'বেহুদা' সোলার প্যানেল
রাজধানীর বেশিরভাগ ভবনের ছাদেই রয়েছে এ রকম সোলার প্যানেল; যার বেশিরভাগই অকেজো- মামুনুর রশিদ
অমিতোষ পাল
প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৪:২৬
রাজধানীর ৮৩ মধ্য পীরেরবাগের নয়তলা ভবনের ছাদের ওপরে সোলার (সৌর) প্যানেল ভবনটি চালুর পর থেকেই অব্যবহূত অবস্থায় পড়ে আছে। সেটি ভবনের বাসিন্দাদের কোনো উপকারে আসছে না। একেবারেই নিয়মরক্ষার জন্য ভবন মালিক সেটা স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু কখনই সেটার কোনো উপযোগিতা পাননি। কিন্তু সোলার প্যানেলটি স্থাপন করতে ভবন মালিকের প্রায় সাত লাখ টাকা খরচ হয়েছিল।
কেবল এটাই নয়, ২০১০ সাল থেকে রাজধানীসহ সারাদেশে যত ভবন নির্মিত হয়েছে, সবক'টিতেই নামসর্বস্ব সোলার প্যানেল স্থাপন করতে হয়েছে। একেকজন গ্রাহকের খরচ হয়েছে তিন লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা। অন্যথায় বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়নি বিদ্যুৎ বিতরণ কর্তৃপক্ষ।
জানা গেছে, সারাদেশে বছরে অন্তত ২০ হাজার বহুতল ভবন নির্মিত হয়। এর মধ্যে রাজধানীতেই উঠছে প্রায় চার হাজার। ভবনের আয়তন ছয় হাজার বর্গফুটের বেশি হলেই সোলার প্যানেল সংযোজন বাধ্যতামূলক। নবনির্মিত ভবনে সোলার প্যানেল যুক্ত না করলে বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়া হয় না। অগত্যা বাধ্য হয়েই সোলার প্যানেল যুক্ত করেন ভবন নির্মাতা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান। বিষয়টি নিয়ে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) একাধিকবার বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করেছে। তারা দায়িত্বশীলদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সোলার প্যানেলের শর্ত শিথিলের দাবি জানিয়েছেন। বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হলেও কার্যত কোনো ফল আসেনি।
রিহ্যাবের সহসভাপতি লিয়াকত হোসেন বলেন, একটি ভবনে সোলার প্যানেল সংযোজন করলে গ্রাহকের তেমন কোনো কাজে আসে না। আবার এখন দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনও চাহিদার চেয়ে বেশি। লোডশেডিংও তেমন একটা নেই। এ অবস্থায় সোলার প্যানেল স্থাপনের খড়গ ভবন মালিকদের ওপর চাপানো ঠিক নয়। এতে ফ্ল্যাটের দাম বেড়ে যায়। তা ছাড়া যে সৌর প্যানেল গ্রাহকের কোনো উপকারে আসে না, সেই সিস্টেম রাখার কোনো যৌক্তিকতা আছে বলে তিনি মনে করেন না।
ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান অপসোরা হোমসের স্বত্বাধিকারী মো. শফিউল্লাহ বলেন, এই সোলার সিস্টেমের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এর ফলে প্রচুর পরিমাণে অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে। এতে করে সোলার সিস্টেম রপ্তানিকারক দেশ, বিশেষ করে চীনের লাভ হচ্ছে।
রিহ্যাবের অপর এক সদস্য বলেন, যখন সরকার এই সোলার প্যানেল সংযোজন বাধ্যতামূলক করেছিল, তখন দেশে বিদ্যুতের ভয়াবহ সংকট ছিল। এখন নেই। ফলে এই বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া উচিত। তিনি বলেন, চার বছর ধরে তারা সরকারের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে দেনদরবার করছেন। সবাই বিষয়টি বুঝতে পারছেন। কিন্তু বিদ্যুৎ বিভাগের কর্তাব্যক্তিরা বিষয়টি বুঝতে পারছেন না। সোলার প্যানেলে ব্যবহূত ব্যাটারি যে পরিবেশের জন্য কী ক্ষতিকর, সেটা সবাই জানেন। তারপরও এটা নিয়ে কর্তৃপক্ষ নির্বিকার।
