সরেজমিন জাতীয় স্মৃতিসৌধ
দ্বিগুণ হবো আগামী স্বাধীনতা দিবসে
বৃহস্পতিবারের ছবিটি একেবারেই ব্যতিক্রম। স্বাধীনতা দিবসে জাতীয় স্মৃতিসৌধ এমন জনশূন্য ছিল না কোনো দিন - মাহবুব হোসেন নবীন
রাজীব নূর
প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২০ | ১৩:০০ | আপডেট: ২৭ মার্চ ২০২০ | ০২:০৩
'আসছে ফাল্গুনে আমরা কিন্তু দ্বিগুণ হবো'- জহির রায়হানের 'আরেক ফাল্গুন' উপন্যাসের শেষ বাক্য এটি। ১৯৫৫ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি পালনের গল্প অবলম্বনে রচিত উপন্যাসটি। সে বছরই শহীদ মিনারের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়পড়ূয়া কিছু তরুণ-তরুণী এক সকালে হঠাৎ করেই খালি পায়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন ঢাকার রাস্তায়। কাগজ আর বাঁশ দিয়ে বানিয়েছিলেন শহীদ মিনার। পুলিশের তোপে বেশিক্ষণ টেকেনি তা। ভেঙে দেওয়া হয় শহীদ মিনার এবং আটক করা হয় ওই তরুণদের। উপন্যাসের একেবারে শেষাংশটি এ রকম- 'নাম ডেকে-ডেকে তখন একজন করে ছেলেমেয়েদের ঢোকানো হচ্ছিলো জেলখানার ভেতর। নাম ডাকতে ডাকতে হাঁফিয়ে উঠেছিলেন ডেপুটি জেলার সাহেব। একসময়ে বিরক্তির সাথে বললেন, উহ্, এত ছেলেকে জায়গা দেবো কোথায়। জেলখানা তো এমনিতেই ভর্তি হয়ে আছে। ওর কথা শুনে কবি রসুল চিৎকার করে উঠলো, জেলখানা আরো বাড়ান সাহেব। এত ছোট জেলখানায় হবে না। আর একজন বললো, এতেই ঘাবড়ে গেলেন নাকি? আসছে ফাল্গুনে আমরা কিন্তু দ্বিগুণ হবো।'
বৃহস্পতিবার মহান স্বাধীনতা দিবসে জনশূন্য স্মৃতিসৌধে দাঁড়িয়ে এই উপন্যাসের কথা মনে আসবে কেন? ১৯৫৫ আর ২০২০ সালের মধ্যে তফাৎ তো দুস্তর। বৈরী রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে তো প্রকৃতির প্রতিকূলতা মেলানো যায় না। ১৯৫৫ আর ২০২০ সালের প্রতিপক্ষ তো ভিন্ন। প্রকৃতিকে কি প্রতিপক্ষ বলা যায়? নিশ্চয়ই না। এ আসলে মানবজাতির পাপের পরিণতি- 'পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন'। সেই অসুখের ছাপ পড়েছে স্মৃতিসৌধে। দিবসটি উদযাপনের জন্য মার্চের শুরু থেকে সাজানো স্মৃতিসৌধ গতকাল ছিল জনমানবশূন্য। মুক্তিযুদ্ধের সূচনার এই দিনটি জাতি নিবিড় আবেগের সঙ্গে স্মরণ করে আসছে সেই ১৯৭২ সাল থেকে। কিন্তু এবার এমন এক সময়ে ৪৯তম স্বাধীনতা দিবস সামনে এলো, যখন নভেল করোনাভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণের কারণে সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশও আক্রান্ত। এই কারণে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ ও ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু ভবনে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানানোসহ সব জাতীয় কর্মসূচি বাতিল করা হয়। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও স্বাধীনতা দিবসের সব কর্মসূচি বাতিল করে। কর্মসূচি বাতিল হলেও স্বাধীনতার এই দিনে বাঙালি জাতির যে যেখানে ছিলেন, সেখান থেকেই নিশ্চয়ই বিনম্র শ্রদ্ধা ও গভীর কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করেছেন দেশমাতৃকার জন্য আত্মদান করা বীর সন্তানদের।