ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সংঘাত ভুলে ঐকমত্যে পৌঁছানোর আহ্বান

সংঘাত ভুলে ঐকমত্যে পৌঁছানোর আহ্বান
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২৩ | ১৮:০০

সংঘাত ভুলে আলোচনার মাধ্যমে ঐকমত্যে এসে গণতন্ত্রকে বিকশিত করতে সবার সহায়তা করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ। তিনি বলেছেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসন্ন। ক্ষমতায় যাওয়া বা পরিবর্তন আনার একমাত্র উপায় নির্বাচন। আন্দোলনের নামে সন্ত্রাস ও হিংসার রাজনীতি কখনও দেশ, সমাজ ও অর্থনীতির জন্য কল্যাণকর হতে পারে না, বরং তা রাজনৈতিক পরিবেশকে তমসাচ্ছন্ন করে তোলে।

গতকাল শুক্রবার জাতীয় সংসদের সুবর্ণজয়ন্তীতে বিশেষ অধিবেশনে সংসদে দেওয়া ভাষণে এ কথা বলেন রাষ্ট্রপতি। ১৯৭৩ সালের ৭ এপ্রিল বসেছিল জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। এ উপলক্ষে গতকাল ছুটির দিনেও সংসদের বৈঠক বসে বিকেল ৩টায়। এই অধিবেশনে উপস্থিত থাকার জন্য দেশের বিশিষ্টজনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তাঁদের মধ্যে ভিআইপি গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন, প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার এবং মিশনপ্রধানরা উপস্থিত ছিলেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশের গণতন্ত্র আজ নিরাপদ ও সুরক্ষিত। বর্তমানে নির্বাচিত প্রতিনিধি ছাড়া অন্য কোনো গোষ্ঠী বা অসাংবিধানিক শক্তির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণের সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ক্ষমতায় যাওয়া বা পরিবর্তন আনার একমাত্র উপায় নির্বাচন। রাজনীতি থেকে হিংসা-হানাহানি অবসানের মাধ্যমে একটি সহিষ্ণু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখতে হবে।

তিনি আরও বলেন, উন্নয়ন ও গণতন্ত্র একসঙ্গে চলে। দেশে গণতন্ত্র অব্যাহত থাকলে উন্নয়ন ও অগ্রগতি এগিয়ে যায়। আবার গণতন্ত্রের স্বাভাবিক গতিপথ রুদ্ধ হলে উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হয়। উন্নয়নকে স্থায়ী ও টেকসই করতে হলে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মজবুত করতে হবে, তৃণমূল পর্যায়ে গণতন্ত্রের চর্চা ছড়িয়ে দিতে হবে। গণতন্ত্রহীন অবস্থায় যে উন্নয়ন হয় তা কখনও সর্বজনীন হতে পারে না। সে উন্নয়ন হয় ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকেন্দ্রিক।

আবদুল হামিদ বলেন, জাতীয় সংসদ ও দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে ৭ এপ্রিল একটি ঐতিহাসিক ও অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৭৩ সালের এই দিনে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসেছিল। সদ্য স্বাধীন দেশে যাত্রা শুরু হয়েছিল সংসদীয় গণতন্ত্রের। তবে এই যাত্রার পেছনে রয়েছে ২৪ বছরের অত্যাচার, শোষণ ও নির্যাতনের করুণ ইতিহাস।

সংসদকে কার্যকর করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে সংসদ সদস্যেদের উদ্দেশে তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য এবং নীতি-আদর্শের ভিন্নতা থাকতে পারে। কিন্তু সংসদকে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার ক্ষেত্রে কোনো ভিন্নতা থাকতে পারে না।

রাষ্ট্রপতি বলেন, সংসদের মূল তিন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও ভূমিকা রয়েছে। প্রথমত, সমাজের সব শ্রেণি-পেশা, জেন্ডার, মত ও পথের প্রতিনিধিত্ব করা; দ্বিতীয়ত, আইন প্রণয়ন ও সরকারের ব্যয় নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত বিষয়াদি এবং তৃতীয়ত, তদারকির মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। সংসদীয় পদ্ধতিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলোকে সঠিকভাবে কার্যকর করা গেলে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

