আতঙ্কে হরতালের আবহ
গণপরিবহন, ব্যক্তিগত গাড়ি, এমনকি রিকশাও ছিল হাতেগোনা। শনিবার রাজধানীর চিত্র ছিল এমনই। রায়েরবাগ এলাকা থেকে তোলা - সমকাল।
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ১০ ডিসেম্বর ২০২২ | ১২:০৯
বিরোধী দলগুলো হরতাল ডাকলে পথঘাট যতটা যান শূন্য হয় বা জনজীবন বিঘ্নিত হয়, গতকাল শনিবার বিএনপির গণসমাবেশের সময়ে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকা তার চেয়েও ছিল ফাঁকা। বাস চলেছে খুব কম। সেগুলো ছিল যাত্রীবোঝাই। দূরপাল্লার বাসও চলেনি। অন্যান্য যানবাহন চলাচলও ছিল হাতেগোনা। রাজধানী ছিল রিকশার দখলে। গতকাল ছুটির দিন থাকলেও জরুরি প্রয়োজনে যাঁরা বাইরে বের হয়েছিলেন, তাঁরা পড়েন ভোগান্তিতে।
পাড়া-মহল্লার দোকান স্বাভাবিক থাকলেও বিপণিবিতানে ক্রেতার দেখা মেলেনি। জনবিরান সড়কের মোড়ে মোড়ে লাঠি হাতে ছিলে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীর মহড়া ও পাহারা। কেউ বিএনপির সমাবেশে যাচ্ছেন, সন্দেহ হলেই তাকে তল্লাশি করা হয়। মারধর ও লাঞ্ছনা শিকার হন অনেক মানুষ।
রাজধানীর প্রবেশপথ উত্তরার কামারপাড়া ও আবদুল্লাহপুরে দেখা যায়, বাস চলছে না। আগের দু'দিনের মতোই চেকপোস্টে পুলিশের তল্লাশি চলছে। অদূরেই ছিলেন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মীরা। সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আসা যাত্রীদের নামিয়ে পুলিশের সমান্তরালে তাঁরা সবার গন্তব্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। মোবাইল ফোন চেক করছিলেন।
আজমপুর, জসিম উদ্দীন বাসস্ট্যান্ড, মাস্কট প্লাজা এলাকার ফুটপাত ও ছোট দোকানগুলো দিনভর বন্ধ ছিল। তবে সন্ধ্যার পর কাউকে কাউকে দোকান খুলতে দেখা গেছে। রাজলক্ষ্মী এলাকার দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক (টিআই) আকতারুজ্জামান সমকালকে জানান, মহাসড়কে যানবাহনের চাপ না থাকায় অন্যদিনের চেয়ে তাঁরা কিছুটা চাপমুক্ত রয়েছেন।
তবে চাপে ছিলেন বিমানযাত্রীরা। ঢাকায় নেমে গন্তব্যে ফিরতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন। গতকাল কাতার এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে অবতরণ করেন পাবনা জেলার বাসিন্দা আরব আলী। বিমানবন্দরে তিনি জানান, স্বজনের আসার কথা ছিল। কিন্তু দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত তাঁদের সঙ্গে দেখা হয়নি। সকাল সোয়া ১০টায় ফ্লাইট থেকে নামার পর ইমিগ্রেশন কাস্টমস থেকে লাগেজ নিয়ে বের হয়ে জানতে পারেন, গাড়ি চলছে না। বিমানবন্দর পরিবহন থেকে গাড়ি ভাড়া করে একা গন্তব্যে ফেরার রয়েছে ঝুঁকি।
তাঁর মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে না পেরে বিমানবন্দরে অপেক্ষা করেন আরও অনেক যাত্রী। বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন কামরুল ইসলাম জানান, যাত্রী সংকটে ফ্লাইট বাতিলের কোনো খবর নেই।
এ ব্যাপারে বেসরকারি ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম জানান, সমাবেশের কারণে যান চলাচল বিঘ্নিত হতে পারে আশঙ্কায় অনেক যাত্রী আসেন এক দিন আগেই।
বিএনপির কর্মসূচির মধ্যে জনজীবন স্বাভাবিক রয়েছে- এ বার্তা দিতে সরকার সমর্থক পরিবহন মালিক সমিতির নির্দেশ ছিল, শনিবার গতভাগ রাস্তায় নামাতে হবে। কিন্তু গতকাল মিরপুর এলাকায় গণপরিবহনশূন্য। ভরসা ছিল রিকশা ও অটোরিকশা। অ্যাপসভিত্তিক রাইড শেয়ারিংয়ের গাড়িচালকরা মতিঝিল-সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী এলাকায় যেতে রাজি ছিলেন না। কিছু লেগুনা চলাচল করে স্বল্প দূরত্বে।
মিরপুরের একাধিক বাস মালিক জানান, সহিংসতার আশঙ্কায় সড়কে যাত্রীই ছিল না। সে কারণেই বাস নামাননি। মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান বলেছেন, বাস সচল রাখার নির্দেশ অনেকেই মানতে পারেননি বাস সংকটে। তার পরও কিছু বাস চলেছে।
