পাচারের নিরাপদ রুট এখন লিবিয়া
ফাইল ছবি
রাশেদ মেহেদী
প্রকাশ: ৩০ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ মে ২০২০ | ১৪:২৮
লিবিয়া এখন মানব পাচারকারীদের স্বর্গরাজ্য। যুদ্ধাবস্থার কারণে দেশটিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। এ সুযোগ নিয়েই লিবিয়াতে গড়ে ওঠা ছোট ছোট মিলিশিয়া গ্রুপই এখন মানব পাচার নিয়ন্ত্রণ করছে। আর এই পাচারকারীরা বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশে তাদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। সূত্র জানায়, এই নেটওয়ার্ক অনেক বেশি শক্তিশালী বলেই এর আগে পুলিশ মাঠ পর্যায়ের অনেক দালালকে গ্রেপ্তার করলেও পাচারকারী নেটওয়ার্ক নতুন দালাল নিয়োগ করে কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাচারকারী নেটওয়ার্ক নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা ছাড়া ইউরোপে অভিবাসী হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা বন্ধ করা সম্ভব হবে না। দালালরা গ্রেপ্তার হলেও নেটওয়ার্কের শীর্ষ ব্যক্তিরা বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
এদিকে ত্রিপোলিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এসকে সেকেন্দার আলী গতকাল শনিবার সমকালকে জানিয়েছেন, তার সঙ্গে টেলিফোনে ত্রিপোলি নিয়ন্ত্রণে রাখা সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা হয়েছে। তিনি ২৮ মে হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। রাষ্ট্রদূত আরও জানান, মিলিশিয়ারাই জোর করে দাফন করেছে ২৬ বাংলাদেশির মরদেহ। মিজদাহ শহর এক অর্থে মিলিশিয়াদের নিয়ন্ত্রণে। তারা স্থানীয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে চাপ দিয়ে মর্গ থেকে মরদেহগুলো বের করে দাফন করে। দাফনের তথ্য শনিবার সন্ধ্যায় ত্রিপোলি কর্তৃপক্ষ দূতাবাসকে জানায়। এছাড়া পাচারকারীদের হাত থেকে কোন রকমে পালানো সাইয়েদুল হককে অক্ষত অবস্থায় ত্রিপোলিতে নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। তার মানসিক অবস্থা বিপর্যস্ত। তাকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আহতরা সুস্থ হলে দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
পাচারকারীদের নেটওয়ার্ক যেভাবে :পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রায় এক বছর আগে ২০১৯ সালের ৯ মে লিবিয়ার উপকূল থেকে অবৈধভাবে ইউরোপ যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে ৩০ বাংলাদেশি নাগরিক প্রাণ হারান। সূত্র জানায়, দূতাবাসের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, পাচারের কবল থেকে উদ্ধার হওয়া প্রায় সবাই জানান, মধ্যপ্রাচ্যের মানব পাচারকারীরা লিবিয়ায় নেওয়ার জন্য ঢাকা থেকে দুবাই, দুবাই থেকে তিউনিসিয়া হয়ে লিবিয়ায় প্রবেশ করছে। বাংলাদেশ থেকে যারা যায় তার মূলত সিলেট ও বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলের অধিবাসী। এ ছাড়া উত্তরবঙ্গের নওগাঁ, নাটোর এবং ঢাকার আশপাশের মানিকগঞ্জ, নবাবগঞ্জ এলাকার। এর অর্থ পাচারকারীদের টার্গেট এলাকা এই কয়েকটি জেলা।
সূত্র জানায়, আগে শুধু ইউরোপে যাওয়ার প্রলোভন দেখাত দালালরা। এখন মালয়েশিয়ায় পাঠানোর কথা বলে লিবিয়ায় নেওয়া হয়েছে- এমন তথ্যও সম্প্রতি পাওয়া যাচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে লিবিয়ায় উদ্ধার হওয়া মোমিনুল ইসলাম নামে নাটোরের এক যুবক জানান, তাকে মালয়েশিয়া পাঠানোর কথা বলে দালালরা দুবাই হয়ে লিবিয়ায় নিয়ে আসে। উদ্ধারকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী প্রথমে তাদের পাসপোর্ট করানো হয়। এরপর পাসপোর্টে দুবাইর ভিসা লাগানো হয়। দুবাইগামী উড়োজাহাজের টিকিট কাটা হয়। এ ক্ষেত্রে দুবাই হয়ে মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের গন্তব্যে চলাচল করা এয়ারলাইন্সগুলোই বেশি ব্যবহূত হচ্ছে। দুবাই পর্যন্ত উড়োজাহাজে নেওয়ার পর সেখানকার বিমানবন্দর থেকে বাসে করে নিয়ে যাওয়া হয় তিউনিসিয়ায়। তিউনিসিয়ায় ঢোকার পর দীর্ঘ মরু পথ ধরেই লিবিয়া সীমান্তে প্রবেশ করানো হয়। তাদের ওপর চালানো হয় অকথ্য নির্যাতন।
প্রবাসী ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সাবেক একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পাচারকারীদের নেটওয়ার্ক কতটা শক্তিশালী সেটা এই রুট দেখলেই বোঝা যায়। কারণ এমনিতেই সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভিসা পাওয়া সহজ নয়। অথচ প্রতিবারই দেখা যাচ্ছে, ৪০-৫০ জনের দলের অনায়াসে দুবাইর ভিসা করিয়ে দিচ্ছে পাচারকারীরা।
কথা বলেছেন লিবিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী : ত্রিপোলিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এসকে সেকেন্দার আলী সমকালকে বলেন, তার সঙ্গে ত্রিপোলি নিয়ন্ত্রণ করা লিবীয় সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঘটনা জানার পর নিজেই ফোন করেন। তিনি এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং হতাহতের ঘটনায় সমবেদনা জানান। তিনি এ ঘটনায় যতটা সম্ভব দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের চিহ্নিত করার প্রতিশ্রুতি দেন। রাষ্ট্রদূত বলেন, লিবীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই আশ্বাসে তদন্ত নিয়ে আশাবাদী হওয়া খুব বেশি সম্ভব নয়। কারণ যেখানে ঘটনা ঘটেছে, সেই মিজদাহ শহরটি ত্রিপোলি নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের শাসন ব্যবস্থার কর্তৃত্বে নেই। সেখানে মিলিশিয়া গ্রুপগুলোর লড়াই চলছে। আইনশৃঙ্খলা বলে মূলত কিছুই নেই। এই মিলিশিয়ারাই মানব পাচারসহ ভয়ংকর অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে সেখানে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কোনো পদক্ষেপই নিতে পারছে না কর্তৃপক্ষ।