ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

এমবোলোর লাল কার্ড: ফুটবলে ‘মিসটেকেন আইডেন্টিটি’ কী

এমবোলোর লাল কার্ড: ফুটবলে ‘মিসটেকেন আইডেন্টিটি’ কী
×

ছবি: ইয়াহু স্পোর্টস

স্পোর্টস ডেস্ক 

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬ | ২২:৫৯

ফুটবল মাঠে রেফারির ভুল সিদ্ধান্তের ঘটনা নতুন নয়। ভুল অফসাইড বা ভুল পেনালটি নিয়ে প্রায়ই মাঠ উত্তপ্ত হতে দেখা যায়। এক খেলোয়াড়কে শাস্তি দিতে গিয়ে ভুলবশত অন্য খেলোয়াড়কে কার্ড দেখানোর ঘটনাও ঘটে। ঠিক এমনই একটি ঘটনা ঘটেছে এবারের বিশ্বকাপে, আর্জেন্টিনা-সুইজারল্যান্ড কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে। এক্ষেত্রে ফিফার নতুন একটি নিয়মের প্রয়োগ ঘটেছে, যার নাম ‘মিসটেকেন আইডেন্টিটি’।

আর্জেন্টিনা-সুইজারল্যান্ড ম্যাচটি তখন ১-১ গোলে সমতায়। মাঠের উত্তেজনা তুঙ্গে। এমন সময় একটি ফাউলকে কেন্দ্র করে মাঠে বিতর্ক তৈরি হয়। আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার লিয়েন্দ্রো পারেদেস সুইজারল্যান্ডের ব্রিল এমবোলোকে ফাউল করেছেন- এমনটি ভেবে অন-ফিল্ড রেফারি পারেদেসকে হলুদ কার্ড দেখান। কিন্তু ভিএআর তখন রেফারিকে অন-ফিল্ড রিভিউয়ের জন্য ডাকে। ভিএআর মনিটরে দেখা যায়, পারেদেস আসলে এমবোলোকে ফাউল করেননি, বরং এমবোলো নিজেই ডাইভ দেওয়ার অভিনয় করেছেন।যেহেতু রেফারি এরইমধ্যে পারেদেসকে হলুদ কার্ড দেখিয়ে ফেলেছেন, তাই এখানে ‘মিসটেকেন আইডেন্টিটি’ নিয়ম প্রয়োগ করেন রেফারি। পারেদেসের হলুদ কার্ড বাতিল করে প্রকৃত অপরাধী হিসেবে ব্রিল এমবোলোকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড (যা লাল কার্ডে পরিণত হয়) দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেন।

সুইজারল্যান্ডের প্রধান কোচ মুরাত ইয়াকিন পরে পর্তুগালের অভিজ্ঞ রেফারি জোয়াও পিনহেইরোর এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেন। ম্যাচ শেষে ক্ষুব্ধ ইয়াকিন বলেন, ‘পারেদেসকে ওই হলুদ কার্ড দেওয়ার কোনো কারণই ছিল না। সেটি অত্যন্ত সাধারণ একটি পরিস্থিতি ছিল। বুঝতে পারছি না কেন এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো যার খেসারত হিসেবে আমাদের খেলোয়াড়কে মাঠ ছাড়তে হলো।’

অন্যদিকে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি রেফারিং বিতর্ক এড়িয়ে মাঠের লড়াইকে বড় করে দেখিয়েছেন। স্কালোনি স্বীকার করেন, সুইজারল্যান্ডের ফিজিক্যাল গেমের বিপক্ষে তাদের বেশ বেগ পেতে হয়েছে।

‘মিসটেকেন আইডেন্টিটি’ আসলে কী
আন্তর্জাতিক ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ডের (আইএফএবি) অফিশিয়াল নিয়মের ‘ল ১২’ (ফাউল অ্যান্ড মিসকনডাক্ট) এবং ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) প্রটোকল অনুযায়ী, খেলার মাঠে কোনো ফাউল বা শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনায় রেফারি যদি প্রকৃত অপরাধীকে কার্ড না দিয়ে, চেহারার মিল বা বিভ্রান্তির কারণে নির্দোষ অন্য খেলোয়াড়কে হলুদ বা লাল কার্ড দেখান, তবে তাকে ‘মিসটেকেন আইডেন্টিটি’ বলা হয়। আধুনিক ফুটবলে যে ৪টি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে অন-ফিল্ড রেফারিকে সাহায্য করার জন্য ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারিকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে এটি একটি।

