ঢাকা থেকে ফিরে শিক্ষার্থীদের বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল রনজিলার, ফিরলেন লাশ হয়ে
প্রিয় শিক্ষককে শেষবারের মতো দেখতে ছুটে আসেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও এলাকাবাসী। ছবি: সমকাল
বগুড়া ব্যুরো
প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬ | ১৯:২২
‘প্রতিদিন গাছে পানি দিবি, যত্ন করে বড় করবি।’ শিক্ষার্থীদের হাতে গাছ তুলে দিয়ে এভাবেই বলতেন প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভিন রুলি। স্কুলে যারা নিয়মিত আসত না, তাদের নামও লিখে রাখতে বলেছিলেন তিনি। ঢাকা থেকে ফিরে ওই শিক্ষার্থীদের বাড়িতে গিয়ে স্কুলে না আসার কারণ জানতে চাওয়ার কথা ছিল তার। ঢাকা থেকে ফিরলেন ঠিকই, তবে লাশ হয়ে।
রোববার দুপুরে লাশবাহী ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে করে রনজিলা পারভিনের মরদেহ তার কর্মস্থল বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেওয়া হয়। প্রিয় শিক্ষককে শেষবারের মতো দেখতে সেখানে ছুটে আসে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও এলাকাবাসী। তাদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ।
রনজিলা পারভিন দীর্ঘ ৩৮ বছর শিক্ষকতা করেছেন এই বিদ্যালয়ে। ১৯৮৮ সালে সহকারী শিক্ষক হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু হয়। পরে তিনি বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক হন। শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতেন তিনি। দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের পোশাকসহ বিভিন্ন প্রয়োজনেও ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতা করতেন।

‘ম্যাডাম বলেছিলেন, গাছ দুটি যত্ন করে বড় করবি’
বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহফুজা আক্তার বলে, ‘ম্যাডাম আমাকে দুটি গাছ দিয়ে বলেছিলেন, প্রতিদিন গাছে পানি দিবি, যত্ন করে বড় করবি। স্কুলে এলেই ক্লাসের ফাঁকে আমার মতো অন্যদের গাছেরও খোঁজ নিতেন।’
মাহফুজা আরও বলে, ‘আমাদের শ্রেণির যে ছাত্র-ছাত্রীরা নিয়মিত স্কুলে আসত না, বৃহস্পতিবার ম্যাডাম তাদের নাম লিখে রাখতে বলেছিলেন। বলেছিলেন, ঢাকা থেকে ফিরে আমাদের সঙ্গে নিয়ে তাদের বাড়িতে যাবেন। কেন স্কুলে আসে না, তা জানতে চাইবেন।’
আরেক শিক্ষার্থী কাকলি বলে, ‘ম্যাডাম আমাদের যেমন আদর করতেন, তেমনি পড়া না পারলে বকাও দিতেন। ম্যাডাম খুব ভালো ছিলেন। মাঝে মাঝে ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে চকলেট বের করে দিতেন।’
শিক্ষার্থীরা জানায়, প্রতিদিন স্কুলে পৌঁছেই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জড়িয়ে ধরতেন রনজিলা পারভিন। কে পড়া শিখেছে, কে স্কুলে আসেনি, কার বাড়িতে কী সমস্যা- সবকিছুর খোঁজ রাখতেন তিনি।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘আমরা মাঝে মধ্যে ছুটি নিলেও ম্যাডাম ছুটি নিতেন না। তিনি সবার আগে স্কুলে আসতেন। ঝড়-বৃষ্টিতেও কখনো স্কুল মিস করেননি। তিনি যেমন নমনীয় ছিলেন, তেমনি পাঠদানের বিষয়ে কঠোর ছিলেন। যেকোনো সমস্যা বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মোকাবিলা করতেন।’
বিদ্যালয়টির নাম বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হলেও সেখানে ছাত্রও ভর্তি আছে। বর্তমানে ৮৬ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।

বিদ্যালয় মাঠে প্রথম জানাজা
রনজিলা পারভিনের মরদেহ ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে রেখেই বিদ্যালয় মাঠে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সহস্রাধিক মানুষ অংশ নেন।
নশিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রোকনুজ্জামান তালুকদার বলেন, ‘বিদ্যালয়টিতে আমি মাঝেমধ্যে আসি। গত ২০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী স্কুলসংলগ্ন বাগবাড়ি শহীদ জিয়া কলেজ মাঠে এসেছিলেন। ওই দিন প্রধান শিক্ষিকা রনজিলা পারভিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে স্বর্ণের চাবি দিয়ে বরণ করে নেন।’
গাবতলী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কামরুল হাসান বলেন, ‘শিক্ষক হিসেবে রনজিলা পারভিন ছিলেন অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও নিবেদিতপ্রাণ। তার এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত।’

চোখের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় গিয়ে মৃত্যু
রনজিলা পারভিন চোখের চিকিৎসার জন্য পোশাক ব্যবসায়ী স্বামী আব্দুল মতিনের সঙ্গে বগুড়া থেকে ঢাকায় গিয়েছিলেন। শুক্রবার রাত ১২টার দিকে তারা শ্যামলী পরিবহনের একটি কোচে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন।
ঢাকার কল্যাণপুরে বাস থেকে নামার পর রিকশায় করে ইস্পাহানী চক্ষু হাসপাতালে যাওয়ার পথে সংসদ ভবন এলাকায় ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন তারা। সেখানেই প্রাণ হারান রনজিলা পারভিন।
শনিবার রাত ১২টার দিকে ঢাকা থেকে তার মরদেহ বগুড়া শহরের রহমাননগরের বাসায় নেওয়া হয়। স্বামী আব্দুল মতিন জানান, মরদেহ নিয়ে বাসায় পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ফোন করে তাদের খোঁজখবর নেওয়া হয়।
জানাজায় দাঁড়িয়ে আব্দুল মতিন বলেন, ‘আমার চোখের চিকিৎসার জন্য স্ত্রীকে ঢাকায় নিয়ে গিয়েছিলাম। অথচ আমি ঠিক থাকলাম, আর সে লাশ হয়ে ফিরে এল। এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না।’
তিনি স্ত্রীর জন্য সবার কাছে দোয়া চান। একই সঙ্গে তার স্ত্রী কোনো ভুল বা ত্রুটি করে থাকলে ক্ষমা করে দেওয়ার অনুরোধ করেন। রনজিলা পারভিনের মৃত্যুর ঘটনায় উপযুক্ত বিচারও দাবি করেন তিনি।
বাদ আসর গাবতলীর দারাইল এলাকার তরফসরতাজ গ্রামে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে তরফসরতাজ পারিবারিক কবরস্থানে রনজিলা পারভিনকে দাফন করা হয়।
- বিষয় :
- বগুড়া
- শিক্ষক
- চিকিৎসা
- ছিনতাইকারী
- মৃত্যু