ঢাকা বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পুষ্প

শরতে ফুটেছে ব্লিডিং হার্ট

শরতে ফুটেছে ব্লিডিং হার্ট
×

রমনা উদ্যানে শরতে ফুটেছে ব্লিডিং হার্ট ফুল -লেখক

মৃত্যুঞ্জয় রায়

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:০১

শরৎ আসে নম্র পায়ে, শুভ্র মেঘে, কাশফুলের বনে দোলা লাগিয়ে। সেই শরৎ হাওয়ার দুলুনিটা দেখতে পেলাম ভাদ্রে ফোটা একটা লতানো গাছের লতায় লতায়। হাওয়ায় দুলছে, ক্ষণিকের বৃষ্টিতে ভিজছে, আবার রোদে শুকাচ্ছে। আকাশে চলছে নীল-ধূসরের মাখামাখি। তার মানে শরৎটা এখনও পুরোপুরি আসেনি। কিন্তু পঞ্জিকার পাতা তো বলছে, শরৎ ঋতুর অর্ধেক প্রায় শেষ!

ভাদ্রের এক দুপুরে ঢাকায় রমনা উদ্যানের ভেতরে নার্সারির পূবদিকে এক ঝোপ ব্লিডিং হার্ট গাছের দেখা পেলাম। শরতের রোদে ফুলগুলো চকচক করছে। সবুজ পাতার ভেতরে থোকা ধরে সাদা-লাল ফুল। এর গোড়া ঘিরে আছে পানপাতা আকৃতির সাদা বৃতিগুলো। লাল ফুলের মাঝখান থেকে বেরিয়ে এসেছে দীর্ঘ কেশরগুচ্ছ। দেখে মনে হচ্ছে, হৃদয়াকার বৃতিগুলো যেন ফোঁটায় ফোঁটায় লাল রক্ত ঝরাচ্ছে। এ জন্য এ উদ্ভিদের ইংরেজি নাম রাখা হয়েছে ব্লিডিং হার্ট ভাইন।

কিন্তু ব্লিডিং হার্ট ফুলের বাংলা নাম কেন জ্বালামুখী রাখা হলো? খুঁজতে গিয়ে দেখলাম, পুষ্পরসিকরা এ ফুলকে সোজা করে রেখে কল্পনা করেছেন পাহাড়ের আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের সঙ্গে। পর্বতশৃঙ্গের মতো সাদা বৃতিগুলোর সুচালো মুখ থেকে অগ্ন্যুৎপাতের সময় যেভাবে লাভা বের হয়, সে রকমই যেন লাল ফুলের পাপড়িগুলো বেরিয়েছে। এরূপ চিত্রকল্পের জন্যই বোধ হয় এর বাংলা নাম জ্বালামুখী। প্রক্ষিপ্ত পুরুষ কেশরগুলো যেন সেই জ্বালামুখ থেকে উদগত বিচ্ছুরিত লাভা। এর অন্য বাংলা নাম পেলাম হৃদয়হরা। 

ব্লিডিং হার্ট গাছের উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম ক্লেরোডেন্ড্রাম থমসোনিয়া (Clerodendrum thomsoniae) ও গোত্র ল্যামিয়েসি। ক্লেরোডেন্ড্রাম এর গণগত নাম। এই গণে বিশ্বে ২৪০টি প্রজাতির গাছ আছে। প্রজাতিগত নামের প্রথমাংশ ক্লেরোডেন্ড্রাম এসেছে গ্রিক শব্দ ‘ক্লেরোস’ থেকে, যার অর্থ ‘নিয়তি’ এবং শেষাংশ থমসোনিয়া রাখা হয়েছে জনৈক নাইজেরীয় চিকিৎসক ও মিশনারি রেভারেন্ড উইলিয়াম কুপার থমসনের সম্মানে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি আলংকারিক উদ্ভিদ হিসেবে বিশ্বে গাছটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। তখন এ গাছের সৌন্দর্যের কারণে তাকে ‘বিউটি বুশ’ বলা হতো। 

ব্লিডিং হার্ট একটি চিরসবুজ লতানো উদ্ভিদ। লতা অবলম্বন পেলে ৪ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। পাতা ডিম্বাকার থেকে আয়তাকার, অগ্রপ্রান্ত তীক্ষ্ণ, শিরাবিন্যাস সুস্পষ্ট। লতার দুপাশে পাতাগুলো জোড়ায় জোড়ায় বিপরীতমুখীভাবে প্রায় সমকোণ করে বিন্যস্ত থাকে। লতার আগা ও পাতার কক্ষ বা কোল থেকে পুষ্পমঞ্জরি বের হয়। প্রতিটি পুষ্পমঞ্জরিতে ৮ থেকে ২০টি করে ফুল গুচ্ছাকারে ঝুলন্তভাবে ফোটে। ফুলের বৃতিগুলো ধবধবে সাদা ও পাঁচটি খণ্ডবিশিষ্ট। বৃতিগুলো ফাঁপা গম্বুজ বা পর্বতচূড়ার মতো গড়ন তৈরি করে। বৃতিগুলো একটা ঠোঙার মতো গড়ন তৈরি করে বলে এ ফুলের আরেকটি ইংরেজি নাম রাখা হয়েছে ‘ব্যাগফ্লাওয়ার’। বৃতিগুলোর মুখ থেকে একটি লম্বা নলের মতো পুষ্পনল বেরিয়ে আসে, যার মাথায় থাকে পাঁচটি উজ্জ্বল লাল রঙের পাপড়ি ও কেন্দ্রস্থলে থাকে গোছা ধরে চারটি পুরুষকেশর। দোরঙা এ ফুলগুলো দেখতে বেশ সুন্দর দেখায়। ফুলগুলোর শোভাময়ী রূপের কারণে লতানো এ গাছকে বাহারি ফুলের গাছ হিসেবে বাগানে লাগানো হয়। বিশেষ করে দেয়াল, পারগোলা ও মাচায় এ গাছ এক প্রাণবন্ত ও আকর্ষণীয় দৃশ্য তৈরি করে।

ফুল ফোটে বসন্ত থেকে শরৎ পর্যন্ত। বিভিন্ন প্রজাতির প্রজাপতি, মথ, মৌমাছিরা এ ফুলের মধু খাওয়ার জন্য আসে এবং পরাগায়নে সাহায্য করে। ফুল ফোটা শেষ হলে সবুজ রঙের ফল হয়। সেসব ফল পাকলে প্রথমে লাল ও পরে কালো হয়ে যায়। প্রতিটি ফলের ভেতরে চারটি কালো রঙের বীজ থাকে। শাখাকলম করে এর চারা তৈরি করা হয়। এর আদিনিবাস আফ্রিকার ক্যামেরুন থেকে সেনেগাল পর্যন্ত বিস্তৃত। তবে এ গাছ এখন অনেক দেশের বাগানে নয়, প্রাকৃতিক পরিবেশেও আগাছার মতো জন্মাতে দেখা যাচ্ছে।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

আরও পড়ুন

×