ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

টার্গেটে দুই এমপি

তদন্ত শুরু :সঠিক নয়, বললেন বাবু

তদন্ত শুরু :সঠিক নয়, বললেন বাবু
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০১৯ | ১৩:১১

নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের নির্বাচিত সরকারদলীয় সাংসদ নজরুল ইসলাম বাবুর আয়কর নথি খতিয়ে দেখছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অভিযোগ পাওয়া গেছে, তার নামে-বেনামে বিভিন্ন ব্যাংকে একাধিক মেয়াদি আমানত (এফডিআর) রয়েছে, যা তিনি আয়কর ফাইলে দেখাননি। এ ছাড়া চলতি, সঞ্চয়ীসহ নানা ব্যাংকে অর্থ গচ্ছিত রয়েছে তার। বিপুল পরিমাণ সম্পদ থাকলেও আয়কর রিটার্নে এসব তথ্য গোপন করেছেন। এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এমপি বাবুর অবৈধ সম্পদের হিসাব খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। যদিও এমপি বাবু এসব অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে এনবিআর চেয়ারম্যানের বরাত দিয়ে বলেছেন, তার ব্যাংক হিসাব খতিয়ে দেখার খবরটি সঠিক নয়।

এদিকে সংশ্নিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এরই মধ্যে এমপি বাবুর অ্যাকাউন্ট তলব করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি)। একই সঙ্গে তার স্ত্রী ও মালিকানাধীন চার প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টের তথ্যও চাওয়া হয়েছে। এদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) এমপি বাবুর জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের বিষয়টি অনুসন্ধান করছে।

তবে নজরুল ইসলাম বাবু গতকাল সন্ধ্যায় মোবাইল ফোনে সমকালকে বলেছেন, এর আগে দুদক তার সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধান করেছিল। তারা কিছুই পায়নি। বিগত সংসদ নির্বাচনের তিন মাস আগেই তিনি দুদক থেকে অব্যাহতিপত্র পেয়েছেন। এনবিআর থেকে তার ব্যাংক হিসাব তলবের খবরটিও সঠিক নয় বলে দাবি করেন তিনি। এমপি বাবু বলেন, বুধবার বিভিন্ন গণমাধ্যমে এমন সংবাদ প্রকাশের পর তিনি এনবিআর চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করেছেন। চেয়ারম্যান তাকে জানিয়েছেন, এ রকম কিছু ঘটেনি। তিনি নিজেও এনবিআর থেকে কোনো ধরনের নোটিশ পাননি। বাবু আরও জানান, 'এনবিআর চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করে তিনি বলেছেন- যে কোনো নাগরিকের আয়কর ফাইল যাচাই করার দায়িত্ব এনবিআরের রয়েছে। ব্যাংক হিসাবের তথ্য চাওয়ার অধিকারও তাদের রয়েছে। আমারটা করেছেন কি-না? জবাবে চেয়ারম্যান বলেছেন, 'নো'।

ব্যাংক হিসাব তলবের খবরটি একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার বিষয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে এমপি বাবু দাবি করেন, তিনি ১৯৯৬ সাল থেকে নিয়মিত শতভাগ আয়কর দিয়ে আসছেন। এমনকি যে মোবাইল ফোনটি তার হাতে রয়েছে তাও আয়করে উল্লেখ রয়েছে। তিনি বলেন, গণমাধ্যমে তার যে কোম্পানির নাম দিয়েছে তাও ভুয়া। যেদিন তিনি এমপি হয়েছেন, সেদিন থেকেই ফাইভস্টার কোম্পানি বন্ধ। কোনো ব্যাংক ব্যালেন্স নেই। সেখানে কোটি কোটি টাকা আসবে কোত্থেকে?

কিন্তু গোয়েন্দা সূত্র জানায়, এমপি বাবুর নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ রয়েছে। এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুদক এবং এনবিআর পৃথক তদন্ত করছে। এর মধ্যে দুদক করছে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের বিষয়টি। অন্যদিকে, আয়ের উৎস খতিয়ে দেখছে এনবিআর। গোয়েন্দা সূত্র দাবি করছে, এমপি বাবু তার আয়কর রিটার্নে সম্পদের হিসাব গোপন করেছেন। তিনি ঠিকমতো কর দিচ্ছেন কি-না, আয়ের উৎস কী, কোন ব্যাংকে কত টাকা রয়েছে- এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের অসঙ্গতি পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হওয়ার পর যুবলীগের চেয়ানম্যানের পদ থেকে সদ্য অব্যাহতি পাওয়া ওমর ফারুক চৌধুরীসহ আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা, ঠিকাদারি ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ ও হিসাবের তথ্য তলব করেছে এনবিআর। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) সন্দেহভাজন ওইসব ব্যক্তির অ্যাকাউন্ট জব্দ ও হিসাবের তথ্য তলব করেছে। গোয়েন্দা সূত্র বলেছে, ক্যাসিনোকাণ্ডের সঙ্গে এমপি বাবুর সম্পৃক্ততা নেই। তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত ব্যাপক সম্পদ অর্জনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি খতিয়ে দেখছে এনবিআর ও দুদক।

