কৃষিতে নারী
কীটনাশকে নারীর স্বাস্থ্যনাশ
যশোরের আবদুলপুরে পটোল ক্ষেতে কীটনাশক ছিটাচ্ছেন রেক্সোনা। এ গ্রামের সব নারী কৃষক নিজেরাই ফসলের ক্ষেতে কীটনাশক ছিটান। সম্প্রতি তোলা -সমকাল
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম, যশোর থেকে ফিরে
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ০৯:০৩ | আপডেট: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ১২:১৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাঠি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা গ্রামের নারী কৃষক জেসমিন বেগমের বাড়িতে আগাছা মারার বিষের প্যাকেটটি ঝোলানো ছিল গোয়ালঘরের সঙ্গে। তাঁর শাশুড়ি সেখানে বসে সবজি কুটছিলেন। জেসমিন বেগম ফসলের মাঠে কীটনাশক স্প্রে করেন। তাঁর প্রতিবেশী সীমা খাতুনও নিজেই কীটনাশক দেন ফসলে। স্প্রের সময় তরল কীটনাশক লেগে যায় তাদের শরীরে। এখন তাদের স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে নানারকম অসুস্থতা দেখা দিচ্ছে।
আবার সরাসরি কীটনাশক স্প্রে না করেও অনেক নারী কৃষক প্রতিদিন বালাইনাশক ও রাসায়নিক সারের সংস্পর্শে আসছেন এবং অসুস্থ হচ্ছেন। সমকাল শতাধিক নারী কৃষকের ওপর একটি চকিত জরিপ করেছে। তাতে দেখা যায়, ৮৪ শতাংশ নারী কৃষক কীটনাশকের কারণে কোনো না কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভুগছেন।
বাণিজ্যিক চাষাবাদে নেতিবাচক প্রভাব, সামাজিক চাপ বা সংস্কারসহ অনেক কারণে নারী কৃষকরা এ-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করতে চান না। তারা ভালো চিকিৎসাও নিতে পারেন না। অসুস্থ হলে তাদের ভরসা পল্লিচিকিৎসক আর বাড়ির কাছের ছোট্ট ফার্মেসি।
কীটনাশকের নিরাপদ ব্যবহার নিয়ে এসব নারীকে সচেতন করা বা প্রশিক্ষণের উদ্যোগও বেশ সীমিত। যশোর ও জামালপুরে নারী কৃষকদের কীটনাশকের ব্যবহার প্রশিক্ষণ বিষয়ে কাজ করে দুটি বেসরকারি সংগঠন। সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ফার্মার ফিল্ড স্কুল বা এফএফএসের মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেয় বলে জানিয়েছে। প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্য ৩০ শতাংশ নারী কৃষক রাখা বাধ্যতামূলক বলেও জানায় অধিদপ্তর। তবে সমকালের জরিপে অংশ নেওয়া নারী কৃষকরা জানালেন, তারা কেউ সরকারি প্রশিক্ষণ পাননি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বাংলাদেশ শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২ অনুসারে, কৃষিতে সবচেয়ে বেশি ৪৫ শতাংশ জনবল নিয়োজিত। এর মধ্যে ২৬ শতাংশ নারী, ১৯ শতাংশ পুরুষ। ২০১৬-১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, সেই সময় নারীদের ৬০ শতাংশ ও পুরুষদের ৩২ শতাংশ কৃষিতে যুক্ত ছিলেন।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে অসামান্য অবদান রাখছেন নারীরা। কিন্তু কীটনাশক ব্যবহারে নারীর স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে প্রতিবেদন করতে গিয়ে সরকারি-বেসরকারি কোনো পর্যায়ে পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল না। এ অবস্থায় সমকালের পক্ষ থেকে দেশের ১২টি জেলার ১০৯ পেশাদার নারী কৃষককে সুনির্দিষ্ট ১৬টি প্রশ্ন করে একটি চকিত জরিপ করা হয়। তাদের মধ্যে ৯২ জনই নানা অসুখে ভুগছেন বলে জানান। চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের অসুখগুলো কীটনাশকের সংস্পর্শজনিত। এই সংখ্যা জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৮৪ শতাংশ। ১৭ জন জানিয়েছেন, তাদের উল্লেখযোগ্য কোনো অসুস্থতা নেই।