রাজধানীর জিগাতলায় দেখা যায়, একমাত্র মোহাম্মদপুর-খিলগাঁও রুটে 'মিডলাইন' পরিবহনের বাস চলছে। পরিবহনটির একজন কর্মকর্তা জানান, ৪০টি বাসের মাত্র আটটি চালানো হয়েছে। জিগাতলা হয়ে ঘাটারচর থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত ঢাকা নগর পরিবহনের বিআরটিসি বাসও চলেনি। সংস্থাটির একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিএনপির কর্মসূচির এলাকার আশপাশে বাস না চালাতে 'ওপরের নির্দেশ' ছিল। তাই চলেনি। অন্যান্য রুটে বাস চলেছে। তবে যাত্রী সংকটে সব বাস নামানো হয়নি।
বিকেলে ফার্মগেটে দেখা যায়, আনন্দ সিনেমা হলের সামনে কয়েকশ মানুষ দাঁড়িয়ে। আধাঘণ্টা বিরতিতে বাস আসছে। তাতে ঝাঁপিয়ে উঠছেন যাত্রীরা। কারমান আকমল নামে এক ব্যক্তি জানান, অফিস না থাকলে বের হতেন না। সকালে মিরপুর থেকে রিকশায় এসেছেন। বিকেলেও বাস পাচ্ছেন না।
বিএনপির সমাবেশস্থল গোলাপবাগ-সংলগ্ন সায়েদাবাদ টার্মিনালে দেখা যায়, সব বাস নিশ্চল দাঁড়িয়ে। যে দু-একটি বাস চলেছে, সেগুলোতে ভাড়া ছিল দ্বিগুণ-তিনগুণ। যাত্রীসেবা পরিবহনের ম্যানেজার মো. মোরসালিন বলেন, বাস বন্ধের নির্দেশ নেই। ভয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন না।
ঢাকা-দর্শনা রুটে চলাচলকারী পূর্বাশা পরিবহনের গাবতলী কাউন্টারের ম্যানেজার ইসারফ জানান, সকাল সাড়ে ৬টা থেকে ১১টা পর্যন্ত তাঁদের ছয়টি বাস ছাড়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রথম বাসে মাত্র ৮ জন যাত্রী পাওয়া যায়। সেটিও ছাড়ে নির্ধারিত সময়ের দুই ঘণ্টা পর। একটি ট্রিপ দর্শনা যেতে ২৫-২৬ হাজার টাকা খরচ হয়। আটজন যাত্রী নিয়ে ট্রিপ ছাড়লে লোকসান হবে। এ জন্য আর কোনো বাস ছাড়বে না।
সন্ধ্যা ৭টার দিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দূরপাল্লার বাস ছাড়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে কোম্পানিগুলো। যাত্রীদের উপস্থিতিও টার্মিনালে বাড়ছে। তবে সন্ধ্যার পর গাবতলী, সায়েদাবাদ থেকে বাস ছাড়তে শুরু করে।
পুরান ঢাকাতেও ছিল হরতালের আবহ। সদরঘাটসহ শ্যামবাজার, পাটুয়াটুলী, কোতোয়ালি, বাংলাবাজার, বাবুবাজার, তাঁতীবাজার, রায়সাহেব বাজার ও ওয়ারী এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সরকার সমর্থকদের পিকেটিং রাস্তা ফাঁকা। মানুষের চলাচল নেই। দোকানপাট খোলা ছিল হাতেগোনা।
সদরঘাটে দেখা যায়, লঞ্চ চলাচলও সীমিত যাত্রী সংকটে। শনিবার সকাল থেকে মাত্র তিনটি লঞ্চ ছেড়ে যায়। ভোরে যেগুলো ঢাকায় আসে, সেগুলোও ছিল যাত্রীশূন্য। ট্রাফিক ইন্সপেক্টর হুমায়ুন কবির বলেন, যাত্রী সংকটে লঞ্চ কম। লঞ্চ পরিবহন মালিক সমিতির সদস্য সচিব সিদ্দিকুর রহমান পাটওয়ারী বলেন, যাত্রী বাড়লে শনিবার রাতে লঞ্চ বাড়বে।
পুরান ঢাকায় পুলিশ ও আওয়ামী লীগের তল্লাশির ভোগান্তিতে পড়েন জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বের হওয়া সাধারণ মানুষ। তাঁদের একজন সদরঘাটের কাপড় ব্যবসায়ী জসীম মোল্লা। তিনি বলেন, সকালে দোকান খুলতে আসার পথে দফায় দফায় জেরায় পড়েন। একবার ছাত্রলীগ আসে, একবার আওয়ামী লীগ আসে। অথচ আমি স্থানীয় ব্যবসায়ী। তারা মানুষ চিনে না।
সংঘর্ষের আশঙ্কায় বন্ধ ছিল পুরান ঢাকার বৃহত্তম পাইকারি কাপড়ে মার্কেট। শীতের পোশাক বিক্রি করা রাফসান হোসেন জানান, দিনে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা বিক্রি হয়। শনিবার দোকানই খুলতে পারেননি। তবে কোতোয়ালি থানার ওসি মিজানুর রহমান বলেন, ব্যবসায়ীদের ভয়ের কারণ নেই। তাঁরা কেন দোকান বন্ধ রেখেছেন, জানা নেই।
কুমিল্লা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, বিকেল থেকে যান চলাচল বেড়েছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে। গাজীপুরেও দিনভর বন্ধ ছিল গণপরিবহন। যেসব কলকারখানা খোলা ছিল, তাতে কর্মরতরা হেঁটে কর্মস্থলে যান। এদিকে, সারাদিন ঢাকার সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের সড়ক যোগাযোগ প্রায় বন্ধ ছিল।
- বিষয় :
- বিএনপির সমাবেশ
- হরতাল
- গণসমাবেশ
- যানবাহন
- রাজধানী
