ভারী বৃষ্টি ও ঢল
চট্টগ্রামসহ ৫ জেলায় দুর্যোগ, সুপেয় পানির সংকট
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার বাজালিয়া ইউনিয়নের বুড়ির দোকান এলাকায় ভারী বর্ষণ ও ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে চট্টগ্রাম-বান্দরবান সড়ক। গতকাল শুক্রবার দুপুরে তোলা -সংগৃহীত
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ | ০৯:১৩ | আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৬ | ০৯:২৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। চুলা ধরানোর জায়গা নেই। তাই দুর্গত এলাকার কয়েক লাখ মানুষ খাবার ও সুপেয় পানির সংকট পোহাচ্ছে। নারী ও শিশুসহ ৩০ হাজার ৫৮৫ জন উঠেছে আশ্রয়কেন্দ্রে। চট্টগ্রাম বোর্ডের আজ শনিবারের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।
এদিকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পর্যাপ্ত খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি পৌঁছানো এবং তাদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
গতকাল শুক্রবার পানিতে ডুবে চার শিশুসহ পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এ নিয়ে গত ছয় দিনে ৩৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে পাহাড়ধসে মৃত্যু হয়েছে ২৪ জনের।
চট্টগ্রামের সাতটি উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ার অবস্থা করুণ। হাজার হাজার ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট বুকসমান পানিতে ডুবে গেছে। পুকুরে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা মৎস্য প্রকল্প ও মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে। রান্নার চুলায় হাঁড়ি উঠছে না। নলকূপ পানিতে ডুবে যাওয়ায় সুপেয় পানির হাহাকার দেখা দিয়েছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাও।
বন্যার মধ্যেই বঙ্গোপসাগরের কোথাও কোথাও বেড়িবাঁধ ভেঙে পড়ছে– এই খবরে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আরও বাড়ছে। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, গতকাল পর্যন্ত জেলার প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাহাড়ধস ও পানিতে ভেসে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। দুর্গতদের জন্য ৬৭০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ২৩ হাজার ৮০০ মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে বলা হয়েছে, আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়া মানুষের খাদ্য ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।
আশ্রয় নেওয়াদের জন্য চিড়া, মুড়ি, গুড় এবং শিশুদের জন্য বিশেষ খাবার হিসেবে মাফিন, কেক ও বিস্কুটসহ ওরস্যালাইন এবং পাঁচ লিটার করে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ ছাড়া নারী ও শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে এবং প্রবীণ ও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় মেডিকেল সাপোর্ট নিশ্চিত করা হয়েছে।
গত ৫ জুলাই থেকে গতকাল ১০ জুলাই পর্যন্ত ছয় দিনে চট্টগ্রামে বৃষ্টিপাত হয়েছে এক হাজার ১১৭৫ মিলিমিটার! গত চার দশকে চট্টগ্রামে এটি সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের রেকর্ড।
পানিতে ডুবে মৃত্যু তিন শিশুর
ঢলের পানিতে ডুবে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে দুপুরের মধ্যে বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া ও সরল ইউনিয়নে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ওই তিন শিশু হলো বাহারছড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ ইলশা গ্রামের মেহের আলী বাড়ির প্রবাসী কামাল উদ্দিনের ছেলে মোহাম্মদ আশিক (৭), একই ইউনিয়নের রত্নপুর এলাকার মোহাম্মদ মিরাজ (৩) এবং সরল ইউনিয়নের জালিয়াখালী এলাকার এক শিশু।
এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত
বৈরী আবহাওয়া ও বন্যা পরিস্থিতির অবনতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন পাঁচ জেলায় আজ শনিবার অনুষ্ঠেয় এইচএসসির তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। স্থগিত হওয়া পরীক্ষার নতুন সময়সূচি পরে জানানো হবে।
গতকাল চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মো. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগের ওই পাঁচ জেলায় শনিবারের আলিম, এইচএসসি বিএমটি, ভোকেশনাল ও ডিপ্লোমা ইন কমার্স পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছে।
ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক
গত বুধবার থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনের চন্দনাইশসহ বিভিন্ন উপজেলায় রেললাইনে বন্যার পানি জমে থাকায় ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তবে গতকাল থেকে এ রুটে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে।

সেনাবাহিনী মোতায়েন
চট্টগ্রাম জেলায় ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার জন্য ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের জরুরি অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন ও ২৪ পদাতিক ডিভিশন বন্যাদুর্গত বিভিন্ন উপজেলায় অনুসন্ধান, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
কক্সবাজার
বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে ১০ উপজেলার ৪০টি ইউনিয়নের পাঁচ লাখের বেশি মানুষ। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আজাদের রহমান সমকালকে জানান, গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত কক্সবাজার জেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৬২ জন। ৬৪০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১৪ হাজার ৬১ জন রয়েছেন। সরকারিভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২০০ টন চাল, ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা।
নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে মৃত্যু হয়েছে এক শিশুর। তার নাম হাসনাতু জান্নাত (১২)। আরও দুই শিশুকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। শিশু জান্নাত উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের রসুলাবাদ গ্রামের আবদুল মালেকের মেয়ে।
কাকরা ইউনিয়নের বাসিন্দা আহমেদুল হক বলেন, ঘরে চাল আছে, তরকারি আছে। কিন্তু রান্না করার জায়গা নেই। মাটির চুলা বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। এখন শুকনা বা রান্না করা খাবার দরকার। গত বৃহস্পতিবার ভোরে ঘরে পানি ঢোকার পর থেকে ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করতে পারেননি।
উপজেলার সুরাজপুর-মানিকপুর, লক্ষ্যারচর, কৈয়ারবিল, বরইতলী, হারবাং, ফাঁসিয়াখালী, ডুলাহাজারা ও খুটাখালী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। যেসব স্থানে গতকাল হাঁটুপানি ছিল, গতকাল সেখানে কোমরপানি দেখা গেছে।
পানি ওঠার কারণে গবাদিপশু নিয়েও বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। বরইতলী ইউনিয়নের ডেইঙ্গাকাটা এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী হোসেন বলেন, পাঁচটি গরুই তাঁর একমাত্র সম্বল। পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় নৌকায় করে গরুগুলো নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছেন। পরিবারের সদস্যরা আশ্রয় নিয়েছেন পাশের একটি বাড়ির ছাদে। কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শাহিদুল আলম সমকালকে বলেন, দুর্গতদের টাকা, চালসহ প্রয়োজনীয় অনুদান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
রাঙামাটি
বাঘাইছড়ি, জুরাছড়ি, বিলাইছড়ি উপজেলাসহ ১০ উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে উদ্ভূত বন্যার পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। হাজারও মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ৪০টি আশ্রয়কেন্দ্রে আছেন ৩ হাজার ৫২৪ জন। বিভিন্ন নদনদীতে উজান থেকে নেমে আসা ঢলে বাঘাইছড়ি উপজেলা ও পৌরসভা, জুরাছড়ি উপজেলার মৈদং ইউনিয়ন, জুরাছড়ি সদর, বনযোগীছড়া ইউনিয়ন, বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি এলাকা ও বরকল উপজেলার কয়েকটি এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জেলার ১০ উপজেলার ২০৪টি আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে ৪০টিতে ৩ হাজার ৫২৪ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। এর মধ্যে রাঙামাটি সদরে ৫০৮ জন, কাউখালী ১১৫ জন, কাপ্তাইয়ে ১৯৮ জন, বাঘাইছড়ি উপজেলায় ২৩৬৬ জন, রাজস্থলীতে ৪৮ জন, নানিয়ারচরে ৩৩ জন, বিলাইছড়িতে ১২২ জন, বরকলে ১১৮ জন ও জুরাছড়িতে ১৬ জন রয়েছেন। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম জানান, পানিবন্দি লোকজনকে ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা লোকজনকে তিন বেলা খাবার দেওয়া হচ্ছে।
খাগড়াছড়ি
গতকাল দিনভর বৃষ্টি বিরতির ফলে খাগড়াছড়িতে পানি দ্রুত নামতে শুরু করেছে। জেলা ও আন্তঃউপজেলা সড়কের নিচু অংশ থেকে পানি সরে যাওয়ায় খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি, দীঘিনালা-বাঘাইছড়ি, দীঘিনালা-সাজেক এবং দীঘিনালা লংগদু সড়কেও ছোট ছোট যানবাহন এবং মানুষের চলাচল বেড়েছে। তবে কোথাও কোথাও সড়কের অবকাঠামো (সেতু ও ধারক দেয়াল) ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ভারী যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
তবে এরই মধ্যে প্লাবিত হয়েছে ৩০টি গ্রাম। পানিবন্দি হয়েছে অন্তত ৩০ হাজার মানুষ। ২৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে আছে ১৮০০ জন। জলাবদ্ধতা বিরাজ করছে জেলাশহর এবং দীঘিনালার মেরুং ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলে। জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি এলাকা পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে দীঘিনালাতেই। জেলা শহর এবং দীঘিনালা উপজেলার মেরুং ও কবাখালী এলাকায় প্রশাসন-জনপ্রতিনিধির পাশাপাশি সেনাবাহিনীকে ত্রাণ তৎপরতায় অংশ নিতে দেখা গেছে।
সাজেক থেকে ফিরেছেন ৪২১ পর্যটক
দীঘিনালা-সাজেক-বাঘাইহাট সড়কের পানি কিছুটা কমেছে। এতে সাজেকে আটকে পড়া ৪২১ পর্যটককে নিরাপদে খাগড়াছড়ি পৌঁছে দিয়েছে সেনাবাহিনী ও ট্যুরিস্ট পুলিশ। এর পর পর্যটকরা নিজ নিজে গন্তব্যে চলে গেছেন। জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত জানান, খাগড়াছড়ি থেকে পর্যটকদের নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছাতে সহযোগিতা করার জন্য পরিবহন মালিক ও অ্যাসোসিয়েশনগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বান্দরবান
জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। গতকাল পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও প্রধান সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সারাদেশের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ ছিল। গতকাল সকাল থেকে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়। তবে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় দূরপাল্লার যাত্রী, পর্যটক ও পণ্যবাহী যানবাহনের চালক ও শ্রমিকরা দুর্ভোগে পড়েছেন। জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস বলেন, ‘বন্যাদুর্গত এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া মানুষের মাঝে ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদে সরে যেতে মাইকিং এবং সার্বক্ষণিক মনিটর করা হচ্ছে।’
হাতিয়ার দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি
নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া পৌরসভা ও ১১টি ইউনিয়নের দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। গত রোববার থেকে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত টানা বৃষ্টি হয়েছে। পানিবন্দি নিম্ন আয়ের মানুষ অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন। ৩০০ হেক্টর জমির আমন ধানের বীজতলা তিন থেকে চার ফুট পানি নিচে তলিয়ে গেছে।
মৌলভীবাজারের ২৫ গ্রামের মানুষ পানিবন্দি, মৃত্যু ১
মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার উজিরপুর ও একামধু এলাকার দুটি স্থানে মনু নদের বাঁধ ভেঙে অন্তত ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। আকুয়া গ্রামে বন্যার পানিতে ডুবে আশোরফ আলী আশই (৭০) নামে এক ব্যক্তি গতকাল শুক্রবার মারা গেছেন। ভাঙন এলাকায় বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। একামধু, ভাঙ্গারহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ অন্তত চারটি স্কুল জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। একামধু গ্রামের অনেকের ঘরবাড়ি পানিতে নিমজ্জিত থাকায় পরিবারের সদস্য, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি ও অন্যান্য জিনিসপত্র নিয়ে কেউ কেউ মনুর তীর রক্ষাবাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন। অনেকে নিকটবর্তী আত্মীয়স্বজনের বাড়ি গেছেন।
সুনামগঞ্জে জনজীবন স্থবির
টানা বৃষ্টিতে সুনামগঞ্জে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। সুনামগঞ্জ শহর ও শহরতলির কোনো কোনো এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে বিকেলে জানানো হয়েছে, সকালের চেয়ে বিকেলে সামান্য পরিমাণে কমেছে জেলা শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমার পানি।
হবিগঞ্জের ১৫ গ্রাম প্লাবিত
কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে খোয়াই নদ। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জে নদের বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করেছে। এতে অন্তত ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। নিম্নাঞ্চলের বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। হঠাৎ পানি ঢুকে পড়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। গবাদি পশু ও আসবাব নিয়ে নিরাপদ স্থানে ছুটছেন দুর্গতরা।
চুয়াডাঙ্গার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত
টানা বৃষ্টিতে চুয়াডাঙ্গা জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বসতবাড়ি ও ফসলের মাঠ তলিয়ে গেছে। বিপাকে পড়েছেন মানুষ। দামুড়হুদা উপজেলার জয়রামপুরে রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় দুই গ্রামের মধ্যে চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। বৃষ্টির কারণে গ্রীষ্মকালীন সবজি ও আমন বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সাতক্ষীরায় কোথাও কোথাও হাঁটুপানি
কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে সাতক্ষীরা শহরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। শহরের বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। পৌর সদরের নিম্নাঞ্চলের গ্রামীণ সড়কগুলো পানিতে তলিয়ে গেছে। কোনো কোনো এলাকায় হাঁটুপানি জমে থাকায় সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। রাস্তার পাশের ড্রেন দিয়ে পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় অনেকের বাড়ির উঠান, রান্নাঘরে এমনকি বসতঘরে পানি জমেছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন বাসিন্দারা।
শেরপুরে ৩০ মিটার সড়ক বিলীন
টানা দুদিনের বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে শেরপুর-নালিতাবাড়ী-গাজীর খামার সড়কের গোল্লারপাড় এলাকায় প্রায় ৩০ মিটার পাকা সড়কের অর্ধেক নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। গত বুধবার বিকেল থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত দফায় দফায় ভারী বৃষ্টিপাত এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তবে বৃহস্পতিবার দুপুরের পর থেকে আর বৃষ্টিপাত হয়নি।
বেনাপোল বন্দরে কোটি কোটি টাকার পণ্য নষ্ট
টানা বৃষ্টিতে তলিয়েছে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কোটি কোটি টাকার পণ্য। বন্দরের বিভিন্ন শেডে হাঁটুপানিতে ভাসছে জিনিসপত্র। সরু ড্রেনসহ পানি নিষ্কাশনে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা থাকায় সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতার।
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, ব্যুরো ও প্রতিনিধিরা]
- বিষয় :
- বৃষ্টি
- দুর্যোগ
- সুপেয় পানি
- সংকট