এদিকে, একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া হলফনামায় নিজের পেশা ব্যবসা (আমদানিকারক ও সরবরাহকারী) উল্লেখ করেছেন নজরুল ইসলাম বাবু। ২৭ নভেম্বর ২০১৮ সালে দেওয়া এই হলফনামায় তিনি কৃষি খাতে বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ১০ হাজার ২০০ টাকা। বাড়িভাড়া থেকে তার নিজের কোনো আয় নেই; কিন্তু স্ত্রীর আয় বছরে এক লাখ ৪৮ হাজার ৫০০ টাকা। মৎস্য চাষ থেকে তার নিজের আয় বছরে ১২ লাখ ৫০ হাজার ৬০০ টাকা। শেয়ার বা ব্যাংক সঞ্চয়ের সুদ থেকে তার বছরে আয় ১৯ হাজার ৬৪৩ টাকা। এই খাতে বছরে তার স্ত্রীর আয় ৪৪ হাজার ৮৩৬ টাকা। তিনি নিজে সংসদ সদস্য হিসেবে সম্মানী পান ৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা। তার স্ত্রী চিকিৎসা পেশা থেকে বছরে আয় করেন ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং বেতন-ভাতা পান ৩ লাখ ৯৩ হাজার টাকা।

অস্থাবর সম্পদের মধ্যে তিনি দেখিয়েছেন, নিজের নগদ টাকা ১৯ লাখ ২৫ হাজার ৬৮৪ টাকা ৯৪ পয়সা এবং স্ত্রীর নগদ টাকর পরিমাণ ১০ লাখ ৫৭ হাজার ৪৩৫ টাকা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমাকৃত অর্থের পরিমাণ ১৩ লাখ ১৯ হাজার ৪২৩ টাকা; স্ত্রীর নামে রয়েছে ১৭ লাখ ৩১ হাজার ৪৪৬ টাকা। শেয়ার রয়েছে তার নিজ নামে ৫ লাখ ৪২ হাজার ৭০০ টাকার; স্ত্রীর নামে ৬ লাখ ১২ হাজার ৪৭৭ টাকা মূল্যের। পাঁচ বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্র রয়েছে এক লাখ ২০ হাজার টাকার; স্ত্রীর নামে নেই। এক কোটি ৬ লাখ ৪০ হাজার ৪০৩ টাকা মূল্যের নিজ নামে ল্যান্ড ক্রুজার জিপ রয়েছে। নিজ নামে ৩৫ ভরি স্বর্ণ ও স্ত্রীর নামে ৫২ ভরি স্বর্ণ রয়েছে; বিয়ের সময় উপহার পাওয়া বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়াও ৩২ বোরের একটি পিস্তল ও ১২ বোরের একটি শটগান রয়েছে তার।

স্থাবর সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, ৩৩ দশমিক ১৩ শতাংশ কৃষি জমি, ৩৬৫ দশমিক ৭৯৫ শতাংশ অকৃষি জমি নিজ নামে; অকৃষি জমির মূল্য ২ কোটি ৬ লাখ ৯৫ হাজার ৭২০ টাকা। স্ত্রীর নামে কৃষি জমি না থাকলেও অকৃষি জমি রয়েছে ৩৫৫ দশমকি ৫০ শতাংশ (যার মূল্য ৯৫ লাখ ৬২ হাজার টাকা)। এ ছাড়াও সাড়ে চার শতাংশ জমির ওপর ৩ লাখ ১৫ হাজার টাকা মূল্যের দালান এবং ৩২৩৮ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে নিজ নামে; যার মূল্য দেখিয়েছেন ৮১ লাখ টাকা। স্ত্রীর নামেও সাড়ে ৩৯ শতাংশ জমির ওপর সেমিপাকা দালান রয়েছে; যার মূল্য দেখিয়েছেন ৩৯ লাখ ৩১ হাজার টাকা। এর বাইরেও রূপগঞ্জের পূর্বাচল টাউনে ৪১ লাখ টাকা মূল্যের ১০ কাঠা ৪ ছটাকের একটি প্লট রয়েছে।

ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম বাবু ২০০৮ সালে নবম সংসদে প্রথমবারের মতো এমপি নির্বাচিত হন। নবম সংসদের ভোটে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া তার হলফনামায় তিনি নিজের পেশার ঘরে প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। কৃষি খাতে তার কোনো আয় ছিল না। ব্যবসা থেকে তার বছরে আয় হতো এক লাখ ৬৪ হাজার ৬৪০ টাকা। নিজের নামে ২০০৪ টাকার শেয়ার ছিল। কমিশন পেতেন এক লাখ ৯২ হাজার টাকা; তবে এই কমিশনের বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ নেই হলফনামায়। তার স্ত্রীর আয় দেখিয়েছিলেন এক লাখ ৭৪ হাজার টাকা।

অস্থাবর সম্পদের ঘরে নগদ টাকা নিজের কাছে ছিল ৭ লাখ ৫১ হাজার ৩৩০ টাকা। তবে স্ত্রীর কাছে নগদ টাকা ছিল না বলে উল্লেখ করেছেন। ২০০৮ সালের ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা ছিল ৯ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। নিজ নামে ৩৫ ভরি স্বর্ণ উল্লেখ করলেও স্ত্রীর নামে কোনো গহনা থাকার কথা উল্লেখ করেননি। আগ্নেয়াস্ত্রের বিষয়ে একাদশ সংসদে ও নবম সংসদে একই ধরনের তথ্য রয়েছে হলফনামায়।

নবম সংসদের হলফনামায় তার বা তার স্ত্রীর নামে কোনো কৃষি জমি ছিল না। নিজ নামে অকৃষি জমি ছিল সাড়ে আট শতাংশ; যার অর্জনকালীন মূল্য দেখিয়েছেন ৪ লাখ ৬০ হাজার ৭২০ টাকা। স্ত্রীর নামে কোনো অকৃষি জমি নেই।

আরও পড়ুন

×