ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

আবারও কি চাকরি ফিরে পাবেন সেই আতাহার

আবারও কি চাকরি ফিরে পাবেন সেই আতাহার
×

আতাহার আলী খান

অমিতোষ পাল

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২০ | ১২:০০

একই দিনে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা দিয়ে ওই দিনই ফল পেয়ে নিয়োগপত্র নিয়ে মাত্র চার ঘণ্টায় সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। অথচ তার শিক্ষা সনদ নিয়েই ছিল স্বচ্ছতার প্রশ্ন। সেই সৌভাগ্যবান চাকরি পাওয়ার পর পেয়েছিলেন আলাদিনের চেরাগ। কয়েক বছরের মধ্যেই ফুলেফেঁপে উঠেছিলেন। কোটি টাকা দামের ফ্ল্যাট, গাড়ি, মার্কেটে মার্কেটে দোকান হয়েছিল তার। নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে একসময় তাকে চাকরি থেকেও বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু বরখাস্তকারী প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতার কারণে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে আবারও তিনি চাকরি ফিরে পান। চাকরিচ্যুত সময়কালের সব পাওনাদিও বুঝে পান। আর এই কর্মকর্তা হলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) কর কর্মকর্তা ও বিএনপির প্রয়াত মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূঁইয়ার সাবেক এপিএস আতাহার আলী খান। গত ২০ মে ডিএসসিসি মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেন। এবারও তিনি চাকরি ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছেন। অথচ তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে মামলা চলমান।
নেপথ্য কাহিনী :২০০৪ সালের ১৩ জানুয়ারি অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনে (ডিসিসি) বিভিন্ন পদে ৪৯ জনকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য দিনকাল পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। এর পৌনে তিন বছর পর ২০০৬ সালের ১৮ অক্টোবর অত্যন্ত চুপিসারে পছন্দনীয় ৪৭ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। ওই দিনই তাদের সব ধরনের পরীক্ষার নথি বানিয়ে ওই দিনই তাদের চাকরিতে যোগদান করানো হয়। মাত্র চার ঘণ্টার মধ্যেই সব ধরনের পরীক্ষা গ্রহণ, ফল প্রকাশ, বাছাই কমিটির মিটিং, কার্যবিবরণী প্রস্তুত, নিয়োগপত্র প্রদান ও কর্মস্থলে যোগদানের ঘটনা ঘটে। তখন অভিযোগ ওঠে, একজন মন্ত্রীর এপিএস ও চারজন বিএনপি নেতার ছেলেকে নিয়োগ দিতে এই কা ঘটানো হয়। তৎকালীন এলজিআরডি মন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূঁইয়ার এপিএস ও তার নির্বাচনী এলাকা শিবপুরের বাসিন্দা সম্প্রতি অব্যাহতিপ্রাপ্ত আতাহার আলী খান কর কর্মকর্তা হিসেবে তখন নিয়োগ পান। ওই সময় একই পদে আরও নিয়োগ পান তৎকালীন ডিসিসির ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার ও মহানগর বিএনপি নেতা এটিএম মোস্তফা বাদশার ছেলে মো. শামী ফয়সাল, সূত্রাপুর ওয়ার্ড বিএনপি নেতা ও