ফিফার ডিসিপ্লিনারি কোড ও ফুটবল ম্যাচের চালিকাশক্তি আইএফএবি ‘লজ অব দ্য গেম’-এর ভিএআর প্রটোকল- উভয় জায়গাতেই ‘মিসটেকেন আইডেন্টিটি’র সুনির্দিষ্ট ধারা রয়েছে।

ফিফা ডিসিপ্লিনারি কোডের অধ্যায়-২ এর ধারা ৫৮-এ বলা হয়েছে, যদি রেফারি ভুল করে কোনো ব্যক্তিকে শাস্তি দেন, তবে শৃঙ্খলামূলক শাস্তি বা নিষেধাজ্ঞা কেবল সেই ব্যক্তির ওপরই কার্যকর হবে যিনি প্রকৃতপক্ষে অপরাধটি করেছেন। শৃঙ্খলা কমিটি ভুলটি সংশোধন এবং শাস্তি প্রকৃত অপরাধী ব্যক্তির ওপর অর্পণ করবে। 

আবার মাঠে খেলা চলাকালীন রেফারি ভুল করলে ভিএআর কোন নিয়মে হস্তক্ষেপ করবে, তা বলা হয়েছে IFAB Laws of the Game (Reviewable Matches/Decisions)-এর প্রটোকলে। এখানে স্পষ্ট ৪টি ক্যাটাগরির (গোল, পেনালটি, সরাসরি লাল কার্ড) মধ্যে ৪ নম্বর ক্যাটাগরি হলো-মিসটেকেন আইডেন্টিটি। এতে বলা হয়েছে, যদি রেফারি ভুল খেলোয়াড়কে সতর্ক (হলুদ কার্ড) বা মাঠ থেকে বহিষ্কার (লাল কার্ড) করেন, অথবা কোন খেলোয়াড়কে শাস্তি দেওয়া উচিত- তা নিয়ে নিশ্চিত না থাকেন, তবে ভিএআর রেফারিকে ঘটনাটি পুনর্নিরীক্ষণ (রিভিউ) করার পরামর্শ দিতে পারে, যাতে সঠিক খেলোয়াড়কে শাস্তি দেওয়া নিশ্চিত করা যায়।

ফুটবলে ‘মিসটেকেন আইডেন্টিটি’র মূল ধারণাটি ফিফার ডিসিপ্লিনারি কোডে অন্তর্ভুক্ত হয় ২০০২ সালে। তবে আর্জেন্টিনা-সুইজারল্যান্ড ম্যাচে যে নিয়মের প্রয়োগ হয়, সেটি ফিফা ও ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড গত মে মাসে অনুমোদন করে। 

ইতিহাস যা বলে
ফুটবল ইতিহাসে ‘মিসটেকেন আইডেন্টিটি’র বেশ কিছু উদাহরণ রয়েছে। ভিএআর প্রযুক্তি না থাকায় আগে চরম অন্যায়ের শিকার হয়েছেন অনেক খেলোয়াড়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’ বলছে, ২০১৪ সালে চেলসি বনাম আর্সেনাল ম্যাচে চেলসির খেলোয়াড়ের একটি শট আর্সেনালের মিডফিল্ডার অ্যালেক্স অক্সলেড-চেম্বারলেইন গোললাইন থেকে হাত দিয়ে প্রতিহত করেন (যা লাল কার্ডের অপরাধ)। কিন্তু রেফারি আন্দ্রে মারিনার বিভ্রান্ত হয়ে চেম্বারলেইনকে ছেড়ে তার সতীর্থ ডিফেন্ডার কাইরেন গিবসকে লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেন! চেম্বারলেইন তখন এগিয়ে গিয়ে রেফারিকে বলেন, ‘ফাউলটি আমি করেছি।’ কিন্তু রেফারি নিজের সিদ্ধান্ত বদলাননি।

ইএসপিএন জানায়, ঠিক এক বছর পর আবারও কাইরেন গিবস এই নিয়মের চক্করে পড়েন। ডায়নামো জাগরেবের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ম্যাচে আর্সেনালের ডিফেন্ডার গ্যাব্রিয়েল পলিস্তা একটি ফাউল করেন, কিন্তু রেফারি ভুল করে গিবসকে হলুদ কার্ড দেখান। এমন প্রেক্ষপটেই এসেছে ফিফার নতুন নিয়ম ‘মিসটেকেন আইডেন্টিটি’।

আরও পড়ুন

×