আল্পসের বরফ গলাতে তৈরি মেসি
ছবি- এএফপি
সঞ্জয় সাহা পিয়াল, কানসাস সিটি থেকে
প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৪৬
কানসাসের আদিগন্ত শস্যক্ষেত আর কাউবয় ঐতিহ্যের শান্ত ক্যানভাসকে আর্জেন্টিনা দল যে কবে নিজেদের ‘সেকেন্ড হোম’ বানিয়ে ফেলেছে, তা বোধহয় লিওনেল মেসি নিজেও টের পাননি। বাইরের দুনিয়ায় যত উথাল-পাথালই হোক না কেন, এই মুহূর্তে কানসাস সিটিই আসলে মেসির সবচেয়ে বড় নির্ভরস্থল। হাজার হাজার আর্জেন্টাইনের নীল-সাদা ঢল, এখানকার স্থানীয় ক্যাফেগুলোতে চেনা মুখের ভিড় আর ইয়েরবা মাতের সুবাস–সব মিলিয়ে চারপাশের এই চেনা আবহ যেন তাঁকে একটা অপার্থিব স্বস্তি দিচ্ছে। আগের ম্যাচে মিসরের সেই দুর্ভেদ্য ‘পিরামিড’ ডিঙানোর পর, বাইরের সমস্ত চাপ আর কোলাহলকে দূরে সরিয়ে শান্ত হওয়ার জন্য এর চেয়ে সেরা ডেরা আর হতেই পারত না।
কিন্তু স্বস্তির সেই চাদর গায়ে জড়িয়ে বসে থাকার সময় কোথায়? মিসরের মরুঝড় পেরোনোর পর মেসির সামনে আরও এক হিমশীতল পরীক্ষা–সুইস আল্পসের অচল, পাষাণবৎ বরফের চাঁই গলানো। এক যুগ আগের সেই ব্রাজিলের রাউন্ড অব সিক্সটিনের ১১৮ মিনিটের শ্বাসরুদ্ধকর জাদুকরী পাস, কিংবা তারও আগে আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের প্রথম হ্যাটট্রিক–সুইসদের রক্তে মেসি-ম্যানিয়ার যে নীল বিষ মিশে আছে, তার শেষ অঙ্কটা মঞ্চস্থ হচ্ছে আজ শনিবার রাতে (বাংলাদেশ সময় আগামীকাল সকাল) এই কানসাসে। কেরিয়ারের এই গোধূলি লগ্নে এসে মেসির চরণের পরশে আজ আল্পসের সেই অহংকারী বরফ গলে সলিল হয়ে যাবে, নাকি আমেরিকার এই শান্ত ধূসর প্রান্তরেই থমকে যাবে ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর কবিতাটি–আজকের রাতটা আসলে সেই অপার্থিব এবং বুক ঢিপঢিপ করা রোমাঞ্চেরই।
তবে মেসি তৈরি তাঁর মতোই। এবারের আসরে এরই মধ্যে তাঁর নামের পাশে জ্বলজ্বল করছে ৮টি গোল। মেসি ভালো করেই জানেন, আল্পসের বরফ ভাঙতে কোনো গাণিতিক ছক খাটবে না; ওখানে দরকার তাঁর চিরচেনা সেই ‘ইনস্টিঙ্কট’ বা সহজাত প্রবৃত্তি। কানসাসের বেস ক্যাম্পে বুটের ফিতে বাঁধতে বাঁধতে ওই ১০ নম্বর জার্সিধারী জাদুকর নিঃশব্দে যেন সুইসদের একটা প্রচ্ছন্ন বার্তা দিয়ে রাখছেন–তোমাদের আল্পসের চূড়া যতই উঁচুতে হোক না কেন, তা চূর্ণ করার জন্য আমার ওই বাঁ পায়ের আলতো ছোঁয়াই যথেষ্ট! ডি বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া তাঁর বাঁকানো শটগুলো এখনও পর্যন্ত গোলরক্ষকের কাছে এক গোলকধাঁধার মতোই হয়ে আছে। ফক্স স্পোর্টসের এক টকশোতে সাবেক সুইস গোলরক্ষক ক্যাস্পার স্মাইকেলতো বলেই দিয়েছেন, ‘মেসির ওই নিখুঁত আর আচমকা শটগুলোর কোণ আন্দাজ করা যেকোনো গোলকিপারের জন্যই এক নরকযন্ত্রণা। তাঁকে সামলানো যে কোনো গোলরক্ষকের জন্যই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’
