আইনজীবী, কোর্ট জিআরওর বিরুদ্ধে মামলার নির্দেশ
গাইবান্ধা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রাপ্তবয়স্ক চার আসামিকে শিশু দেখিয়ে জাল জন্মসনদ ও ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে জামিন নেওয়া, আদালতের অর্ডার শিটের আদেশ কাটাকাটি এবং নথি গায়েব করার অপরাধে গাইবান্ধা জেলা বারের আইনজীবী, গোবিন্দগঞ্জ কোর্ট জিআরও (আদালত ও পুলিশের মধ্যে মামলার নথিপত্র ও কার্যক্রম সমন্বয়কারী কর্মকর্তা) ও মুহুরিসহ তিনজনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা দায়েরের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। বুধবার গাইবান্ধা শিশু আদালত-২ এর বিচারক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইফতেখার বিন আজিজ এ আদেশ দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে আদেশটি গোবিন্দগঞ্জ থানায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
জানা গেছে, গোবিন্দগঞ্জ থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে গোবিন্দগঞ্জের বিভিন্ন স্থান থেকে অনলাইন হ্যাকারসহ বিভিন্ন মামলায় পলাশ রানা, সুমন মিয়া, শামীম চৌধুরী ও এনামুল হক নামে চারজনকে গ্রেপ্তর করে। এর মধ্যে তাদের আত্মীয়স্বজন আসামিদের কারামুক্ত করতে আইনজীবী শেফাউল ইসলামের কাছে পরামর্শ নেন। তাঁর পরামর্শে আইনজীবী শেফাউল ইসলাম এনামুল হক নামে এক বিবাহিত যুবককে নাবালক ও শিশু প্রমাণ করতে জাল জন্মসনদ তৈরি করেন। পরে জাল জন্মসনদ দেখিয়ে তিনটি মামলায় প্রাপ্তবয়স্ক আসামিকে শিশু দেখিয়ে জামিন করানোর অভিযোগ ওঠে জেলা বারের আইনজীবী শেফাউল ইসলাম রিপনের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, আইনজীবী শেফাউল ইসলামের বিরুদ্ধে আসামিদের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে কোর্ট জিআরও, মুহুরি আব্দুস সবুরের সহযোগিতা নিয়ে আদালতের নথি গায়েব ও আদেশ কাটাকাটির অভিযোগও ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। ভুয়া কাগজ ও সাবালক আসামিদের নাবালক দেখিয়ে তাদের জামিন গ্রহণ করেন।
পরে বিষয়টি নিয়ে আইনজীবী সারোয়ার হোসেন, মোত্তালিব হোসেনসহ কয়েকজন আইনজীবী জামিন পাওয়া চার আসামির বিরুদ্ধে আদালতে জামিন বাতিলের আহ্বান জানান। জামিনের বিরোধিতা করায় আদালত বিষয়টি আমলে নিয়ে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেন। শিশু আদালত গাইবান্ধা-২ এর বিচারক এ বিষয়ে তদন্তভার দেন গোবিন্দগঞ্জ আমলি আদালতের বিচারক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এসএম গালিব হাসানকে। তিনি গত ১৯ আগস্ট শিশু আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়।
সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এসএম গালিব হাসান তাঁর তদন্ত রিপোর্টে সুপারিশ করেন, যেহেতু অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, সেই কারণে মূল অভিযুক্ত আইনজীবী শেফাউল ইসলাম রিপনের সনদ বাতিল, তাঁর মুহুরি হাসান আলীর নিবন্ধন বাতিল এবং দায়িত্বে অবহেলার কারণে গোবিন্দগঞ্জ চৌকি আদালতের তৎকালীন জিআরও পুলিশ সদস্য আব্দুস সবুরের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেন। তদন্ত প্রতিবেদনে এমন ঘটনাকে দেশের সামগ্রিক বিচার বিভাগের জন্য কালো অধ্যায় বলে পর্যবেক্ষণ দেন আদালত।
তদন্ত প্রতিবেদন প্রাপ্তির পর শিশু আদালতের বিচারক মোহাম্মদ ইফতেখার বিন আজিজ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গোবিন্দগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বেঞ্চ সহকারীকে বাদী হয়ে গোবিন্দগঞ্জ থানায় মামলা দায়েরের নির্দেশ দেন।
মামলা ও আদালত সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ২২ জুলাই গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাপমারা ইউনিয়নের তালুক রহিমাপুর গ্রামে অভিযান চালিয়ে আশিক মিয়া (২২) নামের এক হ্যাকারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এর পর একই বছরের ১৫ জুলাই হ্যাকার চক্রের অন্যতম সদস্য আসামি পলাশ রানাকে (২৫) গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার তাঁর শ্বশুরবাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে যৌথবাহিনী।
সেই মামলায় আসামি পলাশ রানার জামিনের শুনানি ছিল ২০২৫ সালের ১২ আগস্ট। এই মামলা শুনানির জন্য স্থানীয় আইনজীবী মোত্তালিব হোসেনের কাছে আসেন পলাশ রানার পরিবার। সেই সূত্রে মামলার বিষয়টি অবগত হন আইনজীবী সরোয়ার হোসেন বাবুল। কিন্তু মামলা শুনানির আগেই ৩ আগস্ট পলাশ রানা ও ১০ আগস্ট আসামি আশিক মিয়ার শিশু আদালত থেকে জামিন হওয়ার বিষয়টি জানতে পারেন আইনজীবী সরওয়ার হোসেন বাবুলসহ কয়েকজন আইনজীবী। সে সময় বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশের পর আদালত পাড়ায় আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এর পর আইনজীবী শেফাউল ইসলাম রিপনের বিরুদ্ধে একের পর এক জালিয়াতির তথ্য উঠে আসে। তখন তিনি বিষয়টি লিখিত আকারে গাইবান্ধা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক রেজাউল করিম সরকারের নজরে আনলে এ ঘটনার তদন্ত শুরু হয়।
আইনজীবী সরওয়ার হোসেন বাবুল সমকালকে বলেন, ‘আইনজীবী শেফাউল ইসলাম রিপনসহ একটি চক্র এই জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত। পুরো চক্রকে আইনের আওতায় আনা না গেলে আদালতের মতো একটি জায়গায় এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা আরও ঘটতে পারে। আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি।’
এ ব্যাপারে আইনজীবী শেফাউল ইসলামের মোবাইলে একাধিকবার কল করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
মামলার ব্যাপারে জানতে চাইলে শুক্রবার দুপুরে গোবিন্দগঞ্জ থানার ওসি মোজাম্মেল হক মোবাইল ফোনে জানান, ‘মামলার আদেশটি এখনও থানায় আসেনি। আদেশটি পাওয়া মাত্রই আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী মামলার প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হবে।’
- বিষয় :
- আইনজীবী