ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফেব্রুয়ারির মধ্যে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বসালে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ কিনবে সরকার

ফেব্রুয়ারির মধ্যে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বসালে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ কিনবে সরকার
×

ফাইল ছবি

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২২:১৮

গ্যাসের সংকট, জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের মধ্যে বিদ্যুতের বিকল্প উৎস বাড়াতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে বিশেষ প্রণোদনা দিয়েছে সরকার। আগামী বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ব্যাটারিসহ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করলে উৎপাদিত বিদ্যুৎ প্রথমে নিজের প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহার করা যাবে। এরপর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করলে প্রতি ইউনিটের জন্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা করে পাবেন গ্রাহক। এ সুবিধা ২০৩০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।

আজ মঙ্গলবার এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এদিন থেকেই সিদ্ধান্তটি কার্যকর হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বর্তমান বাজারদর এবং বিদ্যুৎ বিভাগের পাওয়া বিভিন্ন দরপত্রের দাম বিবেচনায় ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় প্রতি ইউনিট সর্বোচ্চ ৮ টাকা ধরা হয়েছে। এর ওপর ২০ শতাংশ মুনাফা এবং ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রিমিয়াম যোগ করে প্রতি ইউনিটের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা ৫০ পয়সা। কোনো গ্রাহক ৮ টাকার কম খরচে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারলে সাশ্রয় হওয়া অর্থ তাঁর লভ্যাংশ হিসেবে বিবেচিত হবে। ফলে কম খরচে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারলে গ্রাহকের বাড়তি সুবিধা থাকবে।

কীভাবে পাবেন ১০ টাকা ৫০ পয়সা
নেট মিটারিং নির্দেশিকা-২০২৫ অনুযায়ী, গ্রাহক নিজের স্থাপনায় উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ প্রথমে নিজে ব্যবহার করবেন। উৎপাদনের পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ নেট মিটারের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে যাবে। এই উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করার পর সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা এর পরিমাণের হিসাব রাখবে। সরকারের নির্ধারিত বিশেষ প্রণোদনা অনুযায়ী গ্রিডে দেওয়া প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য গ্রাহক ১০ টাকা ৫০ পয়সা করে পাবেন।

প্রণোদনার অর্থ তিন মাস পরপর গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হবে। কোনো অবস্থায় নগদে এ অর্থ দেওয়া যাবে না। বিতরণ কোম্পানিগুলো গ্রাহকের তথ্য, গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের পরিমাণ এবং প্রণোদনার হিসাব সংরক্ষণ করবে। তবে আগামী বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারির পর স্থাপন করা সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এ বিশেষ প্রণোদনা প্রযোজ্য হবে না।

সংকটে কেন ছাদে সৌরবিদ্যুৎ
বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম বড় বাধা জ্বালানি সংকট। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় অনেক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। এলএনজি সরবরাহেও অনিশ্চয়তা রয়েছে। পাশাপাশি কয়লা ও জ্বালানি তেল সরবরাহে চাপ থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে বিদ্যুতের ঘাটতি তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকাতেও দিনে একাধিকবার লোডশেডিং হয়েছে। শিল্পকারখানায় বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতিতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

এ অবস্থায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস বৈচিত্র্যময় করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। দিনের বেলায় বাড়ি, অফিস, দোকান ও কারখানার নিজস্ব বিদ্যুতের চাহিদা সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে মেটানো গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে। বাড়তি বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করা গেলে সংকটের সময় সেটিও কাজে লাগবে।

জমি ছাড়াই বাড়বে উৎপাদন
বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে বাংলাদেশে জমির সংকট রয়েছে। বড় প্রকল্পের জন্য বিপুল জমি প্রয়োজন হয়। কৃষিজমি ব্যবহার নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। এ কারণে বাসাবাড়ি, শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক ভবনের অব্যবহৃত ছাদ কাজে লাগানোর ওপর জোর দিচ্ছে সরকার।

ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এর জন্য নতুন করে জমি অধিগ্রহণ করতে হয় না। যে ভবনে বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে, সেখানেই উৎপাদন করা যায়। ফলে একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহার সম্ভব হয়।

চার হাজার ৪৯০টির বেশি নেট মিটার
স্রেডার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম দিকে দেশের ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির নেটওয়ার্কে ৪ হাজার ৪৯০টির বেশি নেট মিটারযুক্ত ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা ছিল। এসব ব্যবস্থার মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২১৪ মেগাওয়াট।

নেট মিটারিং ব্যবস্থায় গ্রাহক নিজের উৎপাদিত বিদ্যুৎ আগে নিজে ব্যবহার করেন। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে দেওয়া হয়। ২০১৮ সালে দেশে প্রথম নেট মিটারিং নির্দেশিকা জারি করা হয়। বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সেটি সংশোধন করে ২০২৫ সালের আগস্টে নতুন নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়।

নতুন প্রজ্ঞাপনের ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করে উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের জন্য নির্ধারিত হারে অর্থ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হলো।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ২০ শতাংশ লক্ষ্য
নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা-২০২৫ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের লক্ষ্য রয়েছে। ২০৪০ সালে এ লক্ষ্য ৩০ শতাংশ। এই লক্ষ্য পূরণে সৌরবিদ্যুৎকে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় উৎস হিসেবে দেখা হচ্ছে। বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বাড়াতে পারলে জমি ছাড়াই উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে।

প্রণোদনার আওতায় সৌর প্যানেল, ব্যাটারি, ইনভার্টার ও মিটারসহ সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতিকে নির্ধারিত কারিগরি মান পূরণ করতে হবে। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এবং টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) এসব মান নির্ধারণ করবে।

গ্রাহকদের নীতিগত সহায়তা দিতে বিদ্যুৎ বিভাগের ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টার থাকবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কার্যালয় থেকেও সহায়তা পাওয়া যাবে।

আরও পড়ুন

×