এক বছরে রোগী বেড়েছে আড়াই গুণ
তবিবুর রহমান
প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৩ | ১৮:০০
সরকারি- বেসরকারি নানা পদক্ষেপের পরও গত এক বছরে লাফিয়ে বেড়েছে মশাবাহিত রোগ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আগের বছরের তুলনায় ২০২২ সালে রোগী শনাক্তের হার ছিল আড়াই গুণ বেশি। বর্তমানে দেশের ১৩ জেলার ৭২ উপজেলায় এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে। তবে বান্দরবানের তিন উপজেলায় প্রাদুর্ভাগ বেশি। মোট শনাক্তের ৮৫ শতাংশই এ তিন উপজেলায়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার মধ্যে ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচিতে ধীরগতি, রোগী শনাক্তে গতানুগতিক উপায়ে নির্মূল কার্যক্রম পরিচালনা, আন্তঃসীমান্ত সমন্বয়হীনতা, পার্বত্য উপজেলাগুলোতে স্বাস্থ্যকর্মী পৌঁছাতে জটিলতা, অধিক বৃষ্টিপাত, পাহাড়-বনাঞ্চলবেষ্টিত পরিবেশ, অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবাসহ নানা কারণে ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। এতে ১৩ জেলার ৭২ উপজেলায় এ রোগের বিস্তার ঠেকানো যাচ্ছে না। ম্যালেরিয়া নির্মূলে উদ্ভাবনী শক্তি কাজে লাগিয়ে সবাইকে সচেতন হওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ সালে ১৮ হাজার ১৯৫ জনের শরীরে ম্যালেরিয়া শনাক্ত হয়। এর আগের বছর ২০২১ সালে সারাদেশে ৭ হাজার ২৯৪ জনের দেহে এ ভাইরাস পাওয়া যায় (আড়াই গুণ বেশি)। তবে প্রাণহানির সংখ্যা ছিল আগের বছরের মতোই, অর্থাৎ মৃত্যু হয়েছে ১১ জন করে।
গত পাঁচ বছরে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে সংক্রমণের হার। এ সময়ে রোগী বেড়েছে ৫৮ শতাংশ। গত ২২ বছরের আক্রান্ত ও মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সর্বোচ্চ রোগী শনাক্ত হয় ২০০৮ সালে। ওই বছর ৮৪ হাজার ৬৯০ জন ম্যালেরিয়া রোগী পাওয়া যায়। তবে সর্বোচ্চ মৃত্যু হয় ২০০২ সালে। ওই বছর ৮৫৫ জন মারা যান। সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া গেছে বান্দরবানে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, কোনো এলাকায় পরপর তিন বছর ম্যালেরিয়ার স্থানীয় সংক্রমণ না ঘটলে ওই এলাকাকে ম্যালেরিয়ামুক্ত ঘোষণা করা যেতে পারে। সে অনুযায়ী গত চার বছরে ম্যালেরিয়াপ্রবণ ১৩ জেলার দুই-তৃতীয়াংশ উপজেলায় কোনো ম্যালেরিয়া রোগী পাওয়া যায়নি। বাকি ৫১ জেলা আগে থেকেই ম্যালেরিয়ামুক্ত।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মহামারির কারণে ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। ফলে ডায়াগনসিস কমে যাওয়ায় ২০২১ সালে রোগীও কমেছে। কাজে গতি আনতে নতুন কর্মকৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে গত বছর থেকে আবারও করোনা-পূর্বকালের অবস্থায় ফিরেছে ম্যালেরিয়া। করোনার সময়ের দুই
বছরে কুড়িগ্রাম ও ময়মনসিংহ বিভাগের জেলাগুলোতে শূন্যের কোটায় চলে এলেও আবারও সেখানে প্রকোপ বাড়ছে, যা রীতিমতো উদ্বেগের, বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
এমন পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে প্রতি বছরের মতো আজ (মঙ্গলবার) বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস পালিত হচ্ছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য, ‘ম্যালেরিয়া নির্মূলে বিনিয়োগ করুন, উদ্ভাবন করুন, বাস্তবায়ন করুন।’
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এটি পালন করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচি শাখার উদ্যোগে আলোচনা সভা হওয়ার কথা রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার (ম্যালেরিয়া ও এডিসবাহিত রোগ) ডা. ইকরামুল হক বলেন, যারা বনে-জঙ্গলে যান, আক্রান্তের সংখ্যা তাঁদের মধ্যে বেশি । জীবনাচারের কারণে মোরো জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি। এ রোগের প্রকোপ কমাতে নতুন কর্মকৌশল নির্ধারণ করেছে সরকার। আক্রান্তদের অন্যান্য চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি মশারিতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এ ছাড়া টিকা দেওয়ারও পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক (সংক্রামক) অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম সমকালকে বলেন, বান্দরবানের উপজেলাগুলো দুর্গম হওয়ায় ঠিক মতো রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা দিতে পারেন না স্বাস্থ্যকর্মীরা। এ ছাড়া রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারও ম্যালেরিয়ার উচ্চ ঝুঁকির তালিকায়। আর সংখ্যায় কম হলেও এখনও ম্যালেরিয়া রয়েছে ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা, কুড়িগ্রাম, সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলায়। তিনি বলেন, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে রোহিঙ্গারা। তাই এ রোগ নির্মূলে ভারত ও মিয়ানমারের সহযোগিতা প্রয়োজন। তবে আমাদের যে কার্যক্রম চলমান আছে, আশা করা যায় ২০৩০ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়া নির্মূলের লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার সমকালকে বলেন, ম্যালেরিয়া পরিস্থিতির উন্নতি যে হয়নি, সেটি বলা যাবে না। তবে প্রত্যাশিত মাত্রায় হয়নি। বিশেষ করে বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির মতো জেলাগুলোতে এখন এ রোগের প্রকোপ রয়েছে। এসব এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মীরা পৌঁছাতে পারছেন না। এমনকি স্বাস্থ্যকর্মীরা এলাকার জনগণের ভাষা বুঝতে না পারায় সেবা দিতে জটিলতা তৈরি হয়।
- বিষয় :
- ম্যালেরিয়া
- মশাবাহিত রোগ