ডিসিসির সাবেক ডেপুটি মেয়র সামসুজ্জামান মিন্টুর ছেলে এএসএম হাসানুজ্জামান, সূত্রাপুর থানা বিএনপির নেতা ও বাংলাদেশ সিটি ও পৌর কর্মচারী ফেডারেশনের সভাপতি মো. আমান উল্লাহর ছেলে খালেদ সাইফুল্লাহ ও মহানগর বিএনপি নেতা মজিবর রহমানের ছেলে মিজানুর রহমান। এর মধ্যে মিজানুর রহমান ছাড়া আর সবাই চাকরিচ্যুত। মিজানুর রহমান ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে কর কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত।
কাউকে পরোয়া করতেন না আতাহার :চাকরি পাওয়ার পর কাউকে পরোয়া করতেন না আতাহার। কর কর্মকর্তা হলেও পুরো রাজস্ব শাখার ওপর ছিল তার নিয়ন্ত্রণ। একসময় মান্নান ভূঁইয়ার এপিএস থাকা ও বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সুবাদে সবাই তাকে সমীহ করতেন। তৎকালীন মেয়র প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকারও স্নেহ পেতেন আতাহার। ফলে সব মিলিয়ে খুব স্বল্প সময়ের ব্যবধানেই আতাহারের হয়ে যায় সেগুনবাগিচায় দুর্নীতি দমন কমিশনের পূর্বপাশে কোটি টাকা দামের ফ্ল্যাট, ব্যক্তিগত গাড়ি, কাপ্তানবাজারে ১৫টি দোকান, চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটে চারটি দোকানসহ আরও বিভিন্ন মার্কেটে দোকান। সব মিলিয়ে ৪০টি দোকান হয়ে যায় তার। ওইসব দোকানের একেকটির বর্তমান মূল্য প্রায় অর্ধ কোটি টাকা। এর মধ্যে চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটের ৩৮, ৪১ ও ৪৪ নম্বর দোকান তিনটি তার নিজ নামে। আর ৪৪ নম্বর দোকানের ট্রেড লাইসেন্সও তার নিজ নামে, সিটি করপোরেশনের চাকরিবিধি অনুযায়ী যা কোনোভাবেই সম্ভব না। এ ছাড়া দোকান বরাদ্দ দিয়ে কমিশন আদায়সহ নানা অনিয়ম করে দ্রুতই ফুলে ওঠেন আতাহার আলী খান। কর কর্মকর্তা হিসেবে যেসব মার্কেটে দোকান বরাদ্দ হয়েছে, তার সব মার্কেটেই আতাহারের এক বা একাধিক দোকান রয়েছে।
যেভাবে প্রথমবারের চাকরিচ্যুতি :ওয়ান ইলেভেনের পর দুর্নীতি রোধে গঠিত টাস্কফোর্স দেখতে পায়, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে কর কর্মকর্তা হিসেবে তিনজনকে নিয়োগ দেওয়ার কথা ছিল। দেওয়া হয় পাঁচজনকে। রেজিস্ট্রার খাতায় তাদের নিয়োগ পাওয়ার দিন ১৮ অক্টোবর ও পরদিন ১৯ অক্টোবরের পৃষ্ঠায় কোনো ফাঁকা জায়গা না থাকায় আরেকটি নতুন রেজিস্ট্রার খোলা হয়। অথচ মূল রেজিস্ট্রারে ধারাবাহিক স্মারক নম্বর ও অসংখ্য ফাঁকা পৃষ্ঠা ছিল। বছরের শুরুতে বা রেজিস্ট্রার খাতা চালুর নিয়ম থাকলেও ওই সময় অনিয়ম ঢাকতে নতুন রেজিস্ট্রার খোলা হয়। ওই খাতার প্রচ্ছদে লেখা হয়, 'টিও পদে নিয়োগপত্র বিলি ও পাঁচজন টিওর স্বাক্ষর (রিসিভ) করা বিষয়ে নতুন রেজিস্ট্রার/কর কর্মকর্তা নিয়োগের রেজিস্ট্রার/নিয়োগ আদেশ রেজিঃ বহি তাং ১৮/১০/২০০৬।'