এই জরিপে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বৈজ্ঞানিক বিবেচনায় কম। তাই এতে দেশের সার্বিক চিত্র যথাযথভাবে উঠে এসেছে বলা যাবে না। তবে এই ফলাফল থেকে কীটনাশকে নারীর স্বাস্থ্যঝুঁকির একটি প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যায়।
অসুস্থতা আড়াল করেন অনেকে
সমকালের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, নারী কৃষকরা তাদের অসুস্থতা নিয়ে কথা বলতে সংকোচ বোধ করেন। তবু তারা সমকালের চকিত জরিপে অংশ নিয়েছেন। তাতে দেখা যায়, ১০৯ জনের মধ্যে ১৪ নারী কৃষক সরাসরি কীটনাশক স্প্রের কাজটি করে থাকেন। অন্যরা নানাভাবে এর সংস্পর্শে আসেন।
তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৮ জন ত্বকের প্রদাহ ও চুলকানির সমস্যায় ভুগছেন। এ ছাড়া শ্বাসকষ্টে ২৪ জন এবং দৃষ্টি সমস্যায় ভুগছেন ২৩ জন। ২০ জন জানিয়েছেন তাদের উচ্চ রক্তচাপ আছে। কিডনির সমস্যা আছে একজনের। একাধিক রোগে ভোগা নারী কৃষকের সংখ্যা ২৫।
১১ জেলায় চকিত জরিপ এবং এক জেলায় জরিপের পাশাপাশি সরেজমিন তথ্য সংগ্রহ করেছে সমকাল। যশোরের সরেজমিন চিত্রের সঙ্গে বাকি ১১ জেলার জরিপের তথ্যগত মিল পাওয়া গেছে।
যশোর সদরের চুড়ামনকাঠি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলার জেসমিন বেগমের ক্ষেতে জুনের তৃতীয় সপ্তাহে চলছিল বেগুন, বরবটি, লাউ আর কাঁচামরিচের আবাদ। তিনি এ প্রতিবেদককে দেখালেন ফসলের ক্ষেত। জানালেন, বেগুন তোলার আগে এক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন দুবেলা ‘বিষ’ (কীটনাশক) দিতে হয়।
গ্রামটিতে এক হাজারের বেশি নারী কৃষক আছেন। তাদের বড় অংশ মাঠে সরাসরি কীটনাশক স্প্রে করেন বলে জানালেন কয়েকজন। এখানে চারজন নারী কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিবার কীটনাশক স্প্রের পর তাদের মাথা ঘোরে, বমি বমি ভাব হয়; কিছুক্ষণ শ্বাসকষ্ট থাকে। জেসমিন বেগমের প্রতিবেশী সীমা খাতুন নিজেই হাত বাড়িয়ে প্রতিবেদককে দেখালেন তাঁর ত্বকের প্রদাহ।
ছাতিয়ানতলা পেরিয়ে চুড়ামনকাঠি বাজার হয়ে সোজা এগোলে আবদুলপুর ওয়ার্ড। এখানেও চলছে বাণিজ্যিকভাবে সবজি চাষ। এই গ্রামের ১৪ জন নারী ও পুরুষ কৃষকের সঙ্গে কথা হয় ফসলের মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে। এখানকার নারী কৃষকরা মাঠে কীটনাশক স্প্রে করা ছাড়াও সবজি উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত সব কাজই করেন। বস্তুত কৃষক পরিবারের শিশু-বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ সবাই কোনো না কোনোভাবে কীটনাশকের সংস্পর্শে আসছেন।
আলাপের শুরুতে তারা কীটনাশকের সংস্পর্শে আসার কথা স্বীকার করেননি। তবে তাদের কথোপকথনে ‘ব্যথায় সারারাত ঘুমাতে না পারার’ প্রসঙ্গ ওঠে আসে। সেই সূত্রে আলাপ বাড়িয়ে জানা গেল, তাদের মধ্যে চারজনের শ্বাসকষ্ট, দুজনের চুলকানি এবং বাকিদের ত্বকে জ্বালাপোড়া ও চোখে কম দেখার সমস্যা আছে।
