১৬ দিনে আক্রান্ত অর্ধেক
প্রতীকী ছবি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৮ জুন ২০২০ | ১৫:৪৫
দেশে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে গেল। করোনা সংক্রমণের ১০৩ দিনের মাথায় গতকাল বৃহস্পতিবার দেশে আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ দুই হাজার ২৯২-তে পৌঁছায়। একই সময়ে এই মহামারিতে প্রাণ হারিয়েছেন এক হাজার ৩৪৩ জন।
করোনাভাইরাস সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করা আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডওমিটারের তথ্যানুযায়ী, সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর বিশ্বে সবচেয়ে কম সময়, মাত্র ৪৫ দিনে, তুরস্কে আক্রান্ত এক লাখ ছাড়ায়। এ ছাড়া ইতালিতে ৫৯ দিনে, স্পেনে ৬০ দিনে, যুক্তরাষ্ট্রে ৬৫ দিনে, ব্রাজিলে ৬৭ দিনে, জার্মানিতে ৬৯ দিনে, যুক্তরাজ্য ও পেরুতে ৭৬ দিনে, ইরানে ৭৭ দিনে, ফ্রান্সে ৮১ দিনে, চিলিতে ৮৭ দিনে, রাশিয়ায় ৯০ দিনে, মেক্সিকোতে ৯৭ দিনে, সৌদি আরবে ৯৮ দিনে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে ১০৩ দিনে এবং ভারতে ১০৮ দিনে আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ছাড়ায়।
১৬ দিনেই আক্রান্ত অর্ধলাখ : বাংলাদেশের সংক্রমণ পরিস্থিতি বিশ্নেষণ করলে দেখা যায়, প্রথম সংক্রমণ শুরু হয় গত ৮ মার্চ। এরপর ৫৮তম দিনে এসে সংক্রমণ ১০ হাজার ছাড়ায়। ৬৯তম দিনে এসে সংক্রমণ ২০ হাজার ছাড়ায়। সংক্রমণ ১০ থেকে ২০ হাজারে পৌঁছাতে সময় নেয় মাত্র ১১ দিন। পরবর্তী ১০ হাজার সংক্রমণ ছাড়াতে আরও কম সময় লাগে। মাত্র সাত দিনে সংক্রমণ ৩০ হাজার ছাড়ায়। সংক্রমণ ৪০ হাজার ছাড়াতে সমান সময় লাগে। ৮২তম দিনে এসে আক্রান্ত ৪০ হাজার ছাড়ায়। সংক্রমণ ৫০ হাজার ছাড়াতে সময় লাগে অতিরিক্ত মাত্র পাঁচ দিন। ৮৭তম দিনে (২ জুন) সংক্রমণ অর্ধলাখ ছাড়ায়। পরবর্তী ১৬ দিনে আরও প্রায় অর্ধলাখ মানুষ করোনাভাইরাস সংক্রমণের শিকার হন।
আগের ৮৭ দিনে আক্রান্ত হন ৫২ হাজার ৪৪৫ জন এবং মৃত্যুবরণ করেন ৭০৯ জন। পরবর্তী ১৬ দিনে আক্রান্ত হন ৪৯ হাজার ৮৪৭ জন এবং মৃত্যুবরণ করেন ৬৩৪ জন। সংক্রমণ এক লাখ ছাড়ানোর দিনে বিশ্বের শীর্ষ সংক্রমিত দেশগুলোর তালিকায় আরও একধাপ এগিয়ে কানাডাকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ ১৭তম স্থানে উঠে এলো।
চলমান পরিস্থিতিতে করোনায় দেশে আরও কত মানুষ আক্রান্ত ও মৃত্যুবরণ করতে পারে, তা নিয়ে নতুন করে একটি পর্যালোচনা করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এতে বলা হয়, সংক্রমণের চলমান ঊর্ধ্বমুখী ধারা আগামী জুলাই মাস পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। জুন মাসের বাকি সময় থেকে জুলাই মাসের শেষ পর্যন্ত সময়ে আরও এক লাখ ২৫ হাজার মানুষ আক্রান্ত হতে পারেন। আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে গিয়ে সংক্রমণের মাত্রা নিম্নমুখী হতে শুরু করবে। বর্তমানে মৃত্যুহার রয়েছে ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ। সংক্রমণ পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে তা বেড়ে ১ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ১ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে।
