ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

যৌথ সংবাদ স‌ম্মেল‌ন

সমরাস্ত্র বাণিজ্য জোরদারে সম্মত বাংলাদেশ-তুরস্ক

অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাসপাতালের প্রস্তাব

সমরাস্ত্র বাণিজ্য জোরদারে সম্মত বাংলাদেশ-তুরস্ক
×

যৌথ সংবাদ স‌ম্মেল‌নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খ‌লিলুর রহমান ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান

সমকাল প্রতিবেদক 

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ | ১৬:১৭

বাংলাদেশ ও তুরস্কের ঐতিহাসিক সম্পর্ক এখন আর কেবল কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নেই। বরং বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সমরশিল্প, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মতো বহুমুখী খাতে এক দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্বের রূপ নিচ্ছে। দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বর্তমানের ১৩০ কোটি ডলার থেকে ২০০ কোটি ডলারে উন্নীত করা, তুর্কি বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা এবং ঢাকায় আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার মতো প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। আজ শুক্রবার দ্বিপাক্ষিক বৈঠ‌কের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খ‌লিলুর রহমান ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান যৌথ সংবাদ স‌ম্মেল‌নে এসব কথা বলেন ।

কৌশলগত সম্পর্কের বিশেষ বার্তা নিয়ে তিন দিনের সফরে বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা এসেছেন হাকান ফিদান। ২০২০ সালের ডিসেম্বরের পর এটিই কোনো তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম বাংলাদেশ সফর। একই সঙ্গে বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গুরুত্বপূর্ণ কোনো দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এটাই প্রথম ঢাকা সফর। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান খলিলুর রহমান।

চলতি বছরের মার্চ মাসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান তুরস্কে দ্বিপাক্ষিক সফরে গিয়েছিলেন। এবার দক্ষিণ কোরিয়া সফর শেষে ফিরতি সফরে ঢাকায় এলেন হাকান ফিদান।প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং তুরস্কের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এমআইটির সাবেক প্রধান হাকান ফিদানকে দেশটির পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতির অন্যতম স্থপতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ কারণে তার এই ঢাকা সফরকে কেবল কূটনৈতিক নয়, বরং গভীর রাজনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ সফর হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

দ্বিপাক্ষিক বৈঠক
সফরের দ্বিতীয় দিনে শুক্রবার সকালে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে এক ফলপ্রসূ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে নির্ধারিত কোনো আলোচ্যসূচি না থাকলেও বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সংলাপের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো স্থান পায়। বৈঠক শেষে দুই দেশের মধ্যে একটি সাংস্কৃতিক বিনিময় বিষয়ক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশ ফার্স্ট দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তবে এর অর্থ একা চলা নয়; বরং জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রেখে সমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলাই এই নীতির মূল কথা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‌‘বাংলাদেশ বন্ধু ও অংশীদার চায়, কোনো প্রভু নয়।’ বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) স্বাক্ষরের সম্ভাবনা নিয়েও ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।

বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও সমরশিল্প
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রস্তাবগুলোর একটি ছিল তুরস্কের জন্য একটি নিবেদিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা। দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে তুর্কি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি শুধু তাদের জন্যই পৃথক এই অঞ্চলের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এটি বাস্তবায়িত হলে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, জাহাজ নির্মাণ, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং অবকাঠামো খাতে বড় ধরনের তুর্কি বিনিয়োগ আসবে।

অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি দুই দেশের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে প্রতিরক্ষা শিল্প। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান জানান, দুই দেশ প্রতিরক্ষা শিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সামরিক প্রযুক্তি ও ড্রোনসহ উন্নত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে তুরস্কের দ্রুত উত্থানের প্রেক্ষাপটে এ খাতে সহযোগিতা বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা ও প্রযুক্তির জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ইতোমধ্যে বাংলাদেশ তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদার করেছে। এরই মধ্যে তুরস্ক থেকে বহুনল রকেট ব্যবস্থা টিআরজি-৩০০ এবং অত্যাধুনিক বায়রাকতার টিবি–২ ড্রোন সংগ্রহ করেছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর জন্য টি–১২৯ আতাক যুদ্ধ হেলিকপ্টার এবং উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার বিষয়েও আলোচনা ও প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। সহযোগিতা এখন শুধু অস্ত্র কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দুই দেশ যৌথভাবে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়ন ও দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রযুক্তি হস্তান্তরভিত্তিক সহযোগিতার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে। বিশেষ করে ড্রোন ও অন্যান্য উচ্চপ্রযুক্তির সামরিক সরঞ্জাম দেশে উৎপাদনের বিষয়ে তুরস্ক আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

আন্তর্জাতিক ফোরামে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠানো এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশকে সমর্থন দেওয়ায় তুরস্ককে ধন্যবাদ জানান ড. খলিলুর রহমান। উল্লেখ্য, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের জয়ের নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে তুরস্ক। ধন্যবাদের জবাবে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান মন্তব্য করেন, জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। একই সাথে তিনি ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পুরো দেশকে অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়াতে বাংলাদেশের অবস্থান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত। 

স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মানবিক সহযোগিতা 
অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতার পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতেও তুরস্কের আধুনিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে চায় বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল এবং নার্সিং ইনস্টিটিউট স্থাপন বা উন্নয়নে তুরস্ককে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষা বৃত্তির সংখ্যা বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা। বর্তমানে প্রায় তিন হাজার বাংলাদেশি তুরস্কে বসবাস করছেন, যাদের অধিকাংশই শিক্ষার্থী। সরকারের আশা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময় বাড়লে দুই দেশের সম্পর্ক আরও মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি পাবে।

সংবাদ সম্মেলনে রোহিঙ্গা সংকটও বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রায় এক দশক ধরে চলমান এই সংকটের স্থায়ী সমাধান হলো রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। হাকান ফিদান বাংলাদেশের মানবিক ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ মানবতার জন্য অসাধারণ দায়িত্ব পালন করছে। তুরস্ক ভবিষ্যতেও এই প্রত্যাবাসন প্রচেষ্টার পক্ষে দৃঢ়ভাবে থাকবে।

সফরসূচি অনুযায়ী, শনিবার তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন।

আরও পড়ুন

×