ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সামান্যের ভয়ে বিশাল ঝুঁকি

সামান্যের ভয়ে বিশাল ঝুঁকি
×

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০৪ মার্চ ২০২২ | ১৪:০৬

যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে এমভি বাংলার সমৃদ্ধি জাহাজকে কেন ইউক্রেনে পাঠানো হলো, সেই প্রশ্ন বারবারই ঘুরেফিরে আসছে। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) দাবি করছে, অনুমতি না দিলে তাদের বড় অঙ্কের জরিমানা গুনতে হতো। টাকার অঙ্কে যা ছয় কোটি টাকার মতো। এখন আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে- ছয় কোটি টাকার ভয়ে ২০৪ কোটি টাকার জাহাজকে ঝুঁকিতে ফেলা হলো? বিএসসি জরিমানার বিষয়টি সামনে আনলেও আইন বলছে ভিন্ন কথা। আর রাশিয়ার রকেটের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলার সমৃদ্ধি কবে ফিরিয়ে আনা যাবে, তা জানে না কেউ।

বাল্টিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম কাউন্সিল (বিআইএমসিও) ওয়ার রিস্ক ক্লজ ফর টাইম চার্টারিংয়ের (কনওয়ারটাইম ২০১৩) 'বি' ধারায় বলা আছে- যুদ্ধের ঝুঁকি আছে- এমন কোনো স্থানে জাহাজের মালিক বা মাস্টার যুক্তিসংগত কারণে যেতে বাধ্য নন। তাই প্রশ্ন এসেই যায়, তাহলে কেন যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে ইউক্রেনে বাংলার সমৃদ্ধিকে পাঠালো বিএসসি। আবার গত ১৫ ফেব্রুয়ারি জয়েন্ট ওয়ার কমিটি অলভিয়া বন্দর সংলগ্ন এলাকাকে যুদ্ধকবলিত অঞ্চল ঘোষণা করেছিল। তাহলে ২২ ফেব্রুয়ারি ২৯ নাবিককে কেন ঝুঁকি নিয়ে ওই অঞ্চলে প্রবেশ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। শিপিং করপোরেশন বলছে, যুদ্ধকালীন ভেনেজুয়েলায় যেতে এমন আপত্তি করায় তাদের থেকে ছয় কোটি টাকা দাবি করেছিল চার্টারার প্রতিষ্ঠান। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দাবি করা এই টাকা পরিশোধ করতে হয়নি বিএসসিকে। যুদ্ধ ঝুঁকিস্থানে যেতে বাধ্য না হওয়ায় এখনও বিষয়টি ঝুলে আছে।

'এমভি বাংলার সমৃদ্ধি' জাহাজটি ২০৪ কোটি টাকায় কেনা হয়। ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর বিএসসিকে জাহাজটি বুঝিয়ে দেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন (সিএমসি)। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে রকেট হামলায় গত বুধবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলার সমৃদ্ধি। গোলার আঘাতে নিহত হয়েছেন জাহাজে থাকা থার্ড ইঞ্জিনিয়ার প্রকৌশলী হাদিসুর রহমান। জাহাজটিতে আগুনও ধরে যায়। সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিএসসির অদূরদর্শিতার কারণে এখন বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে ২০৪ কোটি টাকার এই সম্পদ। কখন যুদ্ধ শেষ হবে, কখন চ্যানেল নিরাপদ হবে; তার ওপর নির্ভর করছে এ জাহাজের ভবিষ্যৎ। দীর্ঘদিন জাহাজটি পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকলে এটির আর্থিক মূল্য কমবে বলে মনে করছে জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান।

বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তারা বলছেন, এখন পর্যন্ত যা তথ্য জেনেছি, জাহাজটির ইউক্রেনে যাওয়া এড়ানো যেত। এখানে বিএসসির গাফিলতি ছিল বলেই আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে। জাহাজ পরিচালনায় বিএসসির সার্বিক অব্যবস্থাপনার কারণে আমাদের আজ এই মৃত্যু ও নাবিকদের দুর্দশা দেখতে হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় মূল্যবান সম্পত্তি বাংলার সমৃদ্ধির চরম ক্ষতি হয়েছে। এই মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতির দায় কে নেবে?'

