ঢাকা শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬

আমি এখন কাকে নিয়ে বাঁচব— মা ও তিন বোনের মরদেহের সামনে সিফাতের আর্তনাদ

আমি এখন কাকে নিয়ে বাঁচব— মা ও তিন বোনের মরদেহের সামনে সিফাতের আর্তনাদ
×

নিহত শাহিনুর বেগম, বড় মেয়ে সায়মা আক্তার, মেজ মেয়ে ইকরা আক্তার ও ছোট মেয়ে শিফা আক্তার। ডানে- ছেলে জুনায়েদ ইসলাম সিফাত। ছবি: সংগৃহীত

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬ | ১৫:৪৫ | আপডেট: ২৬ জুন ২০২৬ | ১৬:১৪

আমি এখন কাকে নিয়ে বাঁচব- মা ও তিন বোনের রক্তাক্ত মরদেহের সামনে দাঁড়িয়ে বারবার শুধু এই কথাটিই বলছেন জুনায়েদ ইসলাম সিফাত। যেন মুহূর্তেই হারিয়ে গেছে তার পৃথিবী। যে ঘরে ছিল মায়ের স্নেহ, তিন বোনের হাসি আর একসঙ্গে বেঁচে থাকার স্বপ্ন, সেই ঘরে এখন একা।

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌরসভার গোডাউন রোডের একটি ভাড়া বাসায় ঘরে ঢুকে মা শাহিনুর বেগম (৩৮) ও তার তিন মেয়ে সায়মা আক্তার (২১), ইকরা আক্তার (১৭) এবং শিফা আক্তারকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে বৃহস্পতিবার। একই ঘটনায় গণপিটুনিতে নিহত হন প্রধান সন্দেহভাজন অন্তর মজুমদার (২৫)। একদিনে পাঁচ প্রাণহানির এই ঘটনা শোক ও আতঙ্কে স্তব্ধ করে দিয়েছে পুরো রায়পুরকে। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ ও সিআইডিসহ একাধিক সংস্থা।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নিহত শাহিনুর বেগমের (৩৮) স্বামী কামাল ২০১৯ সালে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে প্রাণ হারান। তারপর তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে সংগ্রাম করে সংসার চালিয়ে আসছিলেন শাহিনুর। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে সন্তানদের মানুষ করাই ছিল তার একমাত্র লক্ষ্য। সবাইকে উচ্চশিক্ষিত করে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখতেন তিনি।

কিন্তু বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সেই স্বপ্ন মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায়। ঘরে ঢুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে শাহিনুর বেগম ও তার তিন মেয়ের ওপর হামলা চালানো হয়। ঘটনাস্থলেই শাহিনুর, সায়মা ও শিফার মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত ইকরাকে ঢাকায় নেওয়ার পথে তারও মৃত্যু হয়। পরে স্থানীয়দের গণপিটুনিতে নিহত হন সন্দেহভাজন অন্তর মজুমদার।

ঘটনার সময় পরিবারের একমাত্র ছেলে জুনায়েদ ইসলাম সিফাত কর্মস্থলে ছিলেন। তিনি স্থানীয় ব্যবসায়ী ও রায়পুর বাজার কমিটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদের প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। ঘটনার খবর পেয়ে ছুটে এসে একসঙ্গে মা ও তিন বোনের রক্তাক্ত মরদেহ দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন সিফাত।

শুক্রবার লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতাল মর্গে পাঁচজনের ময়নাতদন্ত হয়। পরে শাহিনুর বেগম ও তার তিন মেয়ের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। রায়পুরে তাদের প্রথম জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হবে। শাহিনুর ও তার তিন মেয়ের মরদেহ নেওয়ার কথা তাদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায়। সেখানে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে মরদেহ দাফন করা হবে।

অন্যদিকে গণপিটুনিতে নিহত অন্তর মজুমদারের মরদেহ লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তার স্বজনের খবর দেওয়া হলেও তারা মরদেহ নিতে আসেননি।

ঘটনার পর থেকে স্থানীয়দের মধ্যে এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। অনেকে বলছেন, একই সময়ে চারজনকে নৃশংসভাবে হত্যা করা একজন মানুষের পক্ষে কঠিন। তাদের দাবি, ঘটনার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কিনা, সেটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন। তবে পুলিশ এ বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছে।

রায়পুর বাজার কমিটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদ বলেন, 'এ ধরনের নির্মম হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সাধারণ মানুষের ধারণা, একজনের পক্ষে একই সঙ্গে চারজনকে হত্যা করা কঠিন। তাই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বের করে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে।'

ঘটনার পরপরই পুলিশ, সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মনিরুজ্জামানও ঘটনাস্থল ঘুরে তদন্তে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন। পোশাকধারী ও সাদা পোশাকের পুলিশ সদস্যরা সমন্বিতভাবে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে একটি বিশেষ তদন্ত দলও ঘটনার প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখছে।

নিহতদের স্বজন রায়পুর থানায় একটি হত্যা মামলার এজাহার দিয়েছেন। রায়পুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. শাহিন মিয়া বলেন, 'ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি। ঘটনাস্থল থেকে গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানানো হবে।'
 

আরও পড়ুন

×