নারীরা জানালেন, দীর্ঘমেয়াদি গুরুতর অসুস্থতা ছাড়া তারা কখনও বড় (বিশেষজ্ঞ) চিকিৎসকের কাছে জান না। তারা ছোটেন পল্লিচিকিৎসকের কাছে। একই চিত্র উঠে এসেছে দেশের অন্যান্য জেলার নারী কৃষকদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য থেকে। সমকালের জরিপে দেখা যাচ্ছে, ১১ জেলার নারী কৃষকরাও নিজেদের অসুখ গুরুতর হওয়ার আগ পর্যন্ত ভরসা করেন পল্লিচিকিৎসক ও ফার্মেসির ওপর।
চুড়ামনকাঠি বাজারে বসে রোগী দেখতে দেখতে পল্লিচিকিৎসক মৃত্যুঞ্জয় কুমার কুণ্ডু সমকালকে বললেন, কীটনাশক দেওয়ার পর সবজিচাষিরা আসেন চোখে কম দেখতে পাওয়া, শ্বাসকষ্ট, গ্যাসের সমস্যা আর মাথা ঘোরার সমস্যা নিয়ে। দুই-তিন দিন ওষুধ খেলে ঠিক হয়ে যায়। তিনি বলেন, নারীদের ত্বক আর গ্যাসের সমস্যা বেশি।
এই বাজারের আরেক মাথায় বসেন পল্লিচিকিৎসক মো. জিয়াউর রহমান। ওষুধের দোকানের পাশ দিয়ে এগিয়ে সরু গলির ভেতরে এই চিকিৎসকের চেম্বারে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে বসেছিলেন আটজন নারী রোগী। জিয়াউর রহমান বলেন, এখানে নারীরা কীটনাশক কম স্প্রে করলেও নিয়মিত ফসল তোলে, ফুল ছোঁয়ানোর (হাতের স্পর্শের মাধ্যমে পরাগায়ন) কাজ করে, কীটনাশক ও সারের পাত্র ধোয়; স্প্রে করার পরপরই মাঠে যায়। তিনি বলেন, ‘বেশির ভাগ নারী আমার কাছে আসে চুলকানির সমস্যা নিয়ে।’
কীটনাশকের সংস্পর্শে নারী
সমকালের জরিপ থেকে জানা যায়, অধিকাংশ কৃষকের বাড়িতে ঘরের কোনায় রাখা হয় কীটনাশকের পাত্র ও সারের বস্তা। আবার কীটনাশক হাত দিয়ে পানিতে গোলাতে না হলেও ইউরিয়া ও পটাশের মতো সার একসঙ্গে অন্য সারের সঙ্গে মেশাতে হয়। এ কাজটি নারীরাই করে থাকেন এবং তা খালি হাতেই।
নারী কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কীটনাশক শুধু যে বাতাসে ছড়িয়ে নিঃশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে ঢোকে– এমন নয়; কাঁধে কনটেইনার নিয়ে যে নলটি দিয়ে স্প্রে করা হয়, সেই নল বেয়ে গড়িয়ে নামে তরল পদার্থ। এটা ত্বকের সংস্পর্শে আসার পর একসময় ঘা হতে শুরু করে।
আবদুলপুর গ্রামের পঞ্চাশোর্ধ্ব কৃষক জাহানারা জানান, বড় বস্তা থেকে সার ঢেলে অন্য সারের সঙ্গে মেশানোর কাজটি তিনি খালি হাতেই করেন। ঘাস মারার বিষ ছিটানোর পর সেই পাত্র ভালোভাবে ধুয়ে তাতে অন্য কীটনাশক রাখেন। পাত্র পরিষ্কার করার কাজটিও নারীরা হাতে কিছু না পরেই (গ্লাভস) করেন। জাহানারা বেগম বলেন, ‘এ কাজ করার সময় হাত ঝিনঝিন করে। মাথার ভেতরেও মাঝে মাঝে অস্বস্তি হয়।’
চকিত জরিপ এবং ফলাফল
চকিত জরিপের জন্য সমকাল ১৬টি প্রশ্ন ঠিক করে। ১১ জন জেলা প্রতিনিধির মাধ্যমে জরিপটি পরিচালনা করা হয়। প্রতিনিধিরা নিজ এলাকার প্রকৃত নারী কৃষকের কাছে যান এবং উত্তরদাতার পরিচয়সহ জরিপের প্রশ্নগুলোর উত্তর লিখে পাঠান। তাতে সর্বমোট ৯২ জনের তথ্য পাওয়া যায়। এ ছাড়া এই প্রতিবেদক যশোরে সরেজমিন ১৭ জনের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে ওই তথ্য এই প্রতিবেদনে ব্যবহার করেন।
জরিপে অংশ নেওয়া জেলাগুলো হলো– যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, জামালপুর, কুমিল্লা, পাবনা, নাটোর, বগুড়া, দিনাজপুর, রংপুর, সিরাজগঞ্জ এবং নীলফামারী। সমকালের জরিপে সেই নারী কৃষকদের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যারা কৃষিকাজে স্বনির্ভর।