জাহাজটি আগের অবস্থায় ফিরতে লাগবে দীর্ঘসময়: জানা যায়, পরিত্যক্ত ঘোষণা করা বাংলার সমৃদ্ধিকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে হলে লাগবে দীর্ঘসময়। যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। চ্যানেলে কোনো মাইন পোতা নেই- সেই বিষয়টিও নিশ্চিত হতে হবে। এ দুটি ধাপ নিশ্চিত হলে টাগবোট দিয়ে জাহাজটিকে টেনে নিতে হবে নিরাপদ কোনো ইয়ার্ডে। সেখানে মেরামত শেষে এটি আনা যাবে দেশে। তবে বিএসসি মেরামতের এই টাকা জাহাজটির ভাড়াটিয়া প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাবে কিনা, তা চুক্তির শর্তের ওপর নির্ভর করছে। বিএসসি 'ওয়ার রিস্ক কাভারেজ' আছে বললেও গত দু'দিনে এ-সংক্রান্ত কোনো নথি দেখাতে পারেনি। সবমিলিয়ে বাংলার সমৃদ্ধি জাহাজটি আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে বিএসসিকে পোড়াতে হবে অনেক কাঠখড়।

বাংলাদেশে জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, জাহাজটির ব্রিজ ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এটি কতটা গুরুতর, তা বুঝতে সার্ভে করতে হবে। মেরামত কার্যক্রম যথাযথভাবে সম্পন্ন হওয়ার ওপর নির্ভর করবে এ জাহাজটির পরবর্তী ভবিষ্যৎ।' সব প্রক্রিয়া শেষ করতে দীর্ঘসময় লাগতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ক্ষতিপূরণ পাবে কিনা তা নিয়েও আছে সংশয়: আন্তর্জাতিক জরিপ ও ইন্স্যুরেন্স প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকা পিঅ্যান্ডআই সার্ভিসেস লিমিটেডের ক্যাপ্টেন (অব.) আহমেদ রুহুল্লাহ বলেন, জাহাজ ভাড়া নেওয়া প্রতিষ্ঠান চাইবে তার খরচের টাকা তুলে আনতে। মালিকপক্ষ আপত্তি করলে তারা জরিমানাও চাইতে পারে। কিন্তু তাদের এ চাওয়া যৌক্তিক কিনা, তা নির্ধারণ করবে আইন। বাংলার সমৃদ্ধি জাহাজ মেরামতে খরচ কে বহন করবে, তা নির্ধারণ করবে উভয়ের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি।

দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজের জরিপ ও ইন্স্যুরেন্স নিয়ে কাজ করে মেরিন কেয়ার অ্যাসোসিয়েটসও। প্রতিষ্ঠানটির এমডি ক্যাপ্টেন জিল্লুর রহমান উদাহরণ দিয়ে বলেন, ধরুণ আপনি একটি গাড়ি ভাড়া নিয়েছেন। এখন সেই গাড়িটি কোনো দুর্গম এলাকায় যেতে চায়। গাড়িটিকে আপনি যেতে দেবেন কিনা, তা নির্ভর করবে মালিকের সিদ্ধান্তের ওপর। গাড়ির ঝুঁকি ইন্স্যুরেন্স থাকলে তিনি দিতে পারেন। কিন্তু এটির সঙ্গে প্রাণহানির বিষয় যুক্ত থাকলে মালিককে ভাবতে হবে দশবার। কারণ, কোনো অঙ্ক দিয়ে জীবনের বিনিময় হয় না। এমভি বাংলার সমৃদ্ধির ক্ষেত্রেও এ উদাহরণ প্রযোজ্য।

ইউক্রেনে জাহাজ পাঠাতে বাধ্য ছিল না বিএসসি: ইউক্রেনে জাহাজ না পাঠালে জরিমানা গুনতে হতো- বিএসসি নির্বাহী পরিচালক (বাণিজ্য) পীযূষ দত্ত এমনটি দাবি করলেও আইন বলছে ভিন্ন কথা। বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন (অব.) আনাম চৌধুরী বলেন, যুদ্ধাবস্থা চলছে এমন এলাকায় জাহাজ না পাঠানোর এখতিয়ার জাহাজ মালিক হিসেবে বিএসসির ছিল। আবার সমুদ্রে নাবিকদের জীবনের নিরাপত্তাবিষয়ক কনভেনশন 'ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য সেফটি অব লাইফ এট সি বা সোলাস'-এর পঞ্চম অধ্যায়ের ৩৪ ধারা অনুযায়ী জাহাজ মালিক বা চার্টারের (যিনি ভাড়া নেন) নির্দেশ উপেক্ষা করার এখতিয়ার রয়েছে জাহাজ মাস্টারেরও। বাংলাদেশ এ কনভেনশনের অনুশাসন মেনে চলে। আবার যে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ভাড়ার চুক্তি হয়েছে, সেখানেও যুদ্ধাবস্থায় কী করতে হবে বা কী করতে হবে না, তা উল্লেখ থাকে। ইউক্রেনে যেহেতু যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করছে, সেখানে জীবনের ঝুঁকি ছিল। আর যেখানে জীবন ঝুঁকিতে, সেখানে আসলে আইনেরও কোনো মূল্য নেই। পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনা করে ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারত বিএসসি।

