এফএওর প্রতিবেদন
বন্যা, দাম ও আয় কমায় ১০ লাখ কৃষক পরিবার সংকটে
৫০ লাখ মানুষের কৃষি সহায়তা প্রয়োজন
বন্যায় তলিয়ে গেছে বাড়িঘর ও আবাদি জমি (ফাইল ছবি)
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৪ | আপডেট: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
বন্যা, জলাবদ্ধতা, কৃষি উপকরণের সংকট, খাদ্যের বাড়তি দাম ও আয় কমে যাওয়ার মতো নানা সংকটে পড়েছে দেশের প্রায় ১০ লাখ কৃষক পরিবার। এসব পরিবারের প্রায় ৫০ লাখ মানুষের আগামী নভেম্বর পর্যন্ত জরুরি কৃষি সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। আট মাস আগে করা হিসাবের চেয়ে সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে– এমন কৃষক পরিবারের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় দুই লাখ।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) জরুরি পরিস্থিতিতে তথ্য সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণের ১৪তম পর্যায়ের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গত ২৫ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদনের জন্য এপ্রিল ও মে মাসে দেশের ৬৪ জেলার ৬ হাজার ১৪৩টি পরিবারের সঙ্গে কম্পিউটারচালিত টেলিফোন সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
এফএও বলছে, জরুরি কৃষি সহায়তার প্রয়োজন– এমন পরিবারের বড় অংশই দরিদ্র ও ক্ষুদ্র কৃষক পরিবার। এসব পরিবারের ৫৭ শতাংশ এক হেক্টরের কম জমিতে চাষ করে। আর ৬০ শতাংশ পরিবার সবচেয়ে কম সম্পদশালী শ্রেণির। ফলে কোনো দুর্যোগ বা অর্থনৈতিক ধাক্কা এলে তাদের তা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা খুবই সীমিত।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর
মোট পরিবারের সংখ্যার হিসাবে কৃষি সহায়তার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি চট্টগ্রাম বিভাগে। এরপর রয়েছে রংপুর, ঢাকা ও রাজশাহী বিভাগ। এসব অঞ্চলে কৃষক পরিবারের সংখ্যা বেশি হওয়ায় মোট সংখ্যার হিসাবে সহায়তা প্রয়োজন এমন পরিবারও বেশি। তবে কৃষক পরিবারের মোট সংখ্যার চেয়ে সহায়তা প্রয়োজন– এমন পরিবারের অনুপাত বিবেচনায় সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগ। উভয় হিসাবেই রংপুরকে সবচেয়ে সংকটাপন্ন অঞ্চলের একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে এফএও।
নদী অববাহিকা, হাওর ও আকস্মিক বন্যাপ্রবণ এলাকায় পরিস্থিতি আরও নাজুক। বর্ষা তীব্র হওয়ার সঙ্গে এসব এলাকায় বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়ছে।
খাবার কিনছে বাকিতে, কমেছে চিকিৎসা ও কৃষি ব্যয়
অর্থনৈতিক সংকটের কারণে পরিবারগুলোর জীবনযাত্রায়ও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। ৬৭ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, তারা বাকিতে খাবার কিনছে। ৬৬ শতাংশ পরিবার স্বাস্থ্যসেবায় খরচ কমিয়েছে। আর প্রায় ৩০ শতাংশ পরিবার চলতি মৌসুমের ফসল উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ কেনার খরচ কমিয়েছে।
এফএওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সহায়তার ক্ষেত্রে কৃষি উপকরণ এখন সবচেয়ে বড় চাহিদার একটি। সহায়তা প্রয়োজন এমন ৭২ শতাংশ পরিবার কৃষি উপকরণ চেয়েছে। তবে সবচেয়ে দ্রুত বেড়েছে নগদ সহায়তার চাহিদা। আগের পর্যায়ের জরিপে ১৬ শতাংশ পরিবার নগদ সহায়তা চেয়েছিল। এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৭ শতাংশে, অর্থাৎ আট মাসের ব্যবধানে নগদ সহায়তা চাওয়া পরিবারের হার বেড়েছে ৪১ শতাংশীয় পয়েন্ট।
ফসল উৎপাদনে সংকট, বিক্রিতেও বিপাকে কৃষক
ফসল উৎপাদনের সমস্যায় পড়া পরিবারের হার আগের পর্যায়ের মতোই প্রায় অর্ধেক। তবে সমস্যার ধরনে পরিবর্তন এসেছে। অতিরিক্ত পানি, ফসলের রোগবালাই এবং সারের অভাব এখন প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে। গত নভেম্বরের প্রতিবেদনের সঙ্গে তুলনা করলে ফসলে রোগের কথা বলা পরিবারের হার ৩০ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছে। সার পাওয়ার সমস্যার কথাও বেড়েছে ১৭ শতাংশীয় পয়েন্ট। ফসল বিক্রির ক্ষেত্রেও কৃষকের সংকট বেড়েছে। আগের জরিপে ৯ শতাংশ পরিবার ফসল বিক্রিতে সমস্যার কথা জানিয়েছিল। এবার তা বেড়ে ৩০ শতাংশ হয়েছে, অর্থাৎ হার তিন গুণের বেশি। এর প্রধান কারণ হিসেবে ফসলের কম দামকে উল্লেখ করেছে এফএও। পশু পালনকারী পরিবারগুলোর পরিস্থিতিতে অবশ্য কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে পশুর রোগ ও খাদ্যের উচ্চ খরচ এখনও বড় সমস্যা।
আমনের আগে সমন্বিত সহায়তার সুপারিশ
আমন মৌসুম শুরুর আগে কৃষকদের সময়মতো কৃষি উপকরণ সরবরাহ নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত সহায়তা ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে এফএও। এর মধ্যে বীজ, সারসহ কৃষি উপকরণ, নগদ সহায়তা, গবাদি পশুর স্বাস্থ্যসেবা এবং পানি ব্যবস্থাপনার সহায়তা রাখার কথা বলা হয়েছে।
এফএওর প্রতিবেদনের বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা সামলানোর উপযোগী করে কৃষিকে গড়ে তুলতে সরকার পদক্ষেপ নিচ্ছে।
পৃথিবীর মাটির ‘স্বাস্থ্য খুব খারাপ’
এফএওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ অঞ্চল ও উপ-অঞ্চলে মাটির ব্যবস্থাপনা খারাপ বা অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় রয়েছে। মাত্র ১৪ শতাংশ অঞ্চলে মাটির অবস্থা ভালো বা খুব ভালো।
এফএও বলছে, বিশ্বের খাদ্য উৎপাদনের প্রায় ৯৫ শতাংশের ভিত্তি মাটি। বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্যের বড় একটি অংশও মাটির ওপর নির্ভরশীল। অথচ মাটির অবক্ষয় দ্রুত বাড়ছে।