মন ভরেনি স্কালোনির, সতর্ক ইংল্যান্ডকে নিয়ে
ছবি- এএফপি
সঞ্জয় সাহা পিয়াল, কানসাস সিটি থেকে
প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ | ০৭:১০
ম্যাচ শেষের পর সেই চেনা দৃশ্যই ফিরে এসেছিল– ফুটবলাররা গ্যালারির সামনে গিয়ে জার্সি খুলে চড়া গলায় গান মেলাচ্ছেন ভক্তদের সঙ্গে। একটু পর সোশ্যাল মিডিয়ায় ভেসে এসেছিল ড্রেসিংরুমের ভেতর সেমিফাইনালে ওঠার বন্য উদযাপনের ছবিও। কিন্তু ওই যে, ক্যামেরার ফ্ল্যাশলাইটের তীব্র আলোতেও একটা চোরা অন্ধকারকে ঢাকা গেল না। উৎসবের সেই চড়া আলো-ঝলমলে আবহেও আর্জেন্টিনার এই জয়ে কোথাও মেঘের কোলে সূর্যটা উঁকি দেয়নি। সেমিফাইনালে গেলেও একটা নিরেট, সিসার মতো ভারী মেঘ যেন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। ১০ জনের সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ পর্যন্ত ৩-১ গোলের জয় এসেছে ঠিকই, কিন্তু সেই জয়ে কোনো ঐশ্বর্য ছিল না, কোনো রাজকীয় মহিমা ছিল না; ছিল কেবল একবুক সাদামাটা ফুটবলের ক্লান্তি।
যা নিয়ে আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি চিন্তিত এবং সতর্কও। কেননা, গত বুধবার সেমিতে আটলান্টায় তাদের মুখোমুখি হতে হবে ইউরোপের শক্তিশালী দল ইংল্যান্ডের। মজার ব্যাপার হচ্ছে, নকআউট পর্বে কোনো চমক না দেখিয়ে এবার র্যাঙ্কিংয়ের প্রথম চারটি দল নিয়েই মাঠে গড়াচ্ছে সেমির লড়াই শুরু হতে যাচ্ছে। নরওয়ের হালান্ড-ঝড় স্তব্ধ করে ২-১ গোলের ব্যবধানে সেমিতে পা রেখেছে ইংল্যান্ড। অন্যদিকে, গত মঙ্গলবার ফ্রান্স মোকাবিলা করবে স্পেনের। আর এই সেমির চার দলের মধ্য একমাত্র লাতিন প্রতিনিধি হয়ে ইংলিশ-চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত আর্জেন্টিনা। তবে তার আগে আর্জেন্টিনার মাঝমাঠে গতির ছন্দ ফেরাতে হবে।
এদিন সুইসদের বিপক্ষে মাঝমাঠে ডি পল, এনজো ফার্নান্দেজদের সেই চেনা আলপনা ছিল উধাও; বল পায়ে গতি ছিল না, ছিল না কোনো সৃজনশীলতার ছোঁয়া। মেসি সুইস বক্সের আশপাশে বারবার বল নিয়ে গেলেন ঠিকই, কিন্তু সেখানে ওত পেতে থাকা কোনো জাত ‘শুটার’ বা ফিনিশারের দেখা মেলেনি। সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি তো অন্য জায়গায়– ম্যাচের একটা বড় সময় প্রতিপক্ষ সুইজারল্যান্ড খেলল ১০ জনে। কিন্তু ১০ জনের সেই খাঁচায় বন্দি সুইস দলটাকেও বাগে পেয়ে দাপট দেখাতে পারল কই আর্জেন্টিনা? উল্টো খেই হারিয়ে ছন্নছাড়া দেখাল মেসিদের। জয়েও যে কতটা বিষাদ থাকতে পারে, এই ম্যাচটা তার জ্বলজ্যান্ত দলিল হয়ে রইল।
ম্যাচের পর প্রেস কনফারেন্সে যখন লিওনেল স্কালোনি এলেন, তাঁর চোখেমুখেও কোনো চওড়া হাসির রেখা ছিল না। কোনো রাখঢাক না করেই আর্জেন্টিনার মাস্টারমাইন্ড অকপটে স্বীকার করে নিলেন– এটা কোনো অবস্থাতেই তাদের সেরা খেলা ছিল না। এমন জয়ে তাঁরও মন ভরেনি। নিজেই মনে করিয়ে দিলেন, কাতার বিশ্বকাপে এর চেয়ে ঢের ভালো, ঢের নান্দনিক ফুটবল খেলে দল সেমিফাইনালের মঞ্চে পা রেখেছিল। এই জয় তাদের স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু তৃপ্তি দেয়নি। সামনেই অপেক্ষা করছে ঐতিহ্যবাহী ইংল্যান্ড। সেই মহারণে নামার আগে স্কালোনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, এই ম্যাচের প্রতিটি ভুল, প্রতিটি দুর্বলতা এবার আরও গভীরভাবে ব্যবচ্ছেদ করা হবে। মেঘ কাটানোর সেই জাদুমন্ত্র কি খুঁজে পাবেন মেসিরা? কোচ স্কালোনির কথায় বিশ্বাস রাখলে উত্তর অবশ্যই আছে। ‘আমি আগের দিনেও বলেছি, এবারে আমাদের বিশ্বকাপে দলের হয়ে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ গোল মেসি একাই করে দিচ্ছে। তবে আজ সে গোল না পেলেও বাকিরা কিন্তু পেয়েছে।’ ম্যাক অ্যালিস্টার, হুলিয়ান আলভারেজ আর লাউতারো মার্টিনেজের গোলের প্রশংসা করেও বুদ্ধিমান স্কালোনি এটা বলতে ভোলেননি, এর চেয়ে আগেবার কাতারে তাঁর দল এর চেয়েও ভালো খেলেছিল।
কানসাসের ওই বিবর্ণ রাতে ফুটবল-বিধাতা আর্জেন্টিনার দিকে হাত বাড়িয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু মাঠের নির্দয় পরিসংখ্যান রাজকীয় বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের একেবারে নগ্ন করে দিয়ে গেছে। জেনুইন নম্বর নাইন বা বক্সে ওত পেতে থাকা নিখুঁত ‘শুটার’-এর অভাবটা কর্কট রোগের মতো গ্রাস করেছিল আলবেসেলেস্তেদের। গোটা ম্যাচে আর্জেন্টিনা প্রতিপক্ষের বক্সে বল নিয়ে হানা দিয়েছে ২২ বার, কিন্তু গোলমুখে ফিনিশিংয়ের তীব্র দৈন্যতায় সব প্রচেষ্টা কর্পূরের মতো উড়ে গেছে। পরিসংখ্যানের খাতা খুললে শিউরে উঠতে হয়–সুইজারল্যান্ডের মতো রক্ষণাত্মক দলের বিপক্ষে যেখানে আক্রমণের সুনামি বইয়ে দেওয়ার কথা, সেখানে আর্জেন্টিনার শট অন টার্গেটের সংখ্যা মাত্র সাতটি! সবচেয়ে বড় লজ্জার কথা, ম্যাচের একটা বড় সময় প্রতিপক্ষ সুইজারল্যান্ড ১০ জনের দলে পরিণত হওয়ার পরও মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি মেসির দল। উল্টো ১০ জনের সুইসদের বিপক্ষে মাঝমাঠের গতিহীনতা আর একের পর এক মিসপাসের মহড়ায় খেলাটা মন্থর হয়ে পড়েছিল।
ম্যাচের বল পজিশন ৫৯ শতাংশ কিংবা পাসিং অ্যাকুরেসির গ্রাফটা হয়তো কাগজে-কলমে আর্জেন্টিনার পক্ষে কথা বলবে, কিন্তু মাঠের ভেতরের রসায়ন বলছিল অন্য কথা– যেখানে ছিল না কোনো সৃজনশীল থ্রু-পাস, ছিল না উইং ধরে কোনো গতিময় ওভারল্যাপ। ডান দিকে ডি পলুমেসি আর বাঁ দিক থেকে ম্যাক অ্যালিস্টার আর আলভারেজ, কোনো দিক থেকেও প্রত্যাশিত সাফল্যটা মিলছিল না। এই ছন্দহীন ফুটবল নিয়ে সেমিফাইনালের টিকিট মিললেও, ইংল্যান্ডের মতো ক্ষুরধার শক্তির সামনে যে এই তাসের ঘর ভেঙে পড়তে বাধ্য, তা স্কালোনির চেয়ে ভালো আর কে বোঝে!
‘নকআউট পর্বে কেপ ভার্দের দ্বিতীয় গোল দেওয়া, মিসরের সঙ্গেও প্রত্যাবর্তন করা– সবকিছু শেষ পর্যন্ত জয় দিয়েই শেষ হয়েছে। তবে আমিও মনে করি দুর্বলতা আছে, সেটা কি তা নিয়েই আমরা কোচিং স্টাফরা কাজ করব। আগে আমাদের প্রতিটি ম্যাচ ঠিক গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে।’ তবে স্কালোনি মনে করেন, দেড় মাসের এই লম্বা বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জই হলো ফুটবলারদের ক্লান্তি কাটিয়ে ফিট থাকা। সেটা তাঁর দলে রয়েছে। তবে এদিন কানসাসের সংবাদ সম্মেলনে কিছু অভিজ্ঞ আর্জেন্টাইন সাংবাদিক স্কালোনিকে মনে করিয়ে দিলেন তাঁর রিজার্ভ বেঞ্চে কিন্তু নিকো পাজের মতো তরুণ প্রতিভাবান একজন খেলোয়াড় রয়েছেন, মেঘের কোলো মেঘ সরাতে তাঁর মতো সূর্য্যের দরকার হতে পারে।
- বিষয় :
- বিশ্বকাপ ফুটবল
- আর্জেন্টিনা
- লিওনেল স্কালোনি