যেভাবে এক লাখের দুর্ভাগ্যজনক রেকর্ড
প্রথম আক্রান্ত তিনজন : দেশে প্রথম করোনার সংক্রমণ ঘটে ৮ মার্চ। ওইদিন তিনজনের শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়।
সংক্রমণ ১০ হাজার ছাড়ায় : করোনা সংক্রমণের ৫৮তম দিনে ৪ মে আক্রান্ত ১০ হাজার ছাড়ায়। ওইদিন আরও ৬৮৮ জনের শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়। এ নিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ১০ হাজার ১৪৩-এ পৌঁছায়। একই সময়ে মৃত্যুবরণ করেন ১৮২ জন।
সংক্রমণ ২০ হাজার ছাড়ায় : প্রথম ১০ হাজারের ১১ দিনের মাথায় ৬৯তম দিনে ১৫ মে আক্রান্ত ২০ হাজার ছাড়ায়। ওইদিন আরও এক হাজার ২০২ জনের শরীরে করোনার সংক্রমণের মধ্য দিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ২০ হাজার ৬৫-তে পৌঁছায়। এই ১১ দিনে আক্রান্ত হন ৯ হাজার ৯১৯ জন। একই সময়ে মৃত্যুবরণ করেন ১১৬ জন। মোট মৃতের সংখ্যা ২৯৮-তে পৌঁছায়।
সংক্রমণ ৩০ হাজার ছাড়ায় : আক্রান্ত ২০ থেকে ৩০ হাজারে পৌঁছাতে সময় লাগে সাত দিন। সংক্রমণের ৭৬তম দিনে ২২ মে আক্রান্তের সংখ্যা ৩০ হাজার ছাড়ায়। ওইদিন আরও এক হাজার ৬৯৪ জনের শরীরে করোনার সংক্রমণের ফলে আক্রান্তের সংখ্যা ৩০ হাজার ২০৫-তে পৌঁছায়। এই সাত দিনে ১০ হাজার ১১৪ জন আক্রান্ত হন। একই সময়ে মৃত্যুবরণ করেন ১৩৪ জন। মোট মৃতের সংখ্যা ৪৩২-তে পৌঁছায়।
সংক্রমণ ৪০ হাজার ছাড়ায় : আক্রান্ত ৩০ থেকে ৪০ হাজারে পৌঁছাতে সময় লাগে মাত্র ছয় দিন। সংক্রমণের ৮২তম দিনে ২৮ মে আক্রান্তের সংখ্যা ৪০ হাজার ছাড়ায়। ওইদিন আরও দুই হাজার ২৯ জনের শরীরে করোনার সংক্রমণের মধ্য দিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ৪০ হাজার ৩২১-তে পৌঁছায়। এই ছয় দিনে আক্রান্ত হন ১০ হাজার ১১৬ জন। এ সময় মৃত্যুবরণ করেন ১২৭ জন। মোট মৃতের সংখ্যা ৫৫৯-তে পৌঁছায়।
সংক্রমণ অর্ধলাখ ছাড়ায় : আক্রান্ত ৪০ হাজার থেকে অর্ধলাখ ছাড়াতে সময় লাগে মাত্র পাঁচ দিন। সংক্রমণের ৮৭তম দিনে ২ জুন আক্রান্তের সংখ্যা অর্ধলাখ ছাড়ায়। ওইদিন দুই হাজার ৯১১ জনের শরীরে করোনার সংক্রমণের মধ্য দিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ৫২ হাজার ৪৪৫-তে পৌঁছায়। এই পাঁচ দিনে আক্রান্ত হন ১২ হাজার ১২৪ জন। একই সময়ে মৃত্যুবরণ করেন ১৫০ জন। মোট মৃতের সংখ্যা ৭০৯-তে পৌঁছায়।
সংক্রমণ ৫০ হাজার থেকে এক লাখ ছাড়ায় মাত্র ১৬ দিনে : আক্রান্ত ৫০ হাজার থেকে এক লাখ ছাড়াতে সময় লাগে মাত্র ১৬ দিন। সংক্রমণের ১০৩তম দিনে গতকাল বৃহস্পতিবার আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখের ঘর পেরিয়ে যায়। গত চব্বিশ ঘণ্টায় তিন হাজার ৮০৩ জনের শরীরে নতুন করে করোনার সংক্রমণের মধ্য দিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ২ হাজার ২৯২-তে পৌঁছায়। এই ১৬ দিনে আক্রান্ত হন ৪৯ হাজার ৮৪৭ জন। একই সময়ে মৃত্যুবরণ করেন ৬৩৪ জন। মোট মৃতের সংখ্যা এক হাজার ৩৪৩-তে পৌঁছায়।
দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান বিশেষজ্ঞদের : করোনা মোকাবিলায় দ্রুততম সময়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। অন্যথায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে বলে হুঁশিয়ার উচ্চারণ করেছেন তারা। করোনা নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারকে দ্রুততার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সংক্রমণের হার বিবেচনায় দেশকে জোনে ভাগ করে কার্যক্রম গ্রহণের কথা স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও ১৮ দিন আগে জানিয়েছিলেন। কিন্তু তা আজও কার্যকর হয়নি। কবে এই কার্যক্রম শুরু করা হবে, সে সম্পর্কেও কেউ জানেন না। করোনা মোকাবিলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পুরোপুরি ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। এতে এই মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের পদে থাকার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দ্রুততম সময়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।
চিকিৎসকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব সমকালকে বলেন, সংক্রমণ পরিস্থিতি এত খারাপ অবস্থায় চলে যাওয়ার মূল কারণ স্বাস্থ্য বিভাগের অব্যবস্থাপনা। শুরু থেকেই স্বাস্থ্য বিভাগ করোনা নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। এখন এমন একটি অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে যে, একদিকে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, অন্যদিকে তাদের চিকিৎসা প্রাপ্তির সুযোগ সীমিত হয়ে আসছে। স্বাস্থ্য বিভাগ কর্তৃপক্ষ করোনা প্রতিরোধে যেমন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি, তেমনি চিকিৎসার জন্যও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখেনি। এর ফলে একদিকে আক্রান্তের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, অন্যদিকে তাদের চিকিৎসা নিয়েও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হচ্ছে, ঘোষণার ১৮ দিন পরও তারা সংক্রমণের হার অনুযায়ী দেশকে তিনটি জোনে ভাগ করতে পারেনি। সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো প্রত্যেকে দায় এড়িয়ে যাচ্ছে। কারও সঙ্গে কারও কোনো সমন্বয় নেই। এ অবস্থা চলতে থাকলে করোনা প্রতিরোধ করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। পরিস্থিতি আরও খারাপ থেকে খারাপের দিকে যাবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য : করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার সর্বাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সমকালকে বলেন, সারাদেশকে রেড, ইয়েলো ও গ্রিন জোনে ভাগের প্রক্রিয়াটি শেষ পর্যায়ে রয়েছে। বর্তমানে এলাকাগুলোকে চিহ্নিত করার কাজ চলছে। এটি সম্পন্ন হলে দ্রুততম সময়ে কার্যক্রম শুরু করা হবে। ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে পূর্ব রাজাবাজারসহ নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদী জেলার কয়েকটি এলাকায় কার্যক্রম শুরু হয়েছে। দেশের বাকি এলাকাগুলোকে চিহ্নিত করে ধাপে ধাপে এই কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। এই কার্যক্রম শুরু হলে ২১ থেকে ৩০ দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে বলে মনে করেন তিনি।