ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

গুরুমারা শিষ্য

গুরুমারা শিষ্য
×

সাহাদাত হোসেন পরশ

প্রকাশ: ১১ মার্চ ২০২০ | ১৩:৪২

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মনোগ্রাম ও অফিসিয়াল প্যাড হুবহু নকল করে সরকারি চাকরির ভুয়া নিয়োগপত্র তৈরি করা হয়েছিল। নিচে ওই অধিদপ্তরের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. আতিক এ বি সাত্তারের জাল স্বাক্ষর। চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে প্রহরী হিসেবে ওই নিয়োগপত্র তৈরি করে জনৈক মনোয়ার হোসেনকে দেওয়া হয়। মনোয়ারের গ্রামের বাড়ি দিনাজপুরের বীরগঞ্জের ছয়ঘটি এলাকায়। চাকরি পাওয়ার আশায় দুই দফায় মনোয়ার সাত লাখ টাকা পরিশোধ করেন। নিয়োগপত্র হাতে পাওয়ার পর চাকরিতে যোগদান করিয়ে দেওয়ার কথা। এভাবে দিনের পর দিন তাকে ঘুরাতে থাকেন চাকরিদাতারা। একপর্যায়ে মনোয়ার বুঝতে পারেন, চাকরির নামে প্রতারণার ফাঁদে পড়েছেন তিনি। মনোয়ারসহ আরও অনেক চাকরিপ্রত্যাশীর সঙ্গে প্রতারণার কাহিনি বেরিয়ে এসেছে একটি ফোনকলের সূত্র ধরে। সম্প্রতি রাজধানীর আদাবর থানার ওসি কাজী শাহীদুজ্জামানের সরকারি মোবাইল ফোনে একটি কল আসে। ফোনের ওপাশ থেকে বলা হয়, আদাবর থানাধীন শিপলা আবাসিক হোটেলে চাকরির নিয়োগপত্র দেওয়ার কথা বলে ২২-২৩ জনকে জড়ো করা হয়েছে। যাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে পাঁচ-সাত লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। ওই কলের সূত্র ধরে বেরিয়ে আসে গুরুমারা এক প্রতারক শিষ্যের গল্প। যেমন প্রতারক গুরু, তার চেয়েও ভয়ংকর ওই শিষ্য।
চাকরি দেওয়ার নাম করে হাতিয়ে নেওয়া লাখ লাখ টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে প্রতারক শিষ্য কে এম আতিক রেজা তার গুরু মাছুদুর রহমান মিলুকে কৌশলে পুলিশে ধরিয়ে দেয়। তবে শেষ রক্ষা হয়নি আতিকেরও। সেও পুলিশের হাতে ধরা পড়ে।
সংশ্নিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, আদাবর থানার ওসির মোবাইলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পরিচয়ে প্রতারক আতিক ফোন করে। ওই তথ্যের ভিত্তিতে ২ মার্চ শ্যামলীর একটি হোটেলে অভিযান চালিয়ে চাকরি দেওয়ার নামে ফাঁদ পাতার ঘটনায় চারজন ধরা পড়ে। তারা হলো- আতিকের গুরু মিলু ও তার সহযোগী ছাদাকাতুল বারী, মোস্তাফিজুর রহমান ও মতিউর রহমান। তাদের গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে এই চক্রের আরেক হোতা হলো আতিক। তবে সে পলাতক রয়েছে। এরপর আদাবর থানার ওসি ফোন করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে পরিচয় দেওয়া ওই ব্যক্তিকে। তাকে আসামিদের গ্রেপ্তারের তথ্য জানান। তখন ফোনের ওপাশ থেকে বলা হয়, তিনি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নন, অতিরিক্ত আইজিপি। এরপর যেন এ বিষয় নিয়ে তাকে ফোন না করা হয়। তখন ওসি তাকে জানান, পুলিশের সরকারি নম্বর থেকে যেন তাকে ফোন করা হয়। এটা বলার পর থেকে ওই মোবাইল নম্বর বন্ধ করে দেয় আতিক। পরে প্রযুক্তিগত তদন্তে পুলিশ মোহাম্মদপুরের একটি বাসার ঠিকানায় ভাড়াটিয়া