শান্তিচুক্তিতে থামবে কি বাটামারার রক্ত খেলা
সাহাদাত হোসেন পরশ
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৩ | ১৮:০০
কথা মাটিতে পড়তে পারে না, সেই কথা নিয়েই শুরু হয়ে যায় রক্ত খেলা। হামলার বিপরীতে পাল্টা হামলা, লাশের বদলে লাশ। আধুনিক সমাজ ও সভ্যতা ছাপিয়ে সেখানে সামান্য ঘটনা নিয়ে চলে হানাহানি। একদিকে হাজি গোষ্ঠী, অন্যদিকে আকন গোষ্ঠী। একে অপরের চক্ষুশূল। বরিশালের মুলাদীর বাটামারার এ দুই গোষ্ঠীর ‘হিংসাত্মক যুদ্ধে’ কারও প্রাণ গেছে অবেলায়, কারও জীবন টিকে আছে ভাগ্যে! বিভেদ মেটাতে এক বংশের মেয়ের সঙ্গে আরেক বংশের ছেলের বিয়ের টোটকাও কাজে দেয়নি। শেষমেশ দুই গোষ্ঠীর সদস্যরা মনের দহন ভুলে একই পথে হাঁটার উপায় খুঁজছেন।
গত রোববার দুই বংশের মধ্যে ১০০ টাকার স্ট্যাম্পে ১৫ শর্তে হয়েছে এক অভিনব শান্তিচুক্তি! এই চুক্তিতে দুই গোষ্ঠীর ১৫ জন করে সদস্য সই করেছেন। বাটামারা ইউনিয়নবাসী আশায় বুক বেঁধেছেন, এবার হয়তো রক্তাক্ত এ জনপদে ফিরবে শান্তি।
শতবছরের বিভেদ রেখা
মুলাদী থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে ছিমছাম ইউনিয়ন বাটামারা। জমি, পারিবারিক বিরোধ ও বংশীয় দ্বন্দ্বের জেরে যুগের পর যুগ সেখানকার কেউ হারিয়েছেন স্বামী, কেউ স্ত্রী, কেউ সন্তান আবার কেউ ভাই। হাজি ও আকন গোষ্ঠীর বিরোধের ইতিহাস ১০০ বছরের পুরোনো হলেও গত ২৩ বছরের মামলার পরিসংখ্যান পুলিশের কাছ থেকে মিলেছে। নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দুই যুগে দুই পরিবারের ২৮ জনের লাশ পড়েছে। বাটামারা ও পাশের সফিপুর ইউনিয়নে খুনোখুনি, হামলা, অপহরণসহ নানা অপরাধে মামলা হয়েছে ৯৩৪টি। নারী ও শিশু অপহরণের ঘটনা আছে ১২০টি, অপহরণ ২২টি আর ডাকাতি সাতটি। এসব মামলায় আসামির সংখ্যা ৪ হাজার ৪৩৯ জন। হত্যা মামলার আসামি ৩২৭ জন। কোনো একটি এলাকার বংশীয় বিরোধে এত সংখ্যক খুনোখুনি ও মামলার ঘটনা বিরল– বলছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
এপ্রিলেও পড়ে দুই লাশ
সর্বশেষ গত ১০ এপ্রিল হাজি গ্রুপের হামলায় আকন গ্রুপের আলমগীর কবিরাজ ও হেলাল উদ্দিন নামে দু’জন খুন হন। আলমগীরের নামে ছিল ১৮ মামলা। জোড়া খুনের ঘটনায় দায়িত্ব অবহেলা ও যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে মুলাদী থানার তৎকালীন ওসি তুষার কুমারের ‘চেয়ার’ হারাতে হয়। কিছু দিন পরপরই গোষ্ঠীর বিরোধে হামলা-সংঘর্ষ, আগুন, লুট, বোমা হামলার ঘটনা ঘটত। এর জের ধরে পাল্টাপাল্টি মামলা হয়। আবার এক পক্ষ অন্য পক্ষকে ফাঁসাতে মিথ্যা মামলাও ঠুকত।
দুই পক্ষের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন হাজি গ্রুপের লোকজন এলাকা থেকে বিতাড়িত ছিল। এপ্রিলে আকন গ্রুপকে এলাকাছাড়া করে হাজি গ্রুপ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। ১০ এপ্রিল উভয় পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। এতে হাজি গ্রুপের হাতে আকন গ্রুপের দু’জন খুন হন। এর পর হাজি গ্রুপ আর
এলাকায় ঢুকতে পারেনি। আগের মতো ওই ঘটনায়ও মামলা হয়।
অবশেষে শান্তিচুক্তি বাটামারার পরিস্থিতি বদল না হওয়ায় স্থানীয় পুলিশ নতুন পথ খোঁজে। দুই গোষ্ঠীর যে সদস্যদের মধ্যে বহু বছর মুখ দেখাদেখি বন্ধ ছিল, তাদের একসঙ্গে বসানো হয়। ছয়টি ঘরোয়া সভার আয়োজন করে বরফ গলানোর পর ১৫ শর্তে শান্তিচুক্তি করতে রাজি হন তারা। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে– কোনো পক্ষ কোনো অপরাধীকে আশ্রয় দিতে পারবে না। অপরাধীদের প্রশ্রয় না দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে সহায়তা করবে। সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কেউ সুপারিশও করতে পারবে না। অপরাধের দায় ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়, যে অপরাধ করবে তার দায় নিজে বহন করবে। এটাকে গোষ্ঠীগত বিচার বলা যাবে না। যিনি অপরাধ করবেন, দেশের প্রচলিত আইনে শাস্তির আওতায় আসবেন। বাটামারার কোনো ঘটনায় পাশের কালকিনী বা গোসাইরহাটের