ানি রেখে বেগুন ক্ষেত থেকে বের হয়ে তিনি দ্রুত পাশের একটি গাছতলায় গিয়ে দাঁড়ালেন। গামছা দিয়ে শরীরের ঘাম মুছতে মুছতে বললেন, ‘যা কবার টপ করি কন। গেরস্থ আসিয়া দেখলে কইবে, কাম বাদ দিয়া দম নেওচি।’
সকালে কী খেয়েছেন, জানতে চাইলে শামসুল মিয়া বলেন, ‘কাঁচা মরিচ দিয়া পন্তা খাছি। সব জিনিসের দাম খালি বাড়োওচে। খাইমেন কী! হামারতো পন্তাও জুটাও মুশকিল হয়া গেইচে।’
দুপুরের খাবারের কথা উঠতে বললেন, ‘আল্লাহ খিলাইলে রাইতোত খামো। যেহালে দিন চলোচে, তিনবের খাবার জোটপার পাও না। বাড়িআওলিক (স্ত্রীকে) কয়া আলচু, রাইতোত কচুরপাত তুলিয়া ভত্তা করেন।’
মাছ-মাংস কবে খেয়েছেন– এ প্রশ্নে বললেন, ‘হামার কপালোত তিন বেলা সাদা ভাত জুটলে খুশি। টাকা জমেয়া ঈদোত এক কেজি বয়লারের গোস্ত কিনছেনো ৩০০ টাকা দিয়া। তাকে ছইল-পইল নিয়া খাছি। তার আগোত কতদিন মাছ-গোস্ত খাচি তাক মনে নাই বাবা।’
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দিনমজুর ও নিম্ন আয়ের মানুষ। চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ-মাংস– প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম কয়েক দফা বেড়েছে। সেই তুলনায় বাড়েনি শ্রমিকের মজুরি। ফলে প্রতিদিনের আয় দিয়ে তিন বেলা খাবার জোগাড় করাই এখন অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।
শামসুল মিয়ার কণ্ঠে সেই বাস্তবতারই প্রতিধ্বনি। তিনি বলেন, ‘ছোট বেটিটা সপ্তম শ্রেণিত পড়ে। রিকশা ভাড়া দিবার পাও না। তিন মাইল হাঁটিয়া স্কুলোত যায়।’
অভাবের সঙ্গে লড়াইকে আরও কঠিন করে তুলেছে অনিয়মিত কাজ। সপ্তাহে চার থেকে পাঁচ দিনের বেশি কাজ পান না তিনি। বাকি সময় বেকার বসে থাকতে হয়। কাজ না থাকলে ধারদেনা করে সংসার চালাতে হয়। একসময় সেই ধার শোধ করতেই এনজিও থেকে ঋণ নিতে হয়েছে। এখন সেই ঋণের কিস্তিই নতুন দুশ্চিন্তার কারণ।
স্ত্রী মঞ্জুয়ারা বেগম, দুই মেয়ে নাজমা ও নাজিরা খাতুন এবং ১৫ বছর বয়সী ছেলে নয়নকে নিয়ে তাঁর সংসার। পুরো পরিবার নির্ভর করে তাঁর আয়ের ওপর। কাজ পেলে দিনে মজুরি পান ৪০০ টাকা, আর কাজ না মিললে নেমে আসে অনিশ্চয়তা।
সংসারের হিসাব কষতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘দিনে চাল লাগে প্রায় ১২৫ টাকার। তেল, লবণ, মসলা, একটু সবজি কিনতে লাগে আরও ১৫০ টাকা। ওষুধ কিনতে হয় ৪৬ টাকার। সাবান-পাউডার লাগে, বাজারে যাওয়া-আসার খরচ আছে। ছইল-পইলের বায়না আছে। দুইটা ছইল স্কুলোত পড়ে। মাস গেইলে বিদ্যুৎ বিল আসে ৩০০-৩৫০ টাকা। কামাই করি দিনে ৪০০ টাকা। এই টাকা খরোচোত থাও দেয় না।’
তিনি জানান, একটি এনজিও থেকে ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন। সেই ঋণের সাপ্তাহিক কিস্তি ৭৫০ টাকা। এ ছাড়া তিনজনের কাছে ১১ হাজার টাকা ধার রয়েছে।
‘দিন দিন ঋণোতে ডুবি যাওচি’– দীর্ঘশ্বাস ফেলেন তিনি। কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলেন, ‘চাকরিজীবির টাকা বাড়ে, বাজারের জিনিসের দাম বাড়ে। সরকার তেলের দাম বাড়াইল, বিদ্যুতের দাম বাড়াইল। হামার মজুরের দাম বাড়ে না। হামরা বাঁচমো কেমন করি?’
শুধু শামসুল মিয়া নন, স্থানীয় আরও কয়েকজন নিম্ন আয়ের মানুষ একই কথা বললেন। তাদের মতে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শ্রমজীবী মানুষের আয় না বাড়লে জীবনযুদ্ধ আরও কঠিন হয়ে উঠবে। অনেক পরিবারের খাবারের তালিকা থেকে মাছ-মাংস তো দূরের কথা, পুষ্টিকর খাবার বাদ যাচ্ছে।
- বিষয় :
- বাজারদর