আইন প্রণয়ন কাজে সংসদ সদস্যদের গুরুত্বের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, জাতীয় সংসদে প্রথিতযশা আইনজীবীদের সংখ্যা ক্রমেই কমে আসছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে হয়তো বা সংসদে বিল আকারে উপস্থাপিত আইনের পরিবীক্ষণ, মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণের জন্য বাইরে থেকে বিশেষজ্ঞদের আমন্ত্রণ জানানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতে পারে।

আবদুল হামিদ বলেন, গণপরিষদে কোনো বিরোধী দল না থাকলেও সংসদ অধিবেশন হতো প্রাণবন্ত। যুক্তিতর্ক ও মতামত উপস্থাপন ছিল খুবই আকর্ষণীয়। ন্যাপ থেকে নির্বাচিত একমাত্র গণপরিষদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত পার্লামেন্টে বক্তৃতা করার সুযোগ চাইলে সবসময়ই সুযোগ পেতেন। স্পিকার মাঝে মধ্যে তাঁকে মাইক দিতে না চাইলেও বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘ওকে সুযোগ দেন, বিরোধী পক্ষের কথা আগে শুনতে হবে।’

নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, সংসদ সদস্যদের অভাব-অভিযোগ, সুখ-দুঃখ সবকিছুর খবর রাখতেন বঙ্গবন্ধু এবং প্রয়োজনে তাঁদের জন্য সম্ভাব্য সবকিছুই করতেন।

তিনি আরও বলেন, সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় জাতীয় সংসদ সকল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। একজন সংসদ সদস্য ব্যক্তিগত কিংবা সমষ্টিগতভাবে জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে সন্নিবেশিত বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে সংসদের নিকট সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারেন।
সংসদীয় কমিটির গুরুত্বের কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রাণ হচ্ছে এই  সংসদীয় কমিটি ব্যবস্থা। মিনি পার্লামেন্ট হিসেবে পরিচিত সংসদীয় কমিটি ব্যবস্থার কার্যকারিতার ওপর সংসদীয় গণতন্ত্রের ভিত্তি রচিত।

সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, জাতীয় সংসদের কার্যক্রমকে প্রাণবন্ত ও কার্যকর করতে হলে সংসদ সদস্যদের অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। যুক্তিতর্কের সঙ্গে বিতর্কে অংশ নিতে হবে। সংসদ সদস্য হিসেবে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হলে সংবিধান, কার্যপ্রণালি বিধি, সংসদীয় রীতিনীতি ও পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে হবে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, গণতন্ত্র আমদানি বা রপ্তানিযোগ্য কোনো পণ্য বা সেবা নয়। কোনো দেশ থেকে পরিমাণমতো গণতন্ত্র আমদানি বা রপ্তানি করলাম, বিষয়টি এমন নয়। চর্চার মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র বিকশিত ও শক্তিশালী হয়।

পরমতসহিষ্ণুতা, বিরোধী দলকে আস্থায় নেওয়া এবং অন্যকে কীভাবে সম্মান দেওয়া যায়– এসব বিষয়ে বঙ্গবন্ধু বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় নজির রেখে গেছেন  মন্তব্য করে রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, কেবল গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিতরাই সংসদে জনগণের প্রতিনিধিত্ব এবং জনগণের নিকট জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারেন। এ বিষয়ে সরকারি ও বিরোধী উভয় পক্ষের সংসদ সদস্যরাই জাতির কাছে দায়বদ্ধ। এই উপলব্ধি থেকে হিংসা-বিদ্বেষ, ব্যক্তিগত এবং দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াসে সংসদ সদস্যদের গঠনমূলক, কার্যকর ও সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি।

তিনি বলেন, সংঘাত-সংঘর্ষ এবং যে কোনো উগ্রবাদ ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড হতে দূরে থেকে কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনে শামিল ও গণতন্ত্রকে বিপন্ন করে তোলে এমন যে কোনো অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি।

আরও পড়ুন

×