এ প্রসঙ্গে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সমকালকে বলেন, এই সোলার প্যানেলের ব্যবহার আসলে এখন আর কার্যকর নেই। কোনো লাভ না থাকলে কেউ অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে চায় না। সে কারণে উদ্যোগটি খুব বেশি ফলপ্রসূ হয়নি। এ জন্য আমরা নেট মিটারিং সিস্টেম চালু করতে যাচ্ছি। এর মাধ্যমে গ্রাহক তার বাড়ির ছাদে সোলার প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে নিজের চাহিদা মিটিয়ে বাড়তি বিদ্যুৎ সরকারের কাছে বিক্রি করতে পারবে। এ জন্যই সোলার প্যানেল সংযোজনের শর্তটি আপাতত বাতিল করার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০১০ সালে দুই কিলোওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে গ্রাহককে সৌর প্যানেল বসাতে মৌখিকভাবে শর্ত দেওয়া হয়। পরে ওই মৌখিক শর্তই পালন হচ্ছিল। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির পর ২০১৪ সালে সরকার সৌর প্যানেল বসানোর শর্ত উঠিয়ে নেয়। কিন্তু ২০১৫ সালে আবারও গ্রাহকের ঘাড়ে চাপানো হয় এই শর্ত। তখন এসি ব্যবহার করলে অবশ্যই সৌর প্যানেল বসানোর নতুন শর্ত যুক্ত করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকার সর্বত্রই সোলার প্যানেল ব্যবহারের চিত্র একই রকম। নতুন ভবনগুলোতে সৌর প্যানেল স্থাপন করা হলেও এগুলোর বেশিরভাগই অচল। আবার বিদ্যুতের মিটার স্থাপনের অনুমতি নেওয়ার সময় অনেকে আরেক ভবন থেকে পুরোনো সোলার প্যানেল সংযোজন করে বিদ্যুৎ বিভাগকে দেখান। অনেকে ভাড়া নিয়ে অনুমতি পাওয়ার পর সেগুলো খুলে আবার ফেরত দিয়ে দেন। আবার সোলার প্যানেলগুলোর বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা ২০ বছর থাকার কথা। কিন্তু নিম্নমানের প্যানেল ব্যবহারের কারণে সেগুলো বছর না ঘুরতেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আবার ভবন মালিকদের কোনো কাজে না আসায় সেগুলো মালিকরা ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণও করেন না। ফলে দ্রুতই নষ্ট হয়ে যায়।
২০১৫ সালে বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে একটি জরিপ চালানো হয়েছিল। তাতে দেখা যায়, ঢাকা সিটিতে আবাসিক গ্রাহকদের সোলার প্যানেলের সংখ্যা ছিল ৬০ হাজার ৫২৬টি। তার মধ্যে ১২ হাজার ১৪৮টি ছিল নষ্ট। ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির (ডিপিডিসি) অধীনে থাকা ৯ হাজার ২৬৭টির মধ্যে নষ্ট ছিল এক হাজার ৫৩১টি। এ ছাড়া পশ্চিমাঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির (ওজোপাডিকো) অধীনে থাকা এক হাজার ৯৯২টির মধ্যে নষ্ট ছিল ৫৬টি। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বাবিউবো) অধীনে থাকা আট হাজার ৫৪০টি সোলার প্যানেলের মধ্যে নষ্ট ছিল ৭২৮টি। বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (আরইবি) অধীনে থাকা ৫৬ হাজার ৭৯৪টির মধ্যে নষ্ট ছিল ৪৭৪টি। নর্দার্ন পাওয়ার সাপ্লাই কোম্পানির (নেসকো) অধীনে থাকা ১১ হাজার ৪৫০টির মধ্যে নষ্ট ছিল ১১০টি। এত সবের পরও সোলার প্যানেল সংযোজনের নিয়ম বহাল রেখেছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
- বিষয় :
- সোলার প্যানেল
- রাজধানী
- পীরেরবাগ
