ডিসির উদ্যোগে এতিম খুশির সম্ভ্রান্ত বিয়ে
বিয়ের অনুষ্ঠানে বর-কনের সঙ্গে অতিথিদের কয়েকজন -সমকাল
রংপুর অফিস
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০১৯ | ১০:০৭
বউ সেজে মঞ্চে বসে ছিল মেয়েটি। লাজুক লাজুক দৃষ্টি। চোখে-মুখে আনন্দও ঝিলিক দিয়ে উঠছে ক্ষণে ক্ষণে। চারপাশে কত লোকজন, কত আয়োজন, খানাদানা, গানবাজনা। রংপুর নগরীর পর্যটন মোটেলে বৃহস্পতিবারের দৃশ্য এটি।
জাকজমকপূর্ণ এই অনুষ্ঠানের মধ্যমনি যিনি, তার নাম খুশি খাতুন। এতিম তো এতিম, বাবা-মারও পরিচয় নেই। ছোটবেলায় এক বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করতো। গৃহকর্ত্রীর নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। পরে পুলিশর এবং ঠাকুরগাঁও জেলা শিশুকল্যাণ বোর্ড রংপুর সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহায়তায় তার আশ্রয় মেলে শেখ রাসেল শিশু কেন্দ্রে। সেটা ২০১৪ সালের ২৫ এপ্রিলের কথা। সেখানেই তার বেড়ে উঠা।
বৃহস্পতিবার রংপুরে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এতিম খুশির জাকজমকপূর্ণ বিয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। নগরীর পর্যটন মোটেলে এ বিয়েতে অংশ নিতে আসেন প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ব্যক্তি, সাংবাদিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা। সমাজে অবহেলিত এতিমদের পাশে জেলা প্রশাসনের এমন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন সর্বমহলের মানুষ।
জেলা প্রশাসন ও সমাজসেবা সূত্রে জানা যায়, শেখ রাসেল শিশু কেন্দ্রে ভর্তির পর সেখানে দেখতে দেখতে খুশির বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হয়। তাকে কারুপণ্য নামে শতরঞ্জি তৈরি প্রতিষ্ঠানে চাকরি দেওয়া হয়। এর পরের ঘটনা অন্যরকম। খুশির বিষয়টি রংপুরের জেলা প্রশাসক আসিব আহসানের নজরে আসে। তিনি খুশিকে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এনিয়ে প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সুশীল সমাজ ও সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনা করেন। শুরু হয়ে যায় খুশির জন্য পাত্র দেখা। পেয়েও যান জুতসই একটি পাত্র। রংপুর নগরীর নিউ সাহেবগঞ্জ এলাকার আজিজুল ইসলামের ছেলে লিমন মিয়ার সঙ্গে খুশির বিয়ে ঠিক করেন জেলা প্রশাসক। ছেলেটি পেশায় রাজমিস্ত্রী। গত বুধবার খুশির গায়ে হলুদ দেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার বিকেলে রংপুর পর্যটন মোটেলে উৎসবমুখর পরিবেশে বিয়ের আয়োজন করা হয়। সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়ের বিয়ের আয়োজনে যা যা থাকে, এর সব আয়োজনই ছিল সেখানে। জাকজমকভাবে বর-বউয়ের মঞ্চ সাজানো হয়। মঞ্চের চারদিকে ফুল দিয়ে সাজানো ও লাইটিং। পাশেই ব্যবস্থা করা হয় সংগীতের আসর। জাতীয় ও স্থানীয় শিল্পীরা গান গেয়ে বিয়ের আসর মাতিয়ে রাখেন। বিয়েতে নিমন্ত্রণ করা হয় প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সমাজসেবা অধিদপ্তরের শিশু পূনর্বাসন কেন্দ্রের শিশুদের, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, সাংবাদিক ওবিভিন্ন পেশার মানুষকে।
বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দেন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার জাকির হোসেন, আবু তাহের মো. মাসুদ রানা, রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য্য, পুলিশ সুপার বিপ্লব কুমার সরকার, রংপুর মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার মহিদুল ইসলাম, রংপুর চেম্বারের সভাপতি মোস্তফা সোহরাব চৌধুরী টিটু, মেট্রোপলিটন চেম্বারের প্রেসিডেন্ট রেজাউল ইসলাম মিলন, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোতাহার হোসেন মন্ডল মওলাসহ অন্যরা। প্রীতিভোজ ও আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাতে বিদায় দেওয়া হয় কনেকে।
বিয়ে অনুষ্ঠানে বর লিমন মিয়া বলেন, 'আমি কখনো ভাবিনি এত জাকজমকভাবে বিয়ের অনুষ্ঠান হবে। প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ সমাজের বড় বড় মানুষ এখানে এসেছেন। আমার খুবই ভালো লাগছে।'
কনে সেজে খুশি খাতুন বলেন, 'প্রশাসনের প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা জানাই, তারা আমার বিয়ে এত ধুমধাম করে আয়োজন করেছে। আমার খুবই ভালো লাগছে। সবাইকে দেখে আমার মনে হচ্ছে না যে আমি এতিম। এভাবেই আমার পাশে সবাই থাকবেন বলে আশা করছি।'
জেলা প্রশাসক আসিব আহসান বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে এতিম খুশিকে যৌতুক ছাড়াই বিয়ে দিতে পেরে খুব ভালো লাগছে। তারা যেন সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারে সেজন্য তাদের নামে পারিবারিক পেনশনের ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা অব্যহত থাকবে।
রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য্য বলেন, এটি একটি ব্যতিক্রমী আয়োজন। তারা যে সমাজে একা নয়, তারই স্বাক্ষর রেখেছে বিয়ের এই অনুষ্ঠান। আমি চাই অসহায়দের পাশে বিত্তবানরা দাঁড়াবে এবং সামনে তাদের পথ চলার শক্তি জোগাবে।
