মহেশখালীর টার্মিনালে ত্রুটি
এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন, বেড়েছে গ্যাস সংকট
আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প গ্রাহকদের ভোগান্তি আরও বেড়েছে
ফাইল ফটো
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ | ০৮:১৭ | আপডেট: ২২ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৫৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
কক্সবাজারের মহেশখালীর একটি ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে দেশে গ্যাসের সরবরাহ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে গেছে। এমনিতেই চাহিদার তুলনায় গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। তার ওপর সরবরাহের নতুন এই বিঘ্নে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প গ্রাহকদের ভোগান্তি আরও বেড়েছে। অনেক এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় চুলায় আগুন জ্বলছে না। কোথাও কোথাও একেবারেই গ্যাস মিলছে না। শিল্পাঞ্চলের অনেক কারখানাও প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ না পাওয়ায় উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।
গতকাল মঙ্গলবার তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তিতাসের আওতাধীন এলাকার সব শ্রেণির গ্রাহক গ্যাসের স্বল্প চাপের মুখে থাকবেন। একই সঙ্গে অন্যান্য গ্যাস বিতরণ কোম্পানির গ্রাহকরাও সরবরাহ সংকটে পড়েছেন।
দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। বিপরীতে স্বাভাবিক সময়েও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয় প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। অর্থাৎ, প্রতিদিনই ১০০ কোটির বেশি ঘনফুটের ঘাটতি থাকে। জাতীয় গ্রিডে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে আসে প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুট এবং আমদানি করা এলএনজি থেকে আসে ৯৫ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট।
বর্তমানে মহেশখালীতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে। এ দুটি টার্মিনালের মাধ্যমে দৈনিক সর্বোচ্চ প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে সেখান থেকে গড়ে ৯৫ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়। তবে একটি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে বর্তমানে সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) ভারপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ত্রুটি সারিয়ে তোলার পর এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। এ জন্য কারিগরি টিমের সদস্যরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় রান্নাবান্না নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন গ্রাহকরা। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অনেক বাসায় চুলায় পর্যাপ্ত আগুন মিলছে না। হোটেল-রেস্তোরাঁ, বেকারি ও অন্যান্য ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও স্বল্প চাপের কারণে স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হিমশিম খাচ্ছে। শিল্পাঞ্চলে প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ না থাকায় অনেক কারখানায় উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি রপ্তানিমুখী শিল্পেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এলএনজি ও এলপিজির আন্তর্জাতিক বাজার আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। এতে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় যেমন বাড়বে, তেমনি সরবরাহ ব্যবস্থাও নতুন করে চাপে পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে কারিগরি ত্রুটির কারণে সৃষ্ট বর্তমান সংকট দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ সাময়িক এ অসুবিধার জন্য গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, কারিগরি ত্রুটি দ্রুত সমাধানে সংশ্লিষ্টরা কাজ করছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই জাতীয় গ্রিডে আগের মতো গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে।
মহেশখালীর ভাসমান দুটি টার্মিনালের মধ্যে একটি পরিচালনা করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট। আরেকটি পরিচালনা করে দেশীয় কোম্পানি সামিট গ্রুপ। গতকাল দুপুর থেকে এক্সিলারেটের চালানো টার্মিনালে ত্রুটি দেখা দিলে এলএনজি সরবরাহ কমে আসে। সামিটের চালানো টার্মিনাল থেকে সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।
কাতার ও ওমান ছাড়াও আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট (খোলাবাজার) থেকে সরকারিভাবে এলএনজি সংগ্রহের পর তা জাহাজে করে মহেশখালীর ভাসমান টার্মিনালে রাখা হয়। টার্মিনাল থেকে সাগরের তলদেশ দিয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস প্রথমে মহেশখালীর ল্যান্ডিং স্টেশনে আসে। সেখান থেকে স্থলভাগের পাইপলাইন দিয়ে পেকুয়া, চকরিয়া, বাঁশখালী হয়ে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় নির্মিত গ্যাস ট্রান্সমিশন লাইনে পৌঁছায়। আনোয়ারা থেকে এই গ্যাস একটি লাইনে সরাসরি সিইউএফএল এবং কাফকো সার কারখানায় যায়। অন্য লাইনটি শিকলবাহা হয়ে চট্টগ্রামের প্রধান বিতরণ লাইন এবং জাতীয় গ্রিডের ফেনী-আশুগঞ্জ লাইনে যুক্ত রয়েছে।
- বিষয় :
- এলএনজি