ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

বাবা দিবস উদযাপন

সামাজিক মাধ্যমে হারানোর বেদনা

সামাজিক মাধ্যমে হারানোর বেদনা
×

সাব্বির নেওয়াজ

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২১ জুন ২০২০ | ১৪:৫৯

গৃহিণী মাহিন চৌধুরীর বাবা মাহবুব উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন আগরতলা মামলার ৩০ নম্বর অভিযুক্ত আসামি। বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠা বাবাকে নিয়ে মাহিনের তাই বুকভরা গর্ব। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান মাহিন চৌধুরী ছোটবেলায় মাকে হারান। বাবাই ছিলেন একই সঙ্গে তার মা ও পিতা।

২০১৩ সালের ২২ জানুয়ারি রাজধানীর শ্যামলীতে বাসের নিচে পড়ে নির্মমভাবে প্রাণ হারান মাহবুব উদ্দিন চৌধুরী। শোকে পাথর হয়ে পড়েন মাহিন। গেল সাত বছর ধরে বাবা দিবস এলেই বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে ওঠে মাহিনের। নীরব অশ্রু নিয়ে বাবার স্মৃতি খুঁজে ফেরেন।

রোববার বিশ্ব বাবা দিবসে মাহিন চৌধুরীর মতো পিতৃহীন সন্তানরা সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন নিজেদের হাহাকার। শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিচারণ করেছেন। যাদের বাবা বেঁচে আছেন তারাও শুভেচ্ছায় সিক্ত করেছেন বাবাকে। তার জন্য দোয়া চেয়েছেন সবার কাছে। জনকের আত্মত্যাগ, কর্মনিষ্ঠা আর সন্তানের প্রতি তাদের এক সমুদ্র ভালোবাসার কথা উঠে এসেছে ফেসবুকের পাতায় পাতায়। লাখো লাখো ফেসবুক ব্যবহারকারী শেয়ার করেছেন বাবার সঙ্গে তোলা ছবি।

প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয় রোববার পৃথিবীজুড়ে 'বিশ্ব বাবা দিবস' উদযাপন করা হয়। সে হিসেবে এ বছর দিবসটি পালিত হয়েছে গতকাল রোববার। এ বছর দুনিয়াজুড়ে মহামারি আকারে দেখা দিয়েছে কভিড-১৯ নামের করোনাভাইরাস। যে কারণে অনেক সন্তান হারিয়েছেন প্রিয় জন্মদাতাকে। পৃথিবীর সব বাবাই এখন আপ্রাণ লড়ছেন সন্তান ও পরিবারকে এর কবল থেকে রক্ষা করতে। করোনার কারণে দিবসটির কোনো আনুষ্ঠানিকতা না থাকায় সামাজিক মাধ্যমই হয়ে উঠেছিল সবার আবেগ বহিঃপ্রকাশের ক্ষেত্র।

পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের উপসচিব ফারহান হক নীলা ফেসবুকে লিখেছেন, 'বাবা-মায়ের জন্য আলাদা কোনো দিবস নাই। আমার কাছে প্রতিদিনই বাবা ও মা দিবস। আমার এমন কোনো দিন নাই যেদিন বাবার কথা মনে হয় না। রাব্বুল আলামিন আমার বাবাকে বেহেশত নসিব করুন।'

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোমেনুর রসুল তার বাবার ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে লিখেছেন, '৮২ বছর বয়স্ক আব্বা এখন পর্যন্ত সুস্থ; স্বাভাবিক নিয়মানুযায়ী চলাফেরা করতে পারেন। আম্মাবিহীন ছয় বছর একাই আছেন, আমাদের মাঝে। আমাদের পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য তিনি। দোয়া করি উনি এ রকমই থাকুন।'

'সীমন্তিনী'র স্বত্বাধিকারী শাহীন আক্তার কণা লিখেছেন, 'আমি প্রচণ্ড ভিতু টাইপের। রাতের অন্ধকার ভয় পাই। কোচিং থেকে ফেরার সময় অথবা ক্যাম্পাস থেকে ফিরতে রাত হলে রাস্তার কবরস্থানের দিকে তাকাতাম না, চোখ বন্ধ করে থাকতাম। কিন্তু যেদিন থেকে আব্বা সেখানকার বাসিন্দা হলো, আমি আর ভয় পাই না। তাকিয়ে থাকি। মনে হয় এখানে থাকে সেই মানুষ, যে আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসত। বাবা ছাড়া আছি ২০০২ থেকে। এখনও মনে হলে কষ্ট হয়। বাবাদের প্রিন্সেসদের অনেক কষ্ট হয় তাদেরকে ছাড়া!'