কোনো ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে কারও আত্মীয় পাশের থানায় থাকলেও বাটামারা এলাকার শান্তি স্থাপনের স্বার্থে ভিন্ন থানার আত্মীয়দের বাটামারার ঘটনায় অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে, তবে তার বাড়িতে হামলা-লুটপাট এবং পরিবারের কোনো সদস্যকে হয়রানি করা যাবে না। শান্তিচুক্তির পর যার যার বাড়িতে অবস্থান করবে। আগের ক্রোধে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক আচরণ করা যাবে না। যদি কেউ এমন আচরণ করে, চুক্তিতে যারা সই করেছেন তারাই ব্যবস্থা নেবেন। প্রয়োজনে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে সহায়তা করবেন। শান্তিচুক্তির কারণে আগের বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে বলে গণ্য হবে। আগের হামলা-ভাঙচুর নিয়ে কোনো নতুন মামলা করা যাবে না। আগের ঘটনা নিয়ে বিচারাধীন মামলা নিষ্পত্তিযোগ্য হলে উভয় পক্ষের সম্মতিতে মীমাংসার মাধ্যমে আদালত থেকে তুলে নিতে পারবেন। অনিষ্পত্তিযোগ্য বিচারাধীন মামলা আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে। যাদের বিরুদ্ধে আগে থেকে মামলা চলমান রয়েছে তা যথাযথ আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হবে। এ বিষয়ে কারও অভিযোগ আমলে নেওয়া হবে না। মাদক কারবারি, বোমাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য স্ব স্ব ব্যক্তি দায়ী থাকবেন। গ্রেপ্তারি ও সাজা পরোয়ানাভুক্ত কোনো আসামি জামিন না নিয়ে এলাকায় চলাফেরা করতে পারবে না।
হাজি বংশের সদস্য হিসেবে চুক্তিতে সই করেছেন অ্যাডভোকেট তরিকুল হাসান পলাশও। তিনি বলেন, ‘আমার বয়স ৪৬। দাদা লতিফ হাওলাদারের আমল থেকে দেখছি, বাটামারায় দুই গোষ্ঠীর মধ্যে ভয়ংকর সব ঘটনা। খুনোখুনি-মারামারি লেগেই থাকে। বড় হয়ে শুনেছি, গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব মেটাতে আমার প্রপিতামহ রজ্জব আলী হাওলাদার আমার দাদাকে আকন বংশের মেয়ে জবেদা খাতুনের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলেন। এর পর অনেকবার দুই পরিবারের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক হয়। তাতেও পরিস্থিতি বদলায়নি। চোখের সামনে দুই পরিবারের অনেকের করুণ পরিণতি দেখেছি।’
আকন বংশের সদস্য হিসেবে চুক্তিতে সই করেছেন মোকসেদ আকন। তিনি বলেন, ‘বাপ-দাদার আমল থেকে এই বিরোধ চলছে। বাপ-দাদারা এখন নেই। আমরাই এলাকার মুরুব্বি। বয়স ৭০ পার হয়েছে। জীবন সায়াহ্নে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে চেষ্টা করুম, যেন এলাকায় শান্তি আসে। এটা বলতে দ্বিধা নেই, আমাদের উভয় গ্রুপের ছত্রছায়ায় অনেক সন্ত্রাসী, মাদকসেবী, কারবারি ছিল। গোষ্ঠীগত সমস্যার কারণে একটি খারাপ চক্রের কাছে জিম্মি ছিলাম আমরা। তারা আমাদের কাছ থেকে সুবিধা নিত। এই অবস্থা থেকে মুক্তি চাই।’
যা বলছে পুলিশ
বরিশালের পুলিশ সুপার ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, দুটি গ্রুপের মধ্যে যুগের পর যুগ যে সংঘাত চলছিল, চুক্তির মধ্য দিয়ে তা মিটে যাবে বলে আশা করছি। চুক্তিতে যারা সই করেছেন তারা এলাকার শান্তি ফেরাতে ভূমিকা রাখার অঙ্গীকার করেছেন। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তো রয়েছেন। এটি শান্তির নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। মামলা-গ্রেপ্তার করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না। সুনাগরিক হিসেবে যার দায়িত্ব তাকে পালন করতে হবে।
মুলাদী থানার ওসি মাহবুবুর রহমান বলেন, নতুন যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, এতে বাটামারায় শান্তি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আমরা আশাবাদী। এলাকার সাধারণ মানুষ ও বিবদমান পক্ষের সহায়তা ছাড়া কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান অসম্ভব। বাটামারার জনগণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এর সুফল পাবে।
- বিষয় :
- শান্তিচুক্তি
