মেসির প্রথম ইংলিশ-পরীক্ষা
সঞ্জয় সাহা পিয়াল, কানসাস সিটি থেকে
প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪১
কানসাসে সুইসদের বিপক্ষে স্বস্তির জয়ের পর ভিভিআইপি গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আলোকচিত্রী আর সাংবাদিক অনেকেই ক্যামেরার লেন্স গুটিয়ে উঠতে পারেননি, ঠিক তখনই শত মানুষের হুড়োহুড়ির মধ্যেও মেসি-পত্নী আন্তোনেলা রোকুজ্জোকে চিনে নিতে ভুল করলেন না কেউ। গ্যালারি থেকে নেমে আসা বেশ কিছু আর্জেন্টাইন সমর্থক পরম আবেগে চিৎকার করে তাঁর নাম ধরে ডাকতেই তিনি চিরসুলভ মধুর হেসে হাত নাড়িয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন। পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন আর্জেন্টাইন তখন নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করছিলেন, ‘আমেরিকায় এসে আন্তোনেলা কিন্তু ইংরেজিটা চমৎকার রপ্ত করে নিয়েছেন! ছেলেদের স্কুলের হোমওয়ার্ক থেকে শুরু করে মায়ামির যাপিত জীবনের দৈনন্দিন রুটিন– সবকিছুই তিনি দারুণ মানিয়ে নিয়েছেন এই ভাষার সঙ্গে।’ কিন্তু ঠিক তার উল্টো পিঠেই লুকিয়ে রয়েছে আলবিসেলেস্তে শিবিরের এক চিরন্তন ট্র্যাজেডি– লিওনেল মেসি!
ফুটবল মাঠে যাঁর পায়ের জাদুতে মুগ্ধ গোটা বিশ্ব, ভাষার ব্যাকরণে তিনি যেন এখনও সেই লাজুক কিশোর। ইংরেজি আতঙ্ক তাঁর পিছু ছাড়ে না। ক্যামেরার সামনে স্প্যানিশ ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় প্রশ্ন করা হলেও উত্তর দিতে চান না, একবুক আড়ষ্টতা এসে ভর করে তাঁর চওড়া কাঁধে। কিন্তু ফুটবল-বিধাতা বুঝি এবার এক পরম কৌতুক সাজিয়ে রেখেছেন। সেমিফাইনালের মহারণে মেসির সামনে এবার দাঁড়িয়ে ইংল্যান্ড! এই প্রথমবারের মতো তিনি এই দলটির মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। মাঠের ভেতরে হ্যারি কেইন কিংবা জুড বেলিংহামদের চাণক্যনীতির মুখোমুখি হওয়ার আগে মাঠের বাইরে এই ‘ইংরেজি’র মনস্তাত্ত্বিক চাপ এড়ানোর আর কোনো উপায় নেই এলএমটেনের। এবার যে তাঁকে ইংলিশ পরীক্ষায় বসতেই হচ্ছে।
নিজের সুদীর্ঘ ও মহাকাব্যিক ক্যারিয়ারে ২০০-এর বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার এক অবিশ্বাস্য মাইলফলক ছোঁয়া শেষ। নামের পাশে জ্বলজ্বল করছে ৯১০টির বেশি রাজকীয় গোল আর শোকেসে জমা পড়েছে বিশ্বরেকর্ড গড়া আটটি ব্যালন ডি’অর! অথচ ফুটবল-বিধাতার কী বিচিত্র লীলাখেলা, বিশ্বফুটবলের প্রায় সব দুর্গ একাই চূর্ণ করে দেওয়া এই জাদুকর তাঁর গোটা জীবনে একবারের জন্যও মুখোমুখি হননি ফুটবলের ইংল্যান্ডের! যিনি কিনা এ পর্যন্ত ৬০টির বেশি দেশের বিপক্ষে খেলতে নেমেছেন, ৪১টি ভিন্ন দেশের বিপক্ষে গোল করেছেন।
অথচ সেই তালিকার কোথাও নেই ইংল্যান্ড। অতীতে একবারই কেবল সেই সুযোগ উঁকি দিয়েছিল ফুটবল-ক্যানভাসে। ২০০৫ সালের নভেম্বর মাসে, জেনেভায় আয়োজিত এক প্রীতি ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। কিন্তু হায়, তার ঠিক তিন মাস আগে হাঙ্গেরির বিপক্ষে আন্তর্জাতিক অভিষেকে নেমে মাত্র ৪৭ সেকেন্ডের মাথায় লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল এক ১৮ বছরের লাজুক কিশোরকে। সেই অনভিপ্রেত লাল কার্ডের শাস্তিস্বরূপ নির্বাসনে থাকায় সেদিনের সেই বহুল আলোচিত মহারণ গ্যালারিতে বসেই দেখতে হয়েছিল লিওনেল মেসিকে। এর পর দুই দশকের বেশি সময় কেটে গেছে; বিশ্বকাপ কিংবা প্রীতি ম্যাচ– কোনো মঞ্চেই আর ভাগ্যদেবতা এ দুই পরাশক্তিকে মুখোমুখি দাঁড় করাননি। অবশেষে ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে এসে, ২০২৬ বিশ্বকাপের এই তপ্ত সেমিফাইনালে মেসি নামের সেই অমীমাংসিত মহাকাব্যের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে থ্রি লায়ন্স বা ইংল্যান্ড! দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সেই ‘ইংলিশ পরীক্ষা’র আঙিনায় পা রাখার আগে ফুটবল-রোমান্টিকরা এখন রোমাঞ্চিত– মেসি কি পারবেন তাঁর মায়াবী বাঁ পায়ের জাদুতে ব্রিটিশ প্রাচীর ভেঙে ফাইনালে ওঠার নতুন রূপকথা লিখতে, নাকি প্রথম পরীক্ষার জটিল গণ্ডিতেই আটকে যাবে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের জয়রথ।
ম্যাচটি ঘিরে এরই মধ্যে উত্তেজিত আর্জেন্টিনা মিডিয়া। এদিন সংবাদ সম্মেলনে আসা কোচ স্কালোনিকে বুয়েন্স আয়ার্সের এক সাংবাদিক তাতিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন ‘ফকল্যান্ড’ যুদ্বের কথা বলে। স্কালোনি উল্টো সেই সাংবাদিককে থামিয়ে দিয়ে পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, ‘খেলার মধ্যে থাকুন, আমরাও সেভাবেই থাকছি। ইংল্যান্ড শক্তিশালী দল, তাদের কোচ থমাস টুখেল বুদ্ধিমান মানুষ। আমরা তাদের মোকাবিলার করার জন্য প্রস্তুতি নেব।’ ইংলিশদের নিয়ে অযথা বাড়াবাড়ি করতে বারণ করে দিয়েছেন তিনি স্বদেশি সাংবাদিকদের। মেসিও বুঝি তাই, তাঁকে নিয়ে ইংলিশ মিডিয়া তো কম সমালোচনা করেনি। স্পেনের বার্সেলোনা ছাড়ার পর গার্দিওয়ালা তাঁকে ম্যানসিটিতে নিতে চেয়েছিলেন। মেসি সেই ডাকে সাড়া না দিয়ে প্যারিস চলে যাওয়ার পর তাঁর ‘ইংলিশ-ভীতি’র কথা নিয়ে অনেক মুখরোচক কথা ছড়িয়েছে। তবে মেসি নিজে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ভাঙা ভাঙা ইংরেজি বলার চেয়ে তিনি মাতৃভাষায় মনের কথা বলতেই বেশি স্বাছন্দ্যবোধ করেন।
ক্যারিয়ারে কোনো ইংলিশ ক্লাবের হয়ে না খেলেও কেবল ইউরোপের সেরাদের মঞ্চে ইংল্যান্ডের ‘বিগ সিক্স’ ক্লাবের বিপক্ষে ৩৬ ম্যাচে তিনি করেছেন রেকর্ড সর্বোচ্চ ২৭টি গোল! আর্সেনালের জাল একাই ৯ বার ছিঁড়েছেন, ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে করেছেন সাত গোল। এমনকি স্বয়ং ইংল্যান্ডের মাটিতে গিয়েও যে তিনি সমান ভয়ংকর, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ২০০৯ আর ২০১১ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল। রোম ও লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের রক্ষণভাগকে একাই ধ্বংস করে স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের বিশ্বজয়ের স্বপ্ন ভেস্তে দিয়েছিলেন এই মেসিই। অ্যানফিল্ড, ওল্ড ট্র্যাফোর্ড কিংবা ইতিহাদের মতো ইংলিশ ফুটবলের সবচেয়ে কঠিন দুর্গগুলোতে গিয়ে বছরের পর বছর রাজত্ব করে তিনি প্রমাণ করেছেন, ‘ইংলিশ-ভীতি’র গল্পটা আসলে শুধুই তাঁর সমালোচকদের এক প্রকার ঈর্ষাকাতর। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে জালের দেখা না পেলেও আট গোল নিয়ে এমবাপ্পের সঙ্গে তিনিই আছেন শীর্ষে। এখানকার মিডিয়া ট্রিবিউনের আর্জেন্টাইনরা বলাবলি করে– ইংল্যান্ডের বিপক্ষেই জমে থাকা আগুন জ্বলাবেন মেসি। যদি তাই হয়, তাহলে জীবনের ‘প্রথম ইংলিশ’ পরীক্ষায় নিশ্চিত এ প্লাস মেসি।
- বিষয় :
- লিওনেল মেসি
- আর্জেন্টিনা
- ইংল্যান্ড