ঢাকা বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

পুষ্প

আভালতা ফুলের আভা

আভালতা ফুলের আভা
×

ঢাকায় জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে সম্প্রতি ফোটা আভালতা ফুল -লেখক

মৃত্যুঞ্জয় রায়

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪০ | আপডেট: ২২ জুলাই ২০২৬ | ০৯:১০

| প্রিন্ট সংস্করণ

গাছটার কাছে যখনই যাই, নিরাশ করে না সে। গাছে অন্তত একটা ফোটা ফুল থাকলেও থাকবে। এ বছর জ্যৈষ্ঠের শেষ দিন গিয়েও ফুলের দেখা পেয়েছি। তবে গত বছর চৈত্র ও ভাদ্রে ফুলের যে প্রাচুর্য দেখেছিলাম, এখন তা নেই। তাতে কী? ওই একটা-দুটো ফুলই আভা ছড়িয়ে লতানো ঝোপটাকে আলো করে ফেলেছে। গ্রীষ্মের প্রখর রোদেও সে ফুলের আভা জ্বলজ্বল করছে। 

এজন্যই কি এ ফুলের ইংরেজি নাম রাখা হয়েছে গ্লোভাইন? এর অর্থ করলে এ ফুলের বাংলা নাম হতে পারে আভালতা। বইপত্রে এর বাংলা নাম হিসেবে অবশ্য বিগোনিয়া লতা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রায় এক দশক আগে বলধার সাইকী অংশে প্রথম এ গাছটিকে দেখি। এরপর দেখেছিলাম বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহের বোটানিক্যাল গার্ডেনে। তখন এর নাম জেনেছিলাম অ্যারাবিডা (Arrabidaea magnifica)। এখন সে গণের নাম বদলে গেছে। এখন এ গাছের প্রজাতিগত নাম Bignonia magnifica হয়েছে। প্রজাতিগত নামের প্রথমাংশ বিগোনিয়া একজন বিশিষ্ট ফরাসি পণ্ডিত জঁ-পল বিগননের নামের স্মারণিক, শেষাংশ ম্যাগনিফিকার অর্থ চোখধাঁধানো পুষ্প। জনৈক ইংরেজ নার্সারি ব্যবসায়ী উইলিয়াম বুল ১৮৭৯ সালে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে বাগানের ফুলগাছ হিসেবে আভালতাকে পরিচিত করান। এর পর থেকে ইউরোপীয় উদ্যানপালকদের কাছে আভালতার প্রসার ঘটতে শুরু করে। আমাদের দেশে এসেছে এর অনেক পরে। 

আভালতার অন্যান্য ইংরেজি নাম পার্পল ফানেল ভাইন এবং পার্পল বিগ্নোনিয়া। ফুলটার রং মিষ্টি বেগুনি বলেই এরূপ নাম। এটি আমাদের দেশের গাছ না। এসেছে সুদূর দক্ষিণ আমেরিকা থেকে। সাম্প্রতিক সময়ে লতানো গাছ হিসেবে খিলানে লতিয়ে ঝোপ তৈরি ও সুন্দর দীর্ঘ প্রস্ফুটনের কারণে বাগানে লাগানোর জন্য জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। পাতা যৌগিক, লতার গিঁট থেকে বিপরীতমুখীভাবে পাতা জন্মে। একটি পাতায় মাত্র দুটি পত্রক থাকে, পত্রক অবডিম্বাকার, ৩ থেকে ৫ সেন্টিমিটার লম্বা, ধূসর সবুজ, চর্মবৎ। পাতার কোল থেকে সাইম পুষ্পমঞ্জরিতে চারটি করে ফুল ফোটে। সাধারণত ডালের আগার দিকে ফুল ফোটে। ফুল বেশ বড়, বোঁটা প্রায় থাকেই না, বোঁটার কাছ থেকে একটি সরু নলের মতো ফুলের গলা, মুখের কাছে পাঁচটি খণ্ডে পাপড়ি বিস্তৃত, ফুল ফানেল, ঘণ্টা বা মাইকের চোঙের মতো দেখতে। ফুলের রং বেগুনি-গোলাপি, নলাকার অংশের ভেতরের রং হলুদাভ সাদা। ফুল বেশি ফোটে বসন্ত ও শরৎকালে। ফল লম্বা, চ্যাপ্টা, ক্যাপসুল ধরনের, দুটি ডানাযুক্ত বীজ থাকে ফলের ভেতরে। বীজ ও শাখাকলম থেকে চারা হয়। হামিং বার্ড ও মৌমাছিদের এ ফুল আকর্ষণ করে ও পরাগায়ন ঘটায়, ওরাও ফুল থেকে মধু নেয়। 

বিগ্নোনিয়া গণের অনেক উদ্ভিদের পাতা, কাণ্ড, শিকড়, বাকল, ফুল ও ফল লোকচিকিৎসায় ক্যান্সার, সর্পদংশন, চর্মরোগ, পরিপাকতন্ত্রের রোগ, শ্বাসতন্ত্রের রোগ, যকৃতের রোগ, মৃগীরোগ, কলেরা, ব্যথা, মূত্রনালির সমস্যা, ম্যালেরিয়া, হৃদরোগ, যৌনবাহিত রোগ ইত্যাদি চিকিৎসার্থে ব্যবহৃত হয়। আভালতাও এ গণের একটি উদ্ভিদ। এ কারণে আভালতা আলংকারিক উদ্ভিদ হলেও এ গাছের কিছু ঔষধি গুণ আছে, যা নিয়ে খুব বেশি গবেষণা হয়নি। সম্প্রতি ভারতীয় কয়েকজন গবেষক এ গাছের আণবিক গবেষণার মাধ্যমে চিকিৎসাগত প্রয়োগের সম্ভাব্যতা নিয়ে গবেষণা করে দেখেছেন যে, এ গাছে বিভিন্ন ধরনের সেকেন্ডারি মেটাবোলাইট আছে যেগুলোর মধ্যে রয়েছে ফ্ল্যাভোনল, প্রোঅ্যান্থোসায়ানিডিন, এলাজিক এসিড, ইরিডয়েডস ইত্যাদি। এই জৈব রাসায়নিক যৌগগুলো তাদের ঔষধিগুণের জন্য পরিচিত, যার মধ্যে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রদাহবিরোধী বৈশিষ্ট্য থেকে শুরু করে সম্ভাব্য ক্যান্সারবিরোধী গুণ পর্যন্ত রয়েছে। তাই, আভালতা আর এখন শুধু বাগানের শোভাময়ী গাছ না, গবেষকদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঔষধি গাছের তকমা পেতে চলেছে। এ নিয়ে আমাদের দেশেও গবেষণা হতে পারে।

আভালতার চারা করতে চাইলে আধাশক্ত বা আধাকাষ্ঠল লতা কেটে শাখাকলম করতে হবে। সাধারণত শাখাকলম বা কাটিং করার ১৫ থেকে ১৬ দিন পর অংকুর বের হয়। শাখাকলম করার সময় রুটিং হরমোন লাগালে শিকড় দ্রুত গজায়। কখনও কখনও বীজ হয় ও তা থেকে চারা তৈরি করা যায়। ছায়া জায়গার চেয়ে রোদে এ গাছের বৃদ্ধি ভালো হয়, ফুলও বেশি ফোটে। ফুল ফোটা শেষ হলে গাছ হালকা করে ছেঁটে দিলে ভালো হয়।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

আরও পড়ুন

×