মাদক কারবারির তথ্য দিলে ফাঁস হয়ে যায় পরিচয়
গাজীপুরের শ্রীপুরে র্যাব-১ এর টাউন হল সভায় নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন শিক্ষক মো. শাহাব উদ্দিন
গাজীপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:২৯ | আপডেট: ১২ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:৫৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
মাদক কারবারির তথ্য দিয়ে তাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন এক শিক্ষক। ভেবেছিলেন, এতে এলাকায় মাদকের বিস্তার কিছুটা হলেও কমবে। কিন্তু কয়েক দিন পরই সেই ব্যক্তি জামিনে বেরিয়ে ফোন করে হুমকি দেন ওই শিক্ষককে। তথ্যদাতা হিসেবে পরিচয় প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় এর পর থেকে মাদকবিরোধী অবস্থান নেওয়ার সাহস যেন অনেকটাই কমে গেছে তাঁর।
গাজীপুরের শ্রীপুরে র্যাব-১ এর টাউনহল সভায় নিজের এমন তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন শিক্ষক মো. শাহাব উদ্দিন। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলা প্রশাসনের ক্ষণিকা সভাকক্ষে র্যাব-১-এর গাজীপুরের পোড়াবাড়ী ক্যাম্পের আয়োজনে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।
শিক্ষক শাহাব উদ্দিনের মতো অভিজ্ঞতার কথা উঠে আসে সভায় অংশ নেওয়া অন্যদের বক্তব্যেও। তাদের অভিযোগ, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে তথ্য দিতে গিয়ে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। অন্যদিকে গ্রেপ্তারের পর দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আসা আসামিদের পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ায় স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয় হতাশা ও ভয়। এই ভয় কাটিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান জানানো হয় গাজীপুরের শ্রীপুরে র্যাব-১ আয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক টাউনহল সভায়।
শিক্ষক মো. শাহাব উদ্দিন জানান, থানায় একজন মাদক কারবারির বিষয়ে তথ্য দেওয়ার পর পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। কিছুদিন পর ওই ব্যক্তি ছাড়া পেয়ে তাঁকে ফোন করে হুমকি দেন। এভাবে পরিচয় প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে তথ্য দিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি হচ্ছে বলে জানান তিনি।
সভায় চিকিৎসক ও রাজনীতিক ডা. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, মাদক কারবারিদের ধরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় কাজ করে। কারণ, গ্রেপ্তারের পর অল্প সময়ের মধ্যেই অনেকে ছাড়া পেয়ে আবার এলাকায় ফিরে এসে তথ্যদাতাদের ভয়ভীতি দেখান। এ আতঙ্ক দূর করা গেলে স্থানীয় মানুষ আরও সাহসের সঙ্গে মাদকের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবেন। মাদক নির্মূলে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
মাদক ব্যবসায়ীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সমাজের বিত্তশালী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয় সভায়। শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান নয়; পুনর্বাসন ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার মাধ্যমে মাদক থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর ওপরেও গুরুত্ব দেন বক্তারা।
রাজাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক গোলাম মুর্শেদ মুরাদ বলেন, এলাকায় মাদক বিক্রির নির্দিষ্ট কিছু স্পট রয়েছে। এসব স্পটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল বাড়ানো হলে মাদক বিক্রেতা ও সেবনকারী উভয়েই সতর্ক হবে। পাশাপাশি যারা মাদক ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান, তাদের সামাজিকভাবে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। এতে অনেকেই মাদকের পথ থেকে ফিরে আসতে উৎসাহিত হবেন।
শ্রীপুর পৌর বিএনপির সদস্য সচিব বিল্লাল হোসেন বেপারী বলেন, মাদকের মামলায় গ্রেপ্তার আসামি অনেকে কারাগার থেকে বেরিয়ে ফের একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে মাদক নির্মূল করা কঠিন হবে। একই সঙ্গে মানুষের মধ্যে র্যাবের প্রতি আগের মতো আস্থা ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানান তিনি।
সভায় তথ্যদাতাদের নিরাপত্তা নিয়ে আশ্বস্ত করেন র্যাব-১ গাজীপুর পোড়াবাড়ী ক্যাম্পের কমান্ডার ইফতেখার আহমেদ। তিনি বলেন, মাদক কারবারির সংখ্যা অনেক; সেবনকারীর সংখ্যা আরও বেশি। তবে মূল ডিলার বা সরবরাহকারী হাতেগোনা। তাই তাদের শনাক্ত করে অভিযান জোরদার করতে চায় র্যাব।
তথ্যদাতাদের পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, তথ্যদাতার পরিচয় শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও তাঁর (র্যাব কমান্ডার) মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। র্যাবের এ কর্মকর্তা আরও বলেন, সমাজে বিভিন্ন অপরাধের পেছনে মাদকের ভূমিকা রয়েছে। তাই শুধু অভিযান চালিয়ে নয়; স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় সম্মিলিতভাবে মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
সভায় অংশ নেওয়া শ্রীপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি মাহফুল হাসান হান্নান বলেন, তথ্য দেওয়ার পর যদি নিরাপত্তা নিয়ে মানুষ নিশ্চিন্ত থাকতে না পারে, তাহলে মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়বে।
সভায় শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাহিদ ভূঞা, র্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, গণমাধ্যমকর্মীসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।