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্বাধীনতা দিবসের কর্মসূচি বাতিলের এমন ঘটনা আর কখনই ঘটেনি। ১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি প্রকাশিত এক প্রজ্ঞাপনে ২৬ মার্চের এ দিনটিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে উদযাপনের এবং সরকারিভাবে এ দিনটিতে ছুটি ঘোষণা করা হয়। তবে সাভারের এই স্মৃতিসৌধে স্বাধীনতা দিবস উদযাপন শুরু হয়েছে আশির দশকে। এর আগে দিবসটি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই উদযাপিত হতো, যেখানে বঙ্গবন্ধু দিয়েছিলেন সাতই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ। ১৯৭৫ সালের ২৭ মার্চের 'দৈনিক সংবাদ' থেকে জানা যায়, বঙ্গবন্ধু জীবদ্দশায় শেষ স্বাধীনতা দিবসের ভাষণটিও দিয়েছিলেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। ওই ভাষণে তিনি তার দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি ব্যাখ্যা করেছিলেন এবং নতুন বাংলাদেশকে গড়ার লক্ষ্যে সাময়িকভাবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর নির্দেশনা দিয়েছিলেন। ওই বছরের ১৫ আগস্ট সপরিবারে নিজ বাসভবনে হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধুকে। সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধের ভিত্তিপ্রস্তর অবশ্য বঙ্গবন্ধুর হাতেই স্থাপিত হয়েছিল ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর। এর প্রায় ১০ বছর পর ১৯৮২ সালে স্মৃতিসৌধটি উদ্বোধন হয় এবং পরের বছর ১৯৮৩ সাল থেকেই এখানে স্বাধীনতা দিবস উদযাপন হয়ে আসছে।
স্বাধীনতা দিবসের উদযাপনে অংশ নিতে কতবারই না এসেছি এখানে। প্রথমবার এসেছিলাম বোধ হয় নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি কোন বছরে। তার পর থেকে বিজয় দিবস ও স্বাধীনতা দিবসে স্মৃতিসৌধে যাওয়া হয়নি, এমন খুব একটা ঘটেনি। প্রতিবছরই দেখেছি মানুষের সমাগম বাড়ছে। তবু প্রথমবারের স্মৃতিটিই বেশি মনে পড়ে। আগের সন্ধ্যায় গিয়ে পৌঁছালাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। বোধ হয় রাতের খাবার শেষ করেই চলে গিয়েছিলাম স্মৃতিসৌধে। জাহাঙ্গীরনগর থেকে স্মৃতিসৌধ হেঁটে পথটা পাড়ি দিতে হয়েছিল। বন্ধুরা পথে যেতে যেতে গলা ছেড়ে গাইছিল দেশের গান। সেই রাতে আমার বন্ধুরা নিশ্চয়ই 'তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেব রে' গানটিও গেয়েছিল। আদৌ ওই রাতে এই গানটি গাওয়া হয়েছিল কি না, মনে নেই। গাওয়াটাই স্বাভাবিক। যুদ্ধের দিনগুলোর এই গান তো আমরা গাই সর্বদাই, স্বাধীনতা দিবসের আগের রাতে গাওয়াটাও খুব স্বাভাবিক। এতকাল পরে এই স্মৃতি পুনরুদ্ধার করতে পারছি না। কিন্তু গতকাল সকালে স্মৃতিসৌধে দাঁড়িয়ে বারবারই মনে পড়েছে 'তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেব রে' গানটি। করোনা-আতঙ্কে পুরো বিশ্বটাই যেন এমন তীরহারা এখন।
সূর্যোদয়ের পর সহকর্মীদের সঙ্গে ঢাকা থেকে রওনা দেওয়ার সময়ই ধারণা করা গিয়েছিল, স্মৃতিসৌধে গিয়ে কাউকে পাওয়া যাবে না। স্মৃতিসৌধ পর্যন্ত পৌঁছাতে অভাবনীয় কম সময় লেগেছে। যানবাহন ছিল না বললেই চলে। স্মৃতিসৌধের প্রথম গেটটি ছিল পুরোপুরি তালা লাগানো। এখানেই কথা হলো দিনাজপুরের ফুলবাড়ী এলাকার সফিকুর রহমানের সঙ্গে। ভদ্রলোক কাজ করেন পল্লী বিদ্যুতে। নবীনগরে আছেন বছর পাঁচেক হলো। জানতেন, স্মৃতিসৌধের সব কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে। তবু এসেছেন একবার ঘুরে যাবেন বলে। আমিনুল ও মেসবাহ নামের দুই তরুণের সঙ্গেও দেখা হলো এই গেটেই। তাদের একজন আবার বাংলাদেশ লেখা লাল-সবুজ একটি টি-শার্ট পরে এসেছেন। বললেন, কর্মসূচি না থাক, দিনটা তো স্বাধীনতা দিবসই। আমার সঙ্গেই এলেন দ্বিতীয় গেট পর্যন্ত, ইচ্ছা ভেতরে ঢুকবার। হাঁটতে হাঁটতে তারা একজন অন্যজনকে বলছিলেন, ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাতটা আন্দোলনের কথা লেখা আছে স্মৃতিসৌধে। আগ্রহী হয়ে জিজ্ঞেস করি, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের মাঝের আন্দোলনগুলো কী? বলতে পারলেন না ১৯৫৮ সালের সামরিক আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলনের কথা। শুধু বললেন, একটা খাঁজে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান বোঝায়, বাকিগুলো মনে নেই। মনে রাখতে না পারায় সংকোচ প্রকাশ করলেন তরুণটি।
দ্বিতীয় গেট খোলা থাকলেও ওই তরুণদের ঢুকতে দেওয়া হলো না। নিতান্তই সাংবাদিক পরিচয়ের কারণে আমাদের উপেক্ষা করতে পারলেন না দ্বাররক্ষী। ভেতরে কয়েকটি টেলিভিশনের সাংবাদিকরা আগে থেকেই ছিলেন। পুরো স্মৃতিসৌধ চত্ত্বর ঘুরে আসতে বেশি সময় লাগল না। মনে পড়ল, ২০০১ সালে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলার পর এমন শূন্য হয়ে গিয়েছিল পুরো রমনা উদ্যান। সেদিনও সংবাদ সংগ্রহের কাজে ছিলাম সেখানে। পরের বছর বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের শুরু হয়েছিল সামান্য সমাগমের মধ্যে। কিন্তু একটু বেলা হতেই মানুষের ঢল নেমেছিল। সেই সমাগম উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। নিশ্চয়ই স্মৃতিসৌধের এই কর্মসূচিতেও সমাগম বাড়বে। গেট দিয়ে বেরিয়ে আসার সময় দেখলাম, দেড় বছরের শিশুপুত্রসহ এক বাবা তাদের একটু সময়ের জন্য ভেতরে ঢুকতে দেওয়ার অনুরোধ করছেন। তাকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। জনসমাগম এড়ানোর জন্যই এই কঠোরতা। তবে এই বাবাটিকে দেখে আমার জহির রায়হানের 'আরেক ফাল্গুন' উপন্যাসের শেষ বাক্যটি মনে এসেছে, মনে মনে বলেছি, আগামী স্বাধীনতা দিবসে অন্য যে কোনো বছরের তুলনায় আমরা দ্বিগুণ হবো। তখন নিশ্চয়ই করোনায় কাতর পৃথিবী আবার শান্ত হবে।
- বিষয় :
- স্মৃতিসৌধ
- ফাল্গুন
- ২৬শে মার্চ
- স্বাধীনতা দিবস
