ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

করহার বাড়ানো হলে অর্থনীতির ক্ষতি হবে

করহার বাড়ানো হলে অর্থনীতির ক্ষতি হবে
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬ | ১২:১৮

করদাতারাই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) গ্রাহক। তারাই অর্থনীতিকে সচল রাখেন, দেশের জিডিপি বাড়ান, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন এবং জনগণের কাছে প্রতিশ্রুত সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন। গ্রাহকদের কষ্টের কথা না শুনে বিশেষজ্ঞ-আমলাদের ‘প্রেসক্রিপশন’ দিয়ে নানা কৌশলে করহার বাড়ানো হলে অর্থনীতির ক্ষতি হবে। বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, জিডিপি প্রবৃদ্ধি সবই কমে যাবে। 

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট সামনে রেখে ব্যবসায়ীদের সংগঠন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) এবং অর্থনৈতিক সাংবাদিকদের সংগঠন (ইআরএফ) আয়োজিত সেমিনারে দেশের অর্থনীতি ও কর ব্যবস্থাপনা নিয়ে এভাবে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা। গতকাল রোববার রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন এমসিসিআইয়ের সভাপতি কামরান টি. রহমান।

সেমিনারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ তাঁর বক্তব্যে নীতিনির্ধারণী এবং মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে বিশাল ব্যবধানের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তোপখানা রোডের দেয়ালের ভেতরে বসে তৈরি করা আইন অনেক সময় মতিঝিলের ব্যবসায়িক বাস্তবতায় প্রয়োগযোগ্য হয় না। ড. মজিদ বলেন, এনবিআরের উচিত হবে বেসরকারি খাতের জন্য নীতি তৈরির আগে নিজেদের মানসিকতার পরিবর্তন করা।

এনবিআরের কর আদায় থেকে নীতিনির্ধারণী বিভাগকে আলাদা করার ওপর জোর দিয়ে আব্দুল মজিদ বলেন, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা যেতে পারে। কমিটি বছরে অন্তত চারবার আনুষ্ঠানিকভাবে সভায় বসবে এবং যে কোনো এসআরও জারির আগে তা নিয়ে আলোচনা করবে, যাতে এর প্রভাব সম্পর্কে ব্যবসায়ীরা অবগত থাকেন। ড. মজিদ আরও বলেন, বাজেটের প্রস্তাবগুলো এপ্রিলের পরিবর্তে ডিসেম্বরের মধ্যে জমা দেওয়া এবং বিশ্লেষণ করা উচিত। কারণ, এপ্রিল নাগাদ বাজেট চূড়ান্ত হয়ে যায়, তখন সামান্য ‘লবণ’ বা ‘ঝাল’ কমানো ছাড়া বড় কোনো পরিবর্তনের সুযোগ থাকে না।

কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, উচ্চ করহার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে নিরুৎসাহিত করে। সরকার ১৫ শতাংশ কর-জিডিপি অনুপাত অর্জনের লক্ষ্য নিয়েছে। বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ দিয়ে নয়, বরং করজাল বাড়িয়ে যা অর্জন করতে হবে। স্নেহাশীষ বড়ুয়া উল্লেখ করেন, ইন্দোনেশিয়া বা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোতে করহার ২০ থেকে ২২ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে কার্যকর করহার ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা বিদেশি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে। তিনি বলেন, এনবিআর যদি সৎসাহস দেখিয়ে করজাল না বাড়ায় এবং কেবল বিদ্যমান করদাতাদের ওপর জোর দেয়, তবে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যাহত হবে। তিনি ভ্যাট ও আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে হয়রানি বন্ধে পূর্ণাঙ্গ অটোমেশনের সুপারিশ করেন। 

সেমিনারে অংশ নেওয়া বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিনিধি সরকারের রাজস্ব বাড়ানোর কৌশলের কঠোর সমালোচনা করেন। নেসলে বাংলাদেশের লিগ্যাল, রেগুলেটরি অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স পরিচালক দেবব্রত চৌধুরী বলেন, কর বাড়িয়ে রাজস্ব বাড়ানোর চিন্তা একটি ভ্রান্ত ধারণা, যা এরই মধ্যে প্রমাণিত। কর বাড়ানো হলে পণ্যের দাম বাড়ে। ফলে ভোগ বা ব্যবহার কমে যায়। আর ব্যবহার কমে গেলে শেষ পর্যন্ত সরকারের সামগ্রিক রাজস্বও কমে যায়। তাঁর মতে, প্রত্যেক করদাতা মূলত এনবিআরের গ্রাহক। কিন্তু তাদের দুঃখ-কষ্ট বিবেচনা না করে করনীতি তৈরি করা হচ্ছে, যা ব্যবসার পরিবেশ নষ্ট করছে।

নীতিমালায় বৈষম্য ও বাস্তবায়নের অভাব

এমসিসিআইর ট্যাক্স ও ট্যারিফ কমিটির চেয়ারম্যান হাসান মাহমুদ বলেন, বাজেটের মূল দর্শন হওয়া উচিত ব্যবসায়ীদের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া নয়। বর্তমানে এক কোটির বেশি টিআইএন থাকলেও মাত্র অর্ধেক লোক রিটার্ন জমা দেয়, ফলে নিয়মিত করদাতাদের ওপরই সব বোঝা চাপে।

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও শাশা ডেনিমসের এমডি শামস মাহমুদ বলেন, প্রতিবছর বাজেটের আগে বহু আলোচনা হয়, যা শেষ পর্যন্ত বাজেটে প্রতিফলিত হয় না। এ ছাড়া এনবিআরের উচ্চ পর্যায়ে কর্মকর্তা বদল হলে আগের সব আলোচনার কোনো ধারাবাহিকতা থাকে না। নতুন কর্মকর্তাদের নতুন করে সবকিছু বোঝাতে হয়। এই সংস্কৃতির অবসান এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ওপর তিনি জোর দেন।

সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের সঙ্গে করনীতির বৈপরীত্যের উদাহরণ দিয়ে বক্তারা বলেন, একদিকে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে, অন্যদিকে সৌরবিদ্যুৎ সংরক্ষণে ব্যবহৃত ব্যাটারি আমদানিতে উচ্চ হারে কর বসিয়ে রেখেছে। একইভাবে প্রতিযোগিতা কমিশন পানিকে ‘অপরিহার্য পণ্য’ গণ্য করে দাম বাড়ানোর ব্যাপারে কঠোর হলেও এনবিআর পানির ওপর বিভিন্ন পর্যায়ে কর আরোপ করে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।

তাদের মতে, করদাতাদের মধ্যে আস্থার সংকট কাটিয়ে উঠতে না পারলে এবং কর ব্যবস্থাকে ব্যবসাবান্ধব না করলে দেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা মোকাবিলায় এখনই একটি স্বচ্ছ, অনুমানযোগ্য এবং বিনিয়োগবান্ধব কর কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানান তারা।

এমসিসিআইর বাজেট সুপারিশ

এমসিসিআইর পক্ষ থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য করহার ২০ শতাংশ এবং অতালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেছে। এ ছাড়া মূল্যস্ফীতির কথা বিবেচনা করে করমুক্ত আয়ের সীমা পাঁচ লাখ টাকা নির্ধারণের জোর দাবি জানায়। ব্যবসায়ী সংগঠনটি সরবরাহ পর্যায়ে উৎসে কর কর্তন সাড়ে ৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ এবং রপ্তানি আয়ের ওপর উৎসে কর শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেছে। 

আরও পড়ুন

×