জরিপে অংশ নেওয়া ১০৯ জন নারীর মধ্যে ১০৫ জনের বয়স ৩০ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে। তারা অন্তত ১০ বছর; কয়েকজন ২৫ বছর ধরে কৃষিকাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বছরে অন্তত দুই মৌসুমে চাষাবাদ করেন। সাময়িক দিনমজুর অথবা শুধু পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কৃষিতে সহযোগিতা করেন সেই নারী কৃষকের তথ্য জরিপে যুক্ত হয়নি।
নারী কৃষকদের কাছে করা প্রশ্নের মধ্যে ছিল তাদের নাম, ঠিকানা, বয়স, কীটনাশকের সংস্পর্শে আসার ধাপ, কীটনাশক ব্যবহারের প্রস্তুতি, নারী কৃষকদের অসুস্থতার ধরন, অসুস্থতার সময়কাল, চিকিৎসা গ্রহণ, কীটনাশক ও সার বাড়িতে সংরক্ষণের পদ্ধতি এবং পাত্র পরিষ্কারে সময় সতর্কতার মাত্রা নির্ণয়ের মতো বিষয়গুলো।
জরিপে অংশ নেওয়া অধিকাংশ নারী কৃষক জানিয়েছেন তাদের বুক জ্বালাপোড়ার সমস্যা আছে। এর মধ্যে নীলফামারীর ১০ জন নারী কৃষকের মধ্যে ৭ জনই জানিয়েছেন তাদের উচ্চ রক্তচাপ আছে। তারাসহ এই জেলার ৯ জন জানিয়েছেন দৃষ্টি ঝাপসা লাগার কথা। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসার হার রংপুরেও বেশি।
তবে ত্বকের সমস্যার কথা বেশি জানিয়েছেন সিরাজগঞ্জের নারী কৃষকরা। সবচেয়ে কম অসুস্থতার তথ্য মিলেছে কুমিল্লা থেকে। বগুড়ায় প্রশ্নোত্তরে অংশ নেওয়া ১০ জনের মধ্যে সাতজন জানিয়েছেন মাথা ঘোরার সমস্যার কথা।
জামালপুরে নদী-তীরবর্তী চরে অনেক কাঁচামরিচ উৎপাদন হয়। এখানকার নারী কৃষকরা জানান, কাঁচামরিচে কীটনাশকের ব্যবহার অনেক বেশি হয়। এই জেলার সদরসহ চার উপজেলার মোট ১৯ জন নারী কৃষকের কাছে তাদের স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে জানতে চাওয়া হয়। পাঁচজন জানিয়েছেন, তাদের কোনো রোগবালাই নেই। পাঁচজনের ত্বকে সমস্যা, তিনজনের শ্বাসকষ্ট এবং বাকিদের দুটি রোগই আছে।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ জামালপুরে কীটনাশকের নিরাপদ ব্যবহার বিষয়ে প্রায় ১৮ হাজার নারী কৃষককে প্রশিক্ষণ দিয়েছে বলে জানায়। প্রকল্পের কৃষি বিশেষজ্ঞ ড. পরিমল সরকার সমকালকে বলেন, নারী কৃষকরা কীটনাশক স্প্রে না করলেও অনেক বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন। দেখা যায়, স্প্রে করার পরপরই ফসলের মাঠে যান ফসল তুলতে। নিঃশ্বাসের সঙ্গে টেনে নেন কীটনাশক। এ ছাড়া বাড়িতে কীটনাশক সংরক্ষণের ব্যবস্থাপনা ও কীটনাশক ব্যবহারকারীর পোশাক ধোয়াসহ সব কাজ নারী কৃষকের হাত দিয়ে হয়।
যশোরে মাঠে কীটনাশক স্প্রে করা নারী কৃষকদের সন্ধান পাওয়া যায় জাগরণী ফাউন্ডেশনের সহায়তায়। এখানে নিরাপদ সবজি উৎপাদনের ওপর প্রশিক্ষণ দিচ্ছে জাগরণী ফাউন্ডেশন।
প্রশিক্ষণ ও মতামত
কীটনাশক কীভাবে স্প্রে করা হয় জানতে চাইলে আবদুলপুরের রেক্সোনা নীল রঙের একটি কনটেইনার হাতে নিয়ে দেখিয়ে দিলেন পদ্ধতি। মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাভস ছাড়াই এই নারী কৃষক পটোলের ক্ষেতে ছিটিয়ে দিলেন কীটনাশক। বললেন, ১৬ লিটার পানির সঙ্গে মেশানো হয় দুই মুখ (বোতলের সঙ্গে থাকা ছিপি) কীটনাশক।