হিসেবে দেওয়া ফরমে আতিকের সঙ্গে পরিচিত তিনটি মোবাইল নম্বর পায়। সেখানে একটি নম্বর ছিল তার স্ত্রীর। তবে নম্বরটি অধিকাংশ সময় বন্ধ পাওয়া যায়। পরে স্ত্রীর সঙ্গে একপর্যায়ে আতিকের মোবাইল কল রেকর্ডের সূত্র ধরে পুলিশ নিশ্চিত হয় সে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। পূর্ব পরিচিত একজন গাড়িচালককে উত্তরা এলাকায় থাকার অনুরোধ করে আতিক। এটা জানার পর ওই চালককে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে আতিককে ধরার ফাঁদ পাতে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগ। এর পর ধরা হয় আতিককে। তার কাছ থেকে নগদ ১২ হাজার ৩০০ ডলার পাওয়া যায়। এ ছাড়া বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের অনেক কাগজপত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ডিসি বিপ্লব বিজয় তালুকদার সমকালকে জানান, এখন পর্যন্ত ৫৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে চাকরিপ্রত্যাশী সাফিউলের দুই লাখ ২০ হাজার, হাবিবুরের পাঁচ লাখ, নূর আলম সিদ্দিকীর ৫ লাখ, আনছারুলের তিন লাখ ৫০ হাজার, সাব্বির আলমের চার লাখ, আক্তারুজ্জামানের তিন লাখ ৬০ হাজার, আইনুল ইসলামের সাত লাখ, আবু রায়হানের পাঁচ লাখ ৮০ হাজার ও কাজলের কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় তারা। আতিক বিয়ে করেছে মিলুর বাড়ি পাশে। সেই সূত্র ধরেই তাদের পরিচয়। বছর পাঁ?চেক ধরেই তারা এ ধরনের প্রতারণায় যুক্ত।
পুলিশ জানায়, প্রতারক আতিকের গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহের শৈলকূপায়। মিলুর বাড়ি রংপুরে। তবে ঢাকায় বাসা ভাড়া করে প্রতারণা করে আসছিল তারা। দিনাজপুর ও রংপুর থেকে চাকরিপ্রত্যাশীদের টার্গেট করে আতিক ও মিলুর কাছে পাঠাত ছাদাকাতুল বারী, মোস্তাফিজুর রহমান ও মতিউর রহমান। প্রতারণার অর্থ ৪০ শতাংশ দেওয়া হতো এলাকা থেকে যারা চাকরিপ্রত্যাশীদের পাঠাত তাদের। বাকি অর্থের মধ্যে ৪০ শতাংশ নিতো গুরু মিলু ও ২০ শতাংশ পেত শিষ্য আতিক। তবে নিজের ভাগ ঠিকঠাক মতো হাতে না পাওয়ার হতাশা থেকেই অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পরিচয়ে গুরুকে পুলিশের কাছে ধরিয়ে দেয় আতিক।
প্রতারণার শিকার মনোয়ার হোসেন বলেন, চাকরি দেওয়ার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে তার কাছ থেকে সাত লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারক চক্র। তাকে ভুয়া নিয়োগপত্রও দিয়েছিল।
আদাবর থানার ওসি কাজী শাহীদুজ্জামান সমকালকে জানান, ২ মার্চ অপারেশনে প্রথমে এ চক্রের কয়েকজনকে ধরা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আরও কয়েকটি অপারেশনে মোট পাঁচজন গ্রেপ্তার হয়। তাদের মধ্যে তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। যদি আদালত মনে করেন তাহলে জব্দ অর্থ ভুক্তভোগীদের দিতে পারে।
ওসি আরও জানান, চাকরির নামে প্রতারণার ঘটনায় এই চক্র গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরসহ অন্যান্য কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হয়। তারা এ ধরনের ঘটনা শুনে বিস্মিত হন।

আরও পড়ুন

×