ঢাকা বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

হালদা নদীর প্রকল্প এলাকায় ড্রেজারে বালু উত্তোলন

হালদা নদীর প্রকল্প এলাকায় ড্রেজারে বালু উত্তোলন
×

ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬ | ০৭:২৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের তথা দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র হালদা নদীকে সরকার মৎস্য হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণার পর থেকেই হালদা নদী হতে বালু উত্তোলন স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড হালদা নদীর ভাঙন ঠেকাতে ফটিকছড়ির সুন্দরপুরে প্রায় ৬০ লাখ টাক ব্যয়ে নদীর তীররক্ষা প্রকল্পে কাজ করছে। কিন্তু সেই প্রকল্প এলাকা থেকেই নদীর চর কেটে মাটি নেওয়া এবং নদীতে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে কাজ পাওয়া ঠিকাদারের বিরূদ্ধে। 

স্থানীয়দের দাবি, ঠিকাদার হালদা নদীর তলদেশ থেকে তোলা বালুই ব্যবহার করছে নদী তীর সংরক্ষণ কাজে। সরকারিভাবে বালু উত্তোলনে নিষেধ থাকার পরও গত কয়েক দিন ধরে প্রকাশ্যে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

সরেজমিনে ফটিকছড়ির সুন্দরপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের হাড়িঘাটা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, হালদা নদীর তীর সংরক্ষণ ও বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজ চলছে। প্রকল্প এলাকার অদুরে নদীর চরে ভেকু দিয়ে মাটি কাটার চিহ্ন। একই এলাকায় ড্রেজার বসিয়ে নদী থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। পাইপলাইনের মাধ্যমে সেই বালু সরাসরি তীর সংরক্ষণ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। স্থানীয়রা জানান, প্রথমে চর থেকে মাটি কেটে ঠিকাদারের কাছে বিক্রি করা হয়। পরে একই স্থানে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন শুরু হয়। কয়েক দিন ধরে দিন-রাত এ কার্যক্রম চললেও প্রশাসনের কোনো হস্তক্ষেপ চোখে পড়েনি।
বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন-২০১০ অনুযায়ী সরকারের অনুমোদন ও বৈধ ইজারা ছাড়া কোনো নদী, খাল বা জলাশয় থেকে বালু উত্তোলন করা যায় না। একই সঙ্গে নদীর তীর, চর বা কৃষিজমি থেকে এমনভাবে মাটি কাটা নিষিদ্ধ যাতে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, জনসম্পদ কিংবা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। আইন লঙ্ঘন করে বালু উত্তোলন বা মাটি কাটার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরূদ্ধে জরিমানা, কারাদণ্ড এবং যন্ত্রপাতি জব্দের বিধান রয়েছে।
দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র হালদা নদীকে সরকার ‘মৎস্য হেরিটেজ’ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে। ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর এতদসংক্রান্ত সরকারি গেজেট জারি করা হয়। গেজেট অনুযায়ী, ডিম আহরণ ছাড়া এ নদী থেকে কোনো ধরনের মাছ বা জলজ প্রাণী ধরা কিংবা শিকার করা যাবে না। একই সঙ্গে হালদা নদী ব্যবহারের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি শর্ত আরোপ করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুটি শর্ত হলো– ভূমি ও পানির প্রাকৃতিক বৈষম্য বা পরিবর্তন করতে পারে, এমন কোনো কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা যাবে না এবং হালদা ও এর শাখা নদীগুলোয় বালুমহালের ইজারা প্রদান বন্ধ রাখতে হবে। পাশাপাশি ড্রেজার বা অন্য কোনো ক্ষতিকর পদ্ধতিতে বালু উত্তোলনও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, হালদা নদীতে বালুমহাল ইজারা দেওয়া, বালু উত্তোলন, মাটি কাটা এবং চর কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পরিবেশগত গুরুত্বের কারণে হালদাকে বিশেষ সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

জানতে চাইলে জমির মালিক স্থানীয় শামশুল আলম ড্রেজার বসিয়ে বালু তোলার বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘বালু কারা তুলছে আমি জানি না। নদীর চরের ওই জায়গাটি আমার। ঠিকাদারের লোকজন আমার কাছে জমির কাগজ চেয়েছিল, আমি দিয়েছি। মাটি কাটা, বালু তোলা- এসবে আমি নেই। এগুলো ঠিকাদারের লোকজন করছে। আমি মাটি-বালুর ব্যবসা করি না। বিক্রি করব কেমনে?’ স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত কয়েকদিন ধরে দিন-রাত অব্যাহতভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও প্রকাশ্যে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন তারা।

ইউপি সদস্য মো. ইসমাঈল বলেন, ওখানে কাজ চলছে জানি। কিছু বালু লাগবে, তাই খাল থেকে তোলা হচ্ছে। তবে কারা তুলছে, এসব জানি না। 
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স রিলায়েন্স করপোরেশনের স্বত্বাধিকারী গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘আমি মাটি কাটিনি, বালুও তুলিনি। এসব আমি স্থানীয় কয়েক জনের কাছ থেকে কিনে নিচ্ছি। তারা কোথা থেকে দিচ্ছে, সেটি আমি জানি না। অনেক দিন মাটি ও বালু না পাওয়ায় কাজ বন্ধ ছিল। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় আবার চালু করেছি।
চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহীদ বলেন, আমাদের দায়িত্ব ঠিকাদারের কাছ থেকে কাজ বুঝে নেওয়া। তারা কীভাবে, কোথা থেকে বালু-মাটি সংগ্রহ করছে, সেটি আমাদের দেখার বিষয় নয়। এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।

বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও হালদা রিসার্চ ল্যাবরেটরির চেয়ারম্যান ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া বলেন, ‘আমি পানি উন্নয়ন বোর্ডকে আহ্বান জানাব, এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরূদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে। পাশাপাশি প্রশাসনেরও এ বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো উচিত। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়ক মনিরা পারভীন বলেন, যদি সেটি ঘোষিত বালুমহাল না হয়, তাহলে 
সেখান থেকে বালু তোলা উচিত নয়। আর যেহেতু সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ, তাহলে সরকারি প্রতিষ্ঠান কেন, কেউই তো এভাবে কাজ করতে পারে না। আইন অনুযায়ী এর কোনো বৈধতা নেই।
 

আরও পড়ুন

×