কৌশলের দাবার বোর্ডে ফুটবল অ্যানালিস্টরা একটা দুর্দান্ত পয়েন্ট তুলে ধরেছেন। দ্য গার্ডিয়ান এবং গোল ডটকম-এর ট্যাকটিক্যাল রিপোর্টে বলা হচ্ছে, মেসিকে বোতলবন্দি করার জন্য সুইস কোচ মুরাত ইয়াকিন মাঝমাঠে একটা নিশ্ছিদ্র লক-গেট তৈরি করছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মেসি এখন আর কেবল ওপরে খেলছেন না, তিনি নিচে নেমে এসে খেলা তৈরি করছেন। মিসর ম্যাচে লাউতারো নামার পর মেসি যেভাবে রাইট উইঙে সরে গিয়ে ডিফেন্স ফাঁকা করেছিলেন, আজকেও রদ্রিগো ডি পল আর ম্যাক অ্যালিস্টারকে সেই ফাঁকা জায়গা খুঁজে নিয়ে বল বাড়াতে হবে মেসির পায়ে। সুইসদের ইস্পাত-কঠিন রক্ষণ ভাঙার জন্য মেসির এই নতুন পজেশনই আজ আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় বাজি হতে যাচ্ছে।
তবে সব কিছুর পরেও এক রূঢ় সত্যকেও যেন আড়াল চেষ্টা আছে স্কালোনিদের মধ্যে। তা হলো, প্রতিটি স্নায়ুক্ষয়ী অধ্যায় কেন প্রতিবার কেবল একা লিওনেল মেসিকেই লিখতে হবে? দল যখনই চোরাবালিতে পড়ছে, তখনই জাদুকরের ওই অলৌকিক বাঁ-পা এসে উদ্ধার করছে নীল-সাদাকে। কিন্তু এভাবে আর কতদিন?
তিনিও তো রক্তমাংসেরই মানুষ। কোনো এক অভিশপ্ত সন্ধ্যায় তাঁরও তো অফ-ডে যেতে পারে! কোনো এক ম্যাচে যদি তাঁর ওই জাদুকরী বুট জোড়া আচমকা বিদ্রোহ করে বসে, যদি স্তব্ধ হয়ে যায় এলএমটেনের পায়ের জাদু–সেদিন এই ছন্নছাড়া আর্জেন্টিনাকে টেনে তোলার ত্রাতা কে হবেন? স্কালোনির বাকি দশটি বুট কেন তবে কেবলই বোবা দর্শক হয়ে থাকবে? মিসরের কাঁটা উপড়ে আজ যখন সামনে সুইসদের জমাট প্রাচীর, তখন কানসাসের আকাশে এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক হাহাকার।
সুইসদের রক্ষণের বিরাট বরফের চাইটা একবার দেখে নেওয়া যাক। গোলপোস্টের নিচে বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের গ্রেগর কোবেল, টাইব্রেকে কলম্বিয়াকে রুখে দেওয়া নায়ক। তাঁর ঠিক সামনে দুই সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার–ইন্টার মিলানের ম্যানুয়েল আকানজি আর মনশেনগ্লাডবাখের নিকো এলভেডি। বাঁ দিকে অভিজ্ঞ রিকার্ডো রদ্রিগেস এবং ডান দিকে উইং-ব্যাক হিসেবে নেমেছেন মোনাকোর গতিদানব দেনিস জাকারিয়া। আকানজির রয়েছে অবিশ্বাস্য এরিয়াল শক্তি, আর জাকারিয়া-রদ্রিগেসের কাজ হলো উইং বরাবর প্রতিপক্ষের আক্রমণকে লাইনের বাইরে ঠেলে দেওয়া। তবে আসল লক-গেটটা ডিফেন্সের ঠিক ওপরে; যেখানে ডাবল পিভটে অতন্দ্র প্রহরীর মতো ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন ক্যাপ্টেন গ্রানিত জাকা এবং রেমো ফ্রয়লার। কলম্বিয়া আর আলজেরিয়ার আক্রমণভাগের পা ভেঙে দেওয়া এই সুইস-দুর্গ দেখে যে কারও মনে হতেই পারে–মেসি একার পক্ষে কীভাবে সম্ভব এই সুইস আল্পসের বরফ গলানো। আজ তাই বাকিদেরও স্পর্ধিত সহযোদ্ধা হয়ে উঠতে হবে। তাহলেই ঝর্ণা হতে পারবেন মেসি।