ওই দিন নিয়োগ পাওয়া সবার যোগদানপত্রের ভাষা ও টাইপ হুবহু একই রকম, যা অস্বাভাবিক। এ ছাড়া দু'জনের চাকরির পে-অর্ডারে ঘষামাজা করে জালিয়াতি করা, একজনের সনদ জাল হওয়ার কাহিনী ধরা পড়ে। আর আতাহার আলী খানের স্নাতক সনদ নিয়ে সন্দেহ দেখা দেয়। পরে তাকে সনদ জমা দিতে বললে যে সনদ দেন, স্নাতকের সেই সনদ ও আগের সনদের পাসের সাল দুই জায়গা দুই রকম ধরা পড়ে। এসব নানা অসঙ্গগতির তথ্য দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছে হস্তান্তর করে টাস্কফোর্স। এ ঘটনায় দুদক ২৯ জুন ২০১০ সালে শাহবাগ থানায় সাদেক হোসেন খোকা, আতাহার আলী খানসহ ১৩ জনকে আসামি করে একটি মামলা করে। ২০১২ সালে ডিসিসিকে উত্তর ও দক্ষিণে দুই ভাগ করে পৃথক দুটি সিটি করপোরেশন গঠন করা হলে আতাহার আলী খান ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে থেকে যান। ২০১৩ সালে সরকারের অতিরিক্ত সচিব খলিলুর রহমান প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আতাহারকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেন।
অভিযোগ ওঠে, বরখাস্ত হওয়ার আঁচ আগে থেকেই টের পাওয়ায় আতাহার তার অনিয়ম সংক্রান্ত সব ফাইল গায়েব করে দেন। করপোরেশন ও সংসদীয় কমিটি বারবার ফাইল ফেরত চাইলেও তিনি তা দেননি। আতাহারের ৪৮ পাতার পার্সোনাল ফাইলেও এসব উল্লেখ রয়েছে।
এদিকে চাকরিচ্যুত হওয়ার পরই আদালতের দ্বারস্থ হন আতাহার আলী খান। সাঈদ খোকন মেয়র থাকাকালে আদালতের নির্দেশে তিনি চাকরি ফিরে পান। কিন্তু সাঈদ খোকন তাকে কর কর্মকর্তার পদে না বসিয়ে পরিকল্পনা বিভাগে সংযুক্ত করেন। তবে ছয় বছরের সব দেনা-পাওনা বাবদ প্রায় ৪০ লাখ টাকা তাকে একবারে পরিশোধ করে ডিএসসিসি। এ ক্ষেত্রে অভিযোগ হলো, মামলায় ডিএসসিসি নমনীয় ভূমিকা পালন করায় আতাহার সহজেই চাকরি ফিরে পান। আর চাকরি ফিরে পাওয়ার পরই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি আতাহারকে চাকরিচ্যুত করে তাকে দেওয়া সব বেতন-ভাতা ফেরত নেওয়ার সুপারিশ করেছে; কিন্তু সেটা করা হয়নি। সর্বশেষ ফজলে নূর তাপস মেয়রের দায়িত্ব নেওয়ার চতুর্থ দিনের মাথায় তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেন। ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ ইমদাদুল হক বলেন, মেয়র চাইলে যে কাউকে কোনো কারণ ছাড়াই চাকরি থেকে অব্যাহতি দিতে পারেন। আইনে সেই ক্ষমতা মেয়রের আছে। আর আতাহারের ক্ষেত্রে তো দুদকে মামলা চলমান থাকাসহ আরও অনেক অভিযোগ।
এসব প্রসঙ্গে আতাহার আলী খান সমকালকে বলেন, তার প্রতি অবিচার করা হয়েছে। দুদকে যে মামলার কথা বলা হচ্ছে, সে মামলা আর ক্রিয়াশীল নেই। আর যে দোকান তার নামে ও ট্রেড লাইসেন্স তার নামে সেটা চাকরি পাওয়ার আগেই বরাদ্দ পেয়েছিলেন। তখন ট্রেড লাইসেন্সও করেছিলেন। আর নিয়োগের সবকিছুই স্বচ্ছতার সঙ্গেই হয়েছে। আর আমার স্নাতকের সনদ যে ঠিক আছে, সেটা তো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পরে চিঠি দিয়েও করপোরেশনকে জানিয়েছে। এখন চিন্তা করছেন চাকরি ফেরত পাওয়ার জন্য একটি আবেদন করবেন। তার ধারণা, তার সম্পর্কে কেউ বিকৃত তথ্য নতুন মেয়রের কানে দিয়েছেন। এ জন্যই তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন

×