খুলনায় দুই বছরে বিএনপির ৮ নেতাকর্মী খুন
ফাইল ছবি
হাসান হিমালয়, খুলনা
প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬ | ০৬:৫৯
১৬ মার্চ বেলা সাড়ে ১১টা। খুলনা নগরীর দৌলতপুর কেডিএ কল্পতরু মার্কেটে প্রবেশ করে কয়েক যুবক। তারা একটি দোকানে দৌলতপুর থানা ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রাশিকুল আনাম রাশুকে গুলি করে নির্বিঘ্নে বেরিয়ে যায়। হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান তিনি। গত মঙ্গলবার এ হত্যাকাণ্ডের তিন মাস পূর্ণ হলেও হত্যার মোটিভ এবং মূল অভিযুক্তদের খুঁজে বের করতে পারেনি পুলিশ।
কল্পতরু মার্কেটের চেয়ে জনবহুল ডাকবাংলো মোড় এলাকায় গত ৪ মার্চ রাতে শত শত মানুষের সামনে রূপসা উপজেলা শ্রমিক দলের আহ্বায়ক মাসুম বিল্লাহকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া হত্যাকাণ্ডের সেই ভিডিও দেখে অনেকেই সন্ত্রাসীদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করেন। কিন্তু গত সাড়ে ৩ মাসে তাদের কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
শুধু রাশু বা মাসুম বিল্লাহ নন; গত দুই বছরে খুলনায় বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের আটজন নেতাকর্মী খুন হন। এর মধ্যে একটি হত্যাকাণ্ডেরও বিচার শুরু হয়নি। ৭টি হত্যা মামলার তদন্তই শেষ হয়নি। অধিকাংশ মামলার প্রধান অভিযুক্তরা গ্রেপ্তার হয়নি। এসব নিয়ে হতাশ নিহতের স্বজনরা।
মামলাগুলোর তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এলাকায় আধিপত্য ও ব্যবসা নিয়ন্ত্রণই অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ। এর বাইরে দলীয় কোন্দলে একটি এবং তুচ্ছ ঘটনায় বচসার জেরে দুজনকে হত্যা করা হয়।
পাঁচটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে স্থানীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে আমিন মোল্লা বোয়িং হত্যা মামলায় পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী আশিক বাহিনীর প্রধান আশিক, সেকেন্ড ইন কমান্ড সজীবসহ আটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। মাসুম বিল্লাহ হত্যা মামলায় পুলিশের তালিকায় ১ নম্বর সন্ত্রাসী রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুসহ তার সহযোগীদের নাম এসেছে।
দুই বছরে নিহত ৮
রাশু ও মাসুম ছাড়াও গত দুই বছরে বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের ৮ নেতাকর্মী হত্যার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ২০২৪ সালের ২৯ নভেম্বর রাতে সন্ত্রাসীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ৩০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আমিন মোল্লা বোয়িংকে গুরুতর আহত করে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৪ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়।
২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি ২১ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাবেক সহসভাপতি মানিক হাওলাদারকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়। গত বছর ১১ জুলাই নিজ বাড়ির সামনে গুলি করে ও পায়ের রগ কেটে হত্যা করা হয় দৌলতপুর থানা যুবদলের সাবেক সহসভাপতি মাহবুবুর রহমান মোল্লাকে।
চলতি বছর ৭ ফেব্রুয়ারি রেলওয়ে হাসপাতাল রোডে বিএনপিকর্মী বৃদ্ধ বাবুল মোল্লা পিটুনিতে মারা যান এবং ২৭ ফেব্রুয়ারি দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটি ইউনিয়ন যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক মুরাদ খানকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। সর্বশেষ গত ১২ জুন লবণচরা থানার মাথাভাঙা এলাকায় বটিয়াঘাটা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলাম গাজী ওরফে ঢাকাইয়া রফিককে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
মামলাগুলোর তদন্তে গতি নেই
রাশিদুল ইসলাম রাশু হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর বাবা শরিফুল আনাম অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে দৌলতপুর থানায় মামলা করেন। মামলাটি তদন্তের জন্য ডিবিতে পাঠানো হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা অমিত দাস বলেন, হত্যাকাণ্ডে এ পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হত্যায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
শ্রমিক নেতা মাসুম বিল্লাহকে হত্যার পর ঘটনাস্থল থেকেই অশোক ঘোষ নামে এক কিলারকে অস্ত্রসহ আটক করে পুলিশ। এরপর তিন মাস অতিবাহিত। মামলার এজাহারের বাকি ৭ আসামি গ্রেপ্তার হয়নি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই জামাল হোসেন বলেন, এ মামলায় মোট তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে গ্রেনেড বাবুর ভাই জনিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে।
দৌলতপুর যুবদল নেতা মাহবুবুর রহমান হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম বলেন, মামলায় এ পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিছু তথ্য-প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।
খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান বলেন, মামলাগুলোর তদন্ত কার্যক্রম নিয়মিত মনিটর করা হয়। দ্রুত মামলাগুলোর তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিচারের আশায় পরিবারগুলো
রাশুর বাবা শরিফুল আনাম নগরীর ৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি। আক্ষেপ নিয়ে বলেন, তিন মাস হয়ে গেল, অথচ এখনও পুলিশ কিছু বের করতে পারল না! বিএনপি করাই বোধ হয় আমাদের অপরাধ হয়ে গেছে।
মাসুম বিল্লাহর স্ত্রী ফাতেমাতুজ জোহারা বলেন, বাচ্চাগুলোর সামনেই কীভাবে গুলি করল! ওদের ফাঁসি না হলে এই কষ্ট কখনও যাবে না।
বিএনপি সরকার গঠন করলেও নেতাকর্মী খুনের বিচার না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন দলটির নেতারা। খুলনা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিন বলেন, একের পর এক খুন হচ্ছে। বিচার না হওয়ায় আরেকটি খুনের প্রেক্ষাপট তৈরি হচ্ছে।
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান মন্টু বলেন, এমন হত্যাকাণ্ড আর দেখতে চাই না। এ জন্য যা যা করা প্রয়োজন, করা হোক।