একই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মেরিন ইঞ্জিনিয়ার মো. সাখাওয়াত হোসাইন বলেন, বিএসসি বলছে, চুক্তির শর্তের কারণে তারা জাহাজটি নিয়ে গেছে। আরেকটি তথ্য আমরা জানতে পেরেছি, একই চার্টারে বিএসসির আরেকটি জাহাজ ছিল। যেটি তারা যুদ্ধ লাগার পর ইউক্রেনে নিয়ে যেতে চায় এবং বিএসসি ২৬ ফেব্রুয়ারি তাদের 'না' বলে দেয়। তার মানে, ইউক্রেনে যেতে অস্বীকৃতি জানানোর অধিকার বিএসসির আছে। কিন্তু সে অধিকার তারা প্রয়োগ করেনি। আর সে কারণেই এ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। যে শর্তের কথা তারা বলেছে, তা সঠিক নয়।

বিএসসির গাফিলতি দেখছেন নাবিকরা: যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে জাহাজটি পাঠানোর সিদ্ধান্তে বিএসসির গাফিলতি দেখছে বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএমওএ)। বিএসসি যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নিত, তা হলে প্রাণহানির ঘটনাও এড়ানো যেত বলে মনে করেন সমুদ্রগামী বাণিজ্যিক জাহাজের নাবিকদের এই সংগঠনের নেতারা। এ ঘটনায় দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনতে তদন্ত কমিটি গঠনসহ চার দফা দাবিও জানিয়েছেন তারা। গতকাল শুক্রবার নগরের স্ট্র্যান্ড রোডে সংগঠনটির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তারা এসব দাবি জানান।

সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মেরিন ইঞ্জিনিয়ার মো. সাখাওয়াত হোসাইন বলেন, যেখানে ১৫ ফেব্রুয়ারি জয়েন্ট ওয়ার কমিটি ওই জায়গাকে যুদ্ধকবলিত অঞ্চল ঘোষণা করল, সেখানে কেন জাহাজটি জেনে-বুঝে ২২ ফেব্রুয়ারি ওই অঞ্চলে প্রবেশ করল? এটা সম্পূর্ণ প্রশ্নবিদ্ধ। তিনি বলেন, 'চার্টার পার্টি বিধিমালা অনুযায়ী কোনো জাহাজ কোম্পানি তার জাহাজের নিরাপত্তার জন্য যুদ্ধকবলিত এবং জলদস্যুপ্রবণ এলাকায় জাহাজ যাওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে। অথচ এ ক্ষেত্রে মালিক কর্তৃপক্ষ বিএসসির পক্ষ থেকে জাহাজটিকে যুদ্ধকবলিত এলাকায় যওয়ার অনুমতি দেওয়া হলো?

সাখাওয়াত হোসাইন আরও বলেন, কোন পরিস্থিতিতে কোন শর্তের কারণে বিএসসি জাহাজ পাঠাল? আমরা চাই একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি হোক। তাহলে কীভাবে বিএসসি জাহাজ অপারেট করেছে, কী কারণে সেখানে পাঠিয়েছে, তা জানা যাবে। ভবিষ্যতে আর এমন ঘটনা ঘটবে না। নাবিকদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- হাদিসুর রহমানকে 'রাষ্ট্রীয় বীর' ঘোষণা করে তার মরদেহ দেশে এনে দাফনের ব্যবস্থা করা, ২৮ নাবিককে অতি দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা, জাহাজ পরিচালনায় বিএসসির গাফিলতি তদন্তে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি করা, সেই কমিটিতে বিএমএমওএর দু'জন প্রতিনিধি রাখা এবং রকেট হামলার শিকার জাহাজ ধ্বংস থেকে রক্ষা করায় নাবিকদের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ও পুরস্কার দেওয়া।

বিএমএমওএ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বাংলার সমৃদ্ধি জাহাজের চিফ ইঞ্জিনিয়ার মো. ওমর ফারুক তুহিনের মা মোছাম্মৎ খায়রুন নেছা, মামা ক্যাপ্টেন এএফএম জহির উদ্দিন এবং ছোট ভাই ওমর শরীফ তুষারও উপস্থিত ছিলেন।

আরও পড়ুন

×