ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬

করোনার নেতিবাচক প্রভাব

কোথাও কোনো কাজ নেই দিশেহারা শ্রমজীবী মানুষ

কোথাও কোনো কাজ নেই দিশেহারা শ্রমজীবী মানুষ
×

করোনা আতঙ্কে রাজশাহী মহানগরীর সাধারণ মানুষ বাড়ি থেকে বের না হলেও উপায় নেই খেটে খাওয়া মানুষের। সকালে দূরদূরান্ত থেকে সাইকেল চালিয়ে এসে শহরের মোড়ে মোড়ে তারা অপেক্ষা করছেন কাজের আশায়। কিন্তু বেশিরভাগেরই মিলছে না কাজ। তালাইমারী মোড়ের ছবি -শরিফুল ইসলাম তোতা

হকিকত জাহান হকি

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২০ | ১২:৫৬

কাজ নেই, আয়-রোজগার নেই। খরচ আছে। যারা দিন আনে, দিন খায়; কাজ না করলে একদিনও চলে না, তারা এখন দিশেহারা। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় জনসমাগম বন্ধে পুলিশের কড়া পাহারা চলছে রাজধানীর সর্বত্র। ফলে বেকার হয়ে পড়েছে স্বল্প আয়ের অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষ। হাত গুটিয়ে বসে আছে তারা। দোকানপাট, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ। কোথাও কাজ নেই। এ পরিস্থিতিতে পেটে ভাত জোগাতে হিমশিম খাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
বুধবার সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বেকার হওয়া সাধারণ মানুষের দুর্দশার চিত্র নজরে এসেছে। শ্রমিক, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, হকার, ঠেলাগাড়ি চালক, রিকশাচালক, মিন্‌তি, ফড়িয়া, কয়ালরা চরম সংকটের মাঝে দিন কাটাচ্ছে। প্রত্যক্ষ করা গেছে, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সরকারকে কঠোর হতে হচ্ছে। কোনোভাবেই জনসমাগম না করা, সবকিছু বন্ধ করা, লকডাউন হওয়ায় স্বল্প আয়ের মানুষেরা এখন বেকার। এই সংকটকালে তাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য সরকারি-বেসরকারি পর্যায় থেকে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেই। নিম্ন-মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তরা বিদ্যমান সংকটের ধকল সামলাতে পারলেও সীমিত আয়ের মানুষেরা হয়ে পড়েছে উপায়হীন।
রাজধানীর কারওয়ানবাজারে গিয়ে শত শত ঠেলাগাড়ি সারিবদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে মঙ্গলবার রাতে। তখন রাত সাড়ে ১০টা।
ঢাকার বাইরে থেকে কাঁচামাল বোঝাই ট্রাক আসেনি তখনও। এই ঠেলাগাড়ি চালকরা ট্রাক থেকে নামানো মাল আড়তে পৌঁছে দিয়ে মজুরি পেয়ে থাকে। মাল না আসায় হাত গুটিয়ে বসে ছিল তারা।
ঠেলাগাড়ি চালক উজ্জ্বল হোসেন বলেন, 'ঢাকার বাইরে থেকে মালের ট্রাক আসা একেবারেই কমে গেছে। বাজারে পাইকার কম, ক্রেতাও কম। তাই কাজও কম। কখন একটা-দুইটা ট্রাক আসবে তার জন্য অপেক্ষা আমাদের। অনেকেই ঠেলাগাড়ি রেখে চলে গেছে।'
উজ্জ্বল হোসেন আরও জানান, গোটা কারওয়ানবাজারে এক থেকে দেড় হাজার ঠেলাগাড়ি চালক। আগে প্রতিজনের আয় হতো ৬শ' থেকে ৮শ' টাকা। এখন ২শ' টাকা রোজগারে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কেউ কেউ শূন্য হাতেও ফিরে যায়। এর মধ্যে সংসার খরচ কীভাবে চলবে- এই ভাবনার শেষ নেই। টুকটাক মাল আসে এখন। তাতে সামান্য কিছু কাজ পাওয়া যায়।
শ্রমজীবী মানুষের কথা- এই দুর্দিনে কেউ তাদের পাশে দাঁড়াবে, সহায়তার হাত বাড়াবে; এমন কেউ নেই। চলমান সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য সরকার, বেসরকারি খাতের সম্পদশালীরা, কোনো প্রতিষ্ঠান, সংস্থার আর্থিক সহায়তা তাদের জন্য জরুরি।
ওই রাতে আরও অনেক ঠেলাগাড়ি চালক ছিল। তাদের মধ্যে রফিক, হামিদ, কাওসার, জুয়েল, মজনু, বিল্লাল, তাজুল ইসলাম, মো. হোসাইন, দেলোয়ার হোসেন, রাজু শেখ, সুলতান, শেখ রাজু, শেখ ফরিদ, সৈয়দ হোসেনসহ উপস্থিত সবাই তাদের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরেছেন।
বুধবার গুলিস্তান শপিং কমপ্লেক্স সংলগ্ন একটি ভবনের নিচে সড়কের সঙ্গে জিন্সের কয়েকটি প্যান্ট নিয়ে বসে ছিলেন ফুটপাতের ব্যবসায়ী মো. আনসার। সকালে দোকান খুলে বিকেল ৪টা পর্যন্ত একটি প্যান্টও বিক্রি করতে পারেননি। তার সঙ্গের আরেক ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর জানালেন, নিত্যদিনে কাজ ছাড়া তার সংসার চলে না। দুই পিস প্যান্ট বিক্রি করেছেন তিনি।
সামনেই দেখা হলো রিকশাচালক মো. রতনের সঙ্গে। জানালেন, আগের মতো খেপ পাওয়া যায় না। সকাল ৯টায় বের হয়ে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত পকেটে উঠেছে ৩৬০ টাকা। আগে এই সময়ে কামাই হতো ৮শ' থেকে ৯শ' টাকা। স্ত্রী, এক ছেলে, দুই মেয়ের সংসার চলবে কীভাবে- এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি।
বুধবার বিকেলে কথা হলো কারওয়ানবাজারের ফড়িয়া শ্রী রবির সঙ্গে। ফড়িয়ারা ঢাকার বাইরে থেকে আসা মাল বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেন। তিনি জানালেন, পুরো কারওয়ানবাজারে এখন দুর্দিন চলছে। কাজ একেবারে কমে গেছে। ক্রেতা কমে যাওয়ার কারণে মালও তেমন আসে না। এ পরিস্থিতিতে আড়ত মালিক, ফড়িয়া, কয়াল, দিনমজুর, মিন্‌তিসহ নানা ক্ষেত্রে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষদের কাজ কমে গেছে। কাজ নেই বলে কেউ কেউ বাজারে আসেও না।

আরও পড়ুন

×