উত্তরার মা'হাদ স্কুলের ভাইস প্রিন্সিপাল নূরজাহান শামস্‌ লিখেছেন, 'ছোটবেলা থেকেই যতবার অসুখ করেছে, আমি কেবল দেখেছি একটাই দৃশ্য ... যতক্ষণ সজাগ ছিলাম বাবাকে মাথার পাশে চেয়ার নিয়ে বসে থাকতে। গভীর রাতে ঘুম ভেঙে নড়েচড়ে উঠলেও দেখতাম পিতা মাথার পাশে দাঁড়িয়ে। জানতে চাইতেন- 'বাবা কিছু লাগবে?' এখনও আমার সামান্য অসুখে আমি কেবল বাবাকেই খুঁজে বেড়াই। সারাজীবন 'বাবা' ডাক যেন ডেকে যেতে পারি ... '।

পটুয়াখালীর গণমাধ্যমকর্মী মুফতি সালাহউদ্দিন লিখেছেন, 'বাবা নেই। ১৪ বছর আগে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। রেখে গেছেন ভালোবাসা, আদর্শ, স্মৃতি ও অনুপ্রেরণা।' চিত্রশিল্পী বড়ূয়া বনশ্রী ফেসবুকে লিখেছেন, 'বাবাকে হারিয়েছি বিশ বছর হয়ে গেল। কিন্তু প্রতিটি মুহূর্তে বাবার ছায়া মাথার ওপর পেয়েছি। পেয়েছি নির্ভরতা, আশ্রয়।'

বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রোকসানা মনি বাবাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন, 'ছেলেবেলায় ছোটখাটো এক অপরাধে বাবা রেগে ধমক দিয়ে ধাওয়া করলেন। তার ভয়ে এক দৌড়ে খাটের নিচে লুকিয়েছি। আমার ভয় দেখে আব্বার রাগ কমে গেল তিনি হাসতে শুরু করলেন। খাটের নিচ থেকে বের হয়ে এলে আব্বা কোলে নিয়ে আদর করে বললেন, এত দৌড়াতে পারিস তুই! হ্যাঁ আব্বা, সেই যে ভয়ে দৌড় শুরু করেছিলাম। তারপর আরও কত ভয়ে যে দৌড়েছি বা এখনও দৌড়াতে হয় তার হিসাব কে রাখে!'

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক নাদিয়া নন্দিতা ইসলাম তার ফেসবুকে পোস্টে কিছুই লেখেননি। বাবা সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এমপির সঙ্গে নিজের ছবি পোস্ট করে কেবল ভালোবাসার চিহ্ন এঁকে দিয়েছেন। আবার, মুক্তিযোদ্ধা বাবাকে নিয়ে গর্ব করে পোস্ট দিয়েছেন বহু মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। বগুড়ার ধুনট উপজেলার বেলাকুচি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ফৌজিয়া হক বীথি তার মুক্তিযোদ্ধা বাবা মোজাম্মেল হকের ছবি পোস্ট করে লিখেছেন- 'এই আত্মভোলা সহজ সরল সৎ মানুষটিই আমার বাবা। ... যুদ্ধ শেষে যোগদান করেন ধুনট এনইউ পাইলট হাইস্কুলে মানুষ গড়ার পেশায়। জীবনে কখনও নিজের সংসার, সন্তান তাকে টানেনি, সবসময় চিন্তা করেছেন তার ছাত্রদের নিয়ে।'

সাংবাদিক নেতা আবু জাফর সূর্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোস্টে লিখেছেন, 'যার হাতের আঙুল ধরে হাঁটতে পারিনি। কোনোদিন কোনো আবদার, অনুযোগ করার সুযোগ হয়নি। আমার জন্মের অল্প কিছু দিনের মধ্যেই অসুস্থ হন। দেড় বছরের মধ্যে বাবাকে হারিয়ে এতিম হয়ে যাই আমি। বাবার কোনো ছবিও নেই।...বাবা ছাড়া এতটা পথ চলতে চলতে যখন হতাশ হই বা ক্লান্ত হয়ে পড়ি, তখন মনে হয় যদি পেছন থেকে পিঠে হাত রেখে বলতেন, কেমন আছিস? সাহস রাখ, সাথেই আছি...!'

এক্সিম ব্যাংকের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স ও ব্র্যান্ডিং ডিভিশনের কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম হান্নান ২০০৯ সালে বিডিআর হত্যাকাণ্ডে হারানো বাবা সুবেদার মেজর নুরুল ইসলামের ছবি আপলোড করে শুধু লিখেছেন, 'বাবা দিবসে বাবার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা...অফুরন্ত ভালোবাসা। আল্লাহ সকল বাবাকে ভালো রাখুক।'

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক শাহনাজ সিদ্দিকী ফেসবুকে স্মৃতিচারণ করেছেন, 'মেয়েকে পরের বাড়ি পাঠালে থাকবা কেমনে?'- আমার প্রতি বাবার অন্ধ ভালোবাসা ও আদর-স্নেহ দেখে মা এ কথা বললে বাবা মুখভরা হাসি দিয়ে সাফ জানিয়ে দিতেন, 'প্রয়োজনে শোকেস বানিয়ে মেয়েকে সাজিয়ে রাখব, তবুও মেয়ে না চাইলে তাকে আমি পরের বাড়ি পাঠাচ্ছি না।'...বাবার উত্তর শুনে আমার ভরসা একগুণ থেকে বেড়ে তিনগুণ হতো। ভালোবাসি, বাবা।'

মিরপুর শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজের বাংলা বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান জান্নাতুন নাহার সুমি আবেগঘন ভাষায় ফেসবুকে লিখেছেন, 'বাবা মানে বটবৃক্ষের ছায়া, পরম নির্ভরতার স্বপ্নছবি।'

আরও পড়ুন

×