ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে লক্ষ্য অর্জন হয়নি বিমসটেকের

রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে লক্ষ্য অর্জন হয়নি বিমসটেকের
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২২ | ১০:৩৭ | আপডেট: ১২ মার্চ ২০২২ | ১০:৩৭

আস্থার সংকট, এক দেশের প্রতি অন্য দেশের ভীতি ও সীমান্তে নিরাপত্তাহীনতার মতো মৌলিক বিরোধ জিইয়ে থাকার কারণে লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে সাত দেশের আঞ্চলিক জোট বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টিসেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন (বিমসটেক)। প্রতিষ্ঠার ২৫ বছরেও বাণিজ্য কিংবা বিনিয়োগ কোনো ক্ষেত্রেই সহযোগিতার কোনো নজির স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। রাজনৈতিক শীর্ষ নেতাদের সদিচ্ছার অভাবেই এমন পরিণতি।

এ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন জোটের দেশগুলোর অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কূটনীতিকরা। শনিবার এক সংলাপে এমন মতামত তুলে ধরেন তারা। বিমসটেককে কার্যকর করতে হলে সদস্য দেশগুলোর সরকারপ্রধানদের শক্তিশালী সদিচ্ছা প্রয়োজন। তাদের পক্ষ থেকে জোরালো পদক্ষেপ থাকলে অন্যান্য পর্যায়ে কোনো সমস্যা থাকবে না। পাশাপাশি গত ২৫ বছরের ব্যর্থতার একটি নিরপেক্ষ পর্যালোচনা প্রয়োজন। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, মানুষে মানুষে সংযোগ স্থাপনসহ অন্য সব ক্ষেত্রে সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের যে বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে, তা কাজে লাগাতে একটি পথনকশা প্রণয়নেরও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

অনলাইন প্ল্যাটফর্মে দু'দিনব্যাপী সংলাপের আয়োজন করেছে বাংলাদেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)। শনিবার সমাপনী দিনে একটি খসড়া সারসংক্ষেপ উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে সংলাপ শেষ হয়। উদ্বোধনী এবং সমাপনী মিলে মোট সাতটি কর্ম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় এতে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম গত শুক্রবার সংলাপ উদ্বোধন করেন।

অর্থনৈতিক এবং কারিগরি সহযোগিতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে ১৯৯৭ সালে ব্যাংকক ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিমসটেক গঠিত হয়। বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ডকে নিয়ে এ জোট গঠিত হয়। পরে ভুটান, নেপাল ও মিয়ানমারের যোগদানের মাধ্যমে জোটের সদস্যরাষ্ট্র এখন সাতটি।

সংলাপে গতকালের শেষ কর্ম অধিবেশনের বিষয় ছিল বাণিজ্য ও বিনিয়োগ। এ অধিবেশনে জাতিসংঘের ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কমিশন ফর এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিকের উপপ্রধান ড. রাজন স্বদেশ রত্ন বলেন, দিন দিন বিমসটেকের আকর্ষণ কমছে। নিজেদের মধ্যে সন্দেহ দূর হয়নি। নিজেদের মধ্যে বাণিজ্যে পণ্যের লম্বা নিষেধাজ্ঞা তালিকাই সেটা প্রমাণ করে। শুল্ক্ক বাধা যতটা, তার চেয়ে বেশি অশুল্ক্ক বাধা। গত ২৫ বছরে বিমসটেকের অর্জন কী তার একটা পর্যালোচনা প্রয়োজন। তিনি বলেন, রাজনৈতিকভাবে জোটের দেশগুলোর সরকারের শীর্ষ মহল শক্তিশালী সদিচ্ছা থাকলে যে কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকরে সময় বেঁধে দিতে পারতেন তারা। কিন্তু বিগত দিনে তা হয়নি।

ভারতের কাউন্সিল ফর রিসার্চ অন ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনের ড. নিশা তেনেজি বলেন, জোটের দেশগুলোর মধ্যে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও নিষিদ্ধ তালিকা আছে। বিভিন্ন ধরনের সেবার ক্ষেত্রেও একই কথা বলা হয়। তবে তৈরি পোশাক উৎপাদনে ভারত এবং শ্রীলঙ্কার দক্ষ মানব সম্পদ কাজে লাগিয়ে ভালো দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মানুষে মানুষে সংযোগ, পরিবহন সংযোগ বাড়ানো গেলে বিমসটেক কিছুটা কার্যকর হতে পারে। সরকারি পর্যায়ে সহায়ক অবকাঠামো গড়ে তোলা হলে পরবর্তী কাজ এগিয়ে নিতে পারবে ব্যক্তি খাত।

নেপালের ড. পশরাজ পান্ডে বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের শিক্ষা থেকে বলা যায়, পণ্য সরবরাহ চেইন যে কোনো সময় বিঘ্নিত হতে পারে। আঞ্চলিকভাবে সরবরাহ চেইনের সুযোগ অব্যাহত রাখতে বিমসটেকের বিশাল সম্ভাবনা কাজে লাগানো উচিত।

দিনের অন্য অধিবেশনে বাংলাদেশের অ্যাম্বাসাডর শহীদুল হক বলেন, বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা এক দেশ অন্য দেশকে ভয় করি। আস্থা, বিশ্বাস কিংবা আত্মবিশ্বাসের অভাব। সীমান্তে নিরাপত্তা নেই। বাণিজ্য বিনিয়োগ সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব। মানুষে মানুষে যোগাযোগ, যাতায়াত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; অথচ খুব কঠিন। ভিসা জটিলতা, বৈষম্যমূলক মনোভাব। এ অবস্থায় বিমসটেক নিয়ে খুব আশাবাদী হওয়ার সুযোগ নেই। তার পরামর্শ, সমস্যাগুলো রাজনীতিকদেরই বুঝতে হবে। অন্তত মৌলিক বিষয়গুলোতে তাদের ঐকমত্যে পৌঁছতে হবে।

প্রায় একই রকম মত দিয়েছেন ভারতের এশিয়ান কনফ্লুয়েন্সের নির্বাহী পরিচালক সব্যসাচি দত্ত। তার মতে, বিমসটেককে কার্যকর করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি আছে। আমলাদের ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, সরকারে শীর্ষ পর্যায় ছাড়াও কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে নিচের পর্যায়েও কিছু সমস্যা থাকে।

মানুষে মানুষে যোগাযোগ বিষয়ক এ অধিবেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আমেনা মহসিন বলেন, শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে নিচের পর্যায়ে কিছু করার থাকে না। বিমসটেক দেশগুলোর মধ্যে ধর্ম এবং সাংস্কৃতিক মিল রয়েছে। ফলে কোনো দেশের ধর্মীয় বিরোধ শেষ পর্যন্ত আর অভ্যন্তরীণ থাকে না। প্রযুক্তির কল্যাণে মুহূর্তেই সবার সামনে ঘটনা চলে আসে। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ভারতের রাজনীতি বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও প্রভাব ফেলছে। এ বিষয়ে নেতাদের আরও সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। বিমসটেকের সাবেক মহাসচিব ড. সুমিত নাকান্দালা বলেন, বিমসটেককে কার্যকর করতে চেয়ার কান্ট্রিকে আরও দায়িত্ব নিতে হবে। এ জন্য একটি পথনকশা করার পরামর্শ দেন তিনি।

সংলাপের খসড়া সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সেলিম রায়হান। খসড়ায় বিমসটেক দেশগুলোর মধ্যে অংশীদারিত্ব বাড়ানো, করোনার মতো অতিসংক্রমণ রোধে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সংযোগ বাড়ানোসহ বেশকিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়।

আরও পড়ুন

×