সমকালের প্রতিবেদক মাঠপর্যায়ে নারী কৃষকদের কাজের সময় উপস্থিত থেকে দেখেছেন, তারা মাস্ক ব্যবহার করলেও কীটনাশক ব্যবহারের সময় অতি প্রয়োজনীয় বুট জুতা, পিপিই কোনোটি ব্যবহার করেন না। এই তথ্যের মিল পাওয়া যায় ২০২৫ সালে প্রকাশিত ‘ফ্রম দ্য গ্রাউন্ড আপ’ শিরোনামের একটি গবেষণায়। বাংলাদেশ, ভারত, লাওস ও ভিয়েতনামের ৪,৩৯২ কৃষকের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা–এফএও।
তাদের প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশে ৮২ জন নারী কৃষকের মধ্যে মাত্র একজন কীটনাশক স্প্রের সময় বুট জুতা পরেন, মাস্ক ব্যবহার করেন ২০ জন এবং সচেতনভাবে শরীর ঢাকা পোশাক পরেন ১৮ জন। এই গবেষণা বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ফসলের মাঠে কীটনাশক স্প্রে করার পর প্রতি ১০০ জনে ৫৯ জন নারী এবং ৬৭ জন পুরুষ কৃষক সেই দিনই আবার মাঠে যান কাজ করতে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট-বারির জৈব কৃষিবিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন সমকালকে বলেন, ফসলে সাধারণত কীটনাশক, ছত্রাকনাশক, আগাছানাশক, মাকড়নাশক, কৃমিনাশক এবং ইঁদুরনাশক ব্যবহার করা হয়। কীটনাশকের মধ্যে অর্গানোফসফেট (যেমন– ক্লোরপাইরিফস, ম্যালাথিয়ন), কার্বামেট, পাইরেথ্রয়েড, নিওনিকোটিনয়েড এবং ফেনাইলপাইরাজোল শ্রেণির রাসায়নিক ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। আগাছানাশকের মধ্যে গ্লাইফোসেট উল্লেখযোগ্য। এসব বালাইনাশক নিরাপত্তাবিধি না মেনে বা অবৈজ্ঞানিকভাবে ব্যবহার করলে কৃষক, ভোক্তা ও পরিবেশ সবার জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়।
চুড়ামনকাঠির আবদুলপুরের কৃষক স্বপ্না আখতার বললেন, সাধারণত এক বিঘা জমির জন্য দুই কনটেইনার কীটনাশক ব্যবহার করেন তারা। বৃষ্টিতে ধুয়ে গেলে ফের দিতে হয়। সে ক্ষেত্রে তিন কনটেইনারও ব্যবহার করতে হয়। অর্থাৎ এক বিঘা জমির ফসলে কীটনাশক মেশানো অন্তত ৩২ লিটার পানি ছিটানোর প্রয়োজন হয়।
দেশের নারী কৃষকদের পৃথক তালিকা এবং কীটনাশকের নিরাপদ ব্যবহারের প্রশিক্ষণ সম্পর্কে জানতে যোগাযোগ করা হয় বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম সমকালকে বলেন, ফার্মার ফিল্ড স্কুল বা এফএফএসের মাধ্যমে সারাদেশের কৃষকদের মধ্যে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ২০ থেকে ৩০ জন কৃষক নিয়ে এক একটি দল করে তাদের অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষণ দেওয়া হয়।
আব্দুর রহিম বলেন, নিয়মই হলো প্রশিক্ষণে নারী কৃষকের উপস্থিতি ৩০ শতাংশ হতে হবে। এতে কৃষকদের নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন থেকে কীটনাশকের নিরাপদ ব্যবহার– এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয় সরকার। তবে পার্বত্যাঞ্চল এবং বরেন্দ্রাঞ্চল ছাড়া নারী কৃষকদের মাঠে কীটনাশক স্প্রে করতে সাধারণত দেখা যায় না।
কিন্তু সমকালের জরিপ এবং সরেজমিন সংগৃহীত তথ্য বলছে, সংখ্যায় কম হলেও নারী কৃষকরাও মাঠে স্প্রে করে থাকেন। তারা প্রতিদিন কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের সংস্পর্শে আসছেন; এবং এ বিষয়ে তাদের সচেতনতা কম। একই চিত্র দেখা যায় ‘ফ্রম দ্য গ্রাউন্ড আপ’ প্রতিবেদনেও। এখানে উঠে এসেছে বাংলাদেশে ৮৩১ জন নারী ও পুরুষ কৃষকের মধ্যে ১২৮ জন নারী কৃষক সরাসরি ফসলের মাঠে কীটনাশক স্প্রের কাজ করেন।
ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন-ডব্লিউএইচও বলছে, কীটনাশকের অনিরাপদ ব্যবহার তাৎক্ষণিক বিষক্রিয়া ছাড়াও দীর্ঘমেয়াদে স্নায়ুতন্ত্র, ত্বকসহ বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ায়। কৃষি শ্রমিকরা এ ঝুঁকির সবচেয়ে বেশি মুখোমুখি হন।
দেশের সবজি উৎপাদনে বালাইনাশকের অনিরাপদ ব্যবহার ও স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অ্যাজমা, বক্ষব্যাধি ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল সমকালকে বলেন, কীটনাশকের প্রভাবে মানুষের শরীরে তাৎক্ষিণকভাবে চুলকানি, চোখে ঝাপসা দেখা, কাশি ও বমিভাব হবে। আর দীর্ঘমেয়াদে হবে ফুসফুসের সমস্যা। এতে শ্বাসকষ্ট ও আইএলডি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ ছাড়া দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হওয়া, ত্বকের সমস্যা এবং শরীরে কীটনাশকের বিষক্রিয়া হতে পারে। বিষক্রিয়া থেকে লিভার, কিডনিসহ অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে সমস্যা হতে পারে।
২০০৫ সালে নারীগ্রন্থ প্রবর্তনার প্রকাশিত সর্বনাশা বিষ, নারী ও কীটনাশকের ব্যবহার বইয়ে নারী কৃষকদের দুর্ভোগের চিত্র পাওয়া যায়। টাঙ্গাইলের রাবেয়া বলেছিলেন, কীটনাশক ব্যবহারের কাজে যুক্ত হওয়ার পর থেকে তাঁর গর্ভের সন্তান ৩ থেকে চার মাসের বেশি বাঁচে না। তাঁর এলাকায় আত্মহত্যার সংখ্যাও বাড়ছে। আর কক্সবাজারের কৃষক রূপবান বেগম জানিয়েছিলেন কীটনাশক থেকে একজনের মৃত্যুর ঘটনা কেন্দ্র করে তাঁর পরিবারটি কীভাবে শেষ হয়ে গিয়েছিল– সেই মর্মান্তিক ঘটনা।
দুই যুগ পর এসে গত জুনে যশোরের ছাতিয়ানতলার নারী কৃষক জেসমিন বলেছেন, তাদের গ্রামে অনেক নারীর গর্ভপাতের সমস্যা হচ্ছে।
কীটনাশকের অনিরাপদ ব্যবহারে নারী কৃষকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রসঙ্গে জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল সমকালকে বলেন, সরাসরি কীটনাশক না ছিটালেও নারী কৃষক মাঠে যান এবং ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসেন। পুরুষ ও নারী উভয়েরই একই ক্ষতি হয়। তবে নারীর ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় যোগ হয়; সেটি বন্ধ্যত্ব। একটি পরিবারের নারী তখন আরও অবহেলার শিকার হয়। আর নারী ও পুরুষের চিকিৎসা সমান গুরুত্ব পায় না।
আবু জামিল ফয়সাল বলেন, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের নীতিমালা কঠোর করতে হবে। নীতিমালা মানা হচ্ছে কিনা তা নজরদারিতে রাখতে হবে। নারী কৃষকদের পৃথক তথ্যভান্ডার (ডেটাবেজ) করতে হবে। খাদ্য উৎপাদনের পেছনের মানুষটিকে মর্যাদা দিতে এই তথ্যভান্ডার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
[জরিপ পরিচালনা করেছেন সমকালের ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, কুমিল্লা, জামালপুর, পাবনা, নাটোর, বগুড়া, দিনাজপুর, রংপুর, সিরাজগঞ্জ এবং নীলফামারী জেলার প্রতিনিধিরা। প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন সমকালের যশোর প্রতিনিধি এস এম তৌহিদুর রহমান।]