একশ শয্যার হাসপাতালে সপ্তাহ ধরে ভর্তি তিনশর বেশি রোগী
হাসপাতালের মেঝেতেও চলছে রোগীর চিকিৎসা। গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১১টায় সমকাল
রাজবাড়ী প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
একশ শয্যার রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে গত এক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিনই ভর্তি থাকছেন গড়ে ৩০০ জনের বেশি রোগী। হুট করে এ সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসক, নার্সসহ সংশ্লিষ্টদের। শয্যাসহ নানা সংকটে ভোগান্তিতে পড়েছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। এর মধ্যে প্রতিমাসে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা।
চিকিৎসকরা বলছেন, মূলত সিজনাল জ্বর নিয়ে অধিকসংখ্যক মানুষ হাসপাতালে আসছেন। তাদের অনেকে ভর্তি হচ্ছেন। এ কারণে সম্প্রতি রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেছে। অনেকের ডেঙ্গু বা হামের মতো অসুখ শনাক্ত হচ্ছে। অনেকে সাধারণ জ্বরের চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছাড়ছেন। এর বাইরে গরম বেড়ে যাওয়ায় ডায়রিয়ার সমস্যাও দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, গতকাল মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ৩১৩ জন রোগী। এর মধ্যে ডেঙ্গু সাতজনের, হাম ছয়জনের। আগের দিন সোমবার ভর্তি ছিলেন ৩৩০ জন। এর মধ্যে ১৮৬ জনকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত নতুন করে ১৪৪ জন ভর্তি হন।
জেলা সিভিল সার্জন অফিস সূত্র জানায়, চলতি অক্টোবর মাসে গতকাল পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে ৩৭ জন। সেপ্টেম্বরে এ সংখ্যা ছিল ১৫১ এবং আগস্টে ছিল ৬৮। এছাড়া জুন মাসে ছিল ১৭ ও জুলাইয়ে ২২ জন। অর্থাৎ প্রতি মাসে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে দ্বিগুণেরও বেশি।
গতকাল মঙ্গলবার গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডে রোগীতে পরিপূর্ণ। ভেতরে জায়গা না পেয়ে রোগীরা থাকছেন বারান্দায়; এমনকি করিডোরেও। আলাদা রাখার ব্যবস্থা না থাকায় সাধারণ রোগীদের সঙ্গে থাকছেন ডেঙ্গু রোগীরা। তবে তাদের মশারির মধ্যে রাখা হচ্ছে।
নিচতলায় পুরুষ ওয়ার্ডে ভর্তি রাজবাড়ী
শহরের ধুঞ্চি গ্রামের বাসিন্দা মইনুল জানান, তিনি ঢাকায় গার্মেন্টসে চাকরি করেন। জ্বর নিয়ে বাড়ি ফিরে গত বৃহস্পতিবার পরীক্ষা করে জানতে পারেন ডেঙ্গু হয়েছে। এরপর হাসপাতালে ভর্তি হন।
এখনও পুরোপুরি সুস্থ না হলেও শারীরিক অবস্থার অনেকটাই উন্নতি হয়েছে। চিকিৎসা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।
নিচতলার বারান্দায় শয্যা পেতে মশারি টাঙিয়ে অবস্থান করছেন সদর উপজেলার অন্তারমোড় গ্রামের বাসিন্দা হৃদয়। তার মা রওশন আরা বেগম জানান, সাত দিন ধরে ছেলের জ্বর। গত রোববার ভর্তি করান হাসপাতালে। শয্যা না পাওয়ায় বারান্দায় আছেন। সোমবার একটি শয্যা খালি হওয়ার পর সেখানে যেতে বলা হয়েছিল। সেখানে প্রচণ্ড গরম। এ কারণে এখানেই আছেন। চিকিৎসা নিয়ে তাঁর কোনো অভিযোগ নেই।
সদর উপজেলার বাণিবহ গ্রামের বাসিন্দা উজ্জ্বল হোসেন জানান, পেট ব্যথা নিয়ে সোমবার ভর্তি হয়েছেন। শয্যা না পেয়ে বারান্দায় থাকছেন।
তোফাজ্জেল হোসেন জানান, তাঁর শরীরে জ্বর আছে। পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়েনি। শারীরিক অবস্থা খুব একটা ভালো না। এ কারণে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। শয্যা না পেয়ে বারান্দায় থাকছেন তিনি।
রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. রাজীব দে সরকার জানান, সম্প্রতি হাসপাতালে রোগীর চাপ ব্যাপক বেড়েছে। গড়ে তিনশ থেকে সাড়ে তিনশ রোগী ভর্তি থাকছে প্রতিদিন। অথচ হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা মাত্র ১০০। বাধ্য হয়ে রোগীদের হাসপাতালের বারান্দা ছাড়িয়ে করিডোরে শয্যা পেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এত বেশি রোগীকে চিকিৎসা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসকদের। যেখানে ৬৭ জন চিকিৎসক থাকার কথা, সেখানে আছেন মাত্র ২৬ জন। রাউন্ড দিতে গিয়ে তাদের সময় পার হয়ে যায়। তিনি আরও জানান, এখন ডেঙ্গু ও হামের মৌসুম চলছে। পাশাপাশি গরমে ডায়রিয়া রোগীর চাপও বেড়েছে। এসব কারণে রোগীর চাপ বেশি। হাসপাতালে ডেঙ্গু জ্বরের জন্য আলাদা ওয়ার্ড নেই, তাই তাদের আলাদা করে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
রাজবাড়ীর সিভিল সার্জন ও সদর হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. এমএ মাসুদ জানান, হাসপাতালে আলাদা ওয়ার্ড করার মতো জায়গা না থাকায় ডেঙ্গু রোগীদের সাধারণ রোগীদের সঙ্গে রাখা হয়েছে। তবে তাদের মশারি দেওয়া হয়েছে। মশারির টাঙানো থাকলে অনেকটা নিরাপদ বলা যায়। অনেক সময় রোগীদের মশারি টাঙিয়ে রাখার কথা বলা হলেও তারা খুলে ফেলেন। হাসপাতালের ভেতরে গরম ও গুমোট পরিবেশের বিষয়ে বলেন, একশ শয্যার হাসপাতালে তিনশর বেশি রোগী ভর্তি থাকায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তারা রোগীদের সেবা দিতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
- বিষয় :
- হাসপাতাল