ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

পরিকল্পনায় ধান-চাল আমদানি

পরিকল্পনায় ধান-চাল আমদানি
×

দেলওয়ার হোসেন

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২০ | ১২:০০

সরকারি দরের চেয়ে খোলা বাজারে দাম বেশি; তাই কৃষক সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করছেন না। ফলে চলতি বোরো মৌসুমে খাদ্যশস্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রকৃত কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহের কার্যক্রম জোরদার করার জন্য জেলা প্রশাসক ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকদের একাধিকবার নির্দেশনাও দিয়েছে সরকার। এরপরও লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ধান-চাল সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় বিদেশ থেকে চাল আমদানির পরিকল্পনা করছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। সংশ্নিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
জানা যায়, গত দুই মাসে সারাদেশে মাত্র ৫১ হাজার টন ধান এবং দুই লাখ ২৫ হাজার টন চাল সংগ্রহ হয়েছে। অথচ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ লাখ টন ধান এবং সাড়ে ১১ লাখ টন চাল সংগ্রহের। গত বছর যে দরে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে বোরো ধান ও চাল কিনেছিল সরকার এবারও সেই দরেই কিনছে। গত বছরের তুলনায় করোনা সংকটের কারণে এবার কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়লেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। ফলে খোলা বাজারে দাম বেশি পাওয়ায় সরকারি গুদামে ধান-চাল বিক্রি করছেন না কৃষক। চলতি বোরো মৌসুমে ২৬ টাকা কেজি দরে ১০ লাখ টন ধান, ৩৬ টাকা কেজি দরে সাড়ে ১১ লাখ টন চাল কেনার অনুমোদন দিয়েছে খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটি। গত ২৬ এপ্রিল থেকে এবারের খাদ্য সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। গত বছরও একই দরে ধান-চাল কেনা হয়েছিল। এমনকি গমের দামও এবার একই রাখা হয়েছে। গত বছরের মতো এবারও ২৮ টাকা কেজি দরেই গম সংগ্রহ করা হচ্ছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ২৪ জুনের হিসাব অনুযায়ী, গত দুই মাসে সারাদেশে ধান সংগ্রহ করা হয়েছে মাত্র ৫১ হাজার টন। আর চাল (সিদ্ধ) সংগ্রহ হয়েছে দুই লাখ এক হাজার ৮৮৫ এবং আতপ চাল ২৩ হাজার ৮৫০ টন। পরিস্থিতি সামাল দিতে খাদ্যমন্ত্রী একাধিকবার মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সংগ্রহের গতি বাড়াতে তাগিদ দিয়েছেন।
বাংলাদেশ অটো, মেজর ও হাস্কিং রাইস মিল অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব লায়েক আলী সমকালকে বলেন, ২৬ টাকায় ধান কিনে ৩৬ টাকায় চাল বিক্রি করতে পারছি না। এতে প্রতি কেজি চালে চার থেকে পাঁচ টাকা লোকসান হচ্ছে। সরকারকে এভাবে চাল দিতে গেলে মিল বিক্রি করে দিতে হবে। তাই জেল-জরিমানা দিলেও সরকারের কাছে এ দামে চাল দিতে পারব না। তিনি জানান, এ সমস্যার সমাধানের জন্য যেসব মিল মালিক পুরো চাল সরকারকে দেবে তাদের প্রতি কেজিতে চার টাকা করে প্রণোদনা দেওয়ার দাবি করা হয়েছে।
খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার সমকালকে বলেন, বোরো সংগ্রহের গতি বাড়াতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিবও জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দিয়েছেন। ধান-চালের দাম কম হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, গত বোরো ও আমন মৌসুমেও একই দাম ছিল। তখন তারা দিতে পেরেছেন- এখন কেন পারবেন না। এ ছাড়া চালকল মালিকদের সঙ্গে যখন চুক্তি করা হয় তখন তারা কিছুই বলেননি। কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে যখন রেজুলেশন হয়ে আসে তখনও তারা দাম বাড়নোর দাবি করেননি। এখন দুই মাস পর যখন আড়াই লাখ টন চাল কেনা হয়ে গেছে তখন তারা দাম বৃদ্ধির দাবি করছেন। এ দাবি অযৌক্তিক। এখন সরকার চালের দাম দুই টাকা বাড়ালে বাজারে দশ টাকা বেড়ে যাবে। তখন চালের বাজার সামাল দেওয়া কঠিন হবে। চালকল মালিকরা যদি সিন্ডিকেট করে তাহলে বিদেশ থেকে চাল আমদানি করা হবে। এরই মধ্যে কয়েকটি দেশের সঙ্গে চাল আমদানির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে তিনি জানান।
সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, মিল মালিকরা চুক্তি অনুযায়ী চাল না দেওয়ায় ২০১৭ সালের মতো বিদেশ থেকে চাল সংগ্রহের চিন্তা করছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। এরই মধ্যে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় মনে করছে, কৃষকরা এবার ন্যায্যমূল্যে ধান বিক্রি করতে পারছেন। খোলা বাজারেও ধানের দাম বেশি। আর সরকারের মূল উদ্দেশ্য হলো- কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং চালের দাম সহনীয় রাখা।
ঢাকা বিভাগের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক তপন কুমার দাস সমকালকে বলেন, কৃষক এবার খোলা বাজারেই ভালো দাম পাচ্ছেন। ফলে সরকারের কাছে চাল বিক্রি করছেন না। এ ছাড়া করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বেশিরভাগ মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। একই সঙ্গে আবহাওয়াও প্রতিকূল থাকায় শ্রমিক পাওয়া যায়নি। তাই ধান ও চাল সংগ্রহ কম হয়েছে। তিনি বলেন, ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগে এবার বোরো ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল দুই লাখ ৩০ হাজার টন। এখন পর্যন্ত সংগ্রহ হয়েছে ১৩ হাজার টন। চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল দুই লাখ ৫৮ হাজার ৩৭৭ টন। সংগ্রহ হয়েছে প্রায় ৫৮ হাজার টন। শেষ পর্যন্ত পুরো চালই সংগ্রহ করা যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, যেহেতু মিল মালিকরা চুক্তি করেছেন তাই তারা সরকারকে চাল দিতে বাধ্য। তবে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ধান সংগ্রহ করা যাবে না। দশজনের বেশি জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ডিসি-ফুড) ধান-চাল সংগ্রহের বিষয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে সমকালকে বলেন, লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে এবং সরকারি গুদামে মজুদ কমে গেলে ২০১৭ সালের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে অসাধু ব্যবসায়ীরা চালের বাজার অস্থির করে তুলতে পারেন। ২০১৭ সালে খাদ্য মজুদ মাত্র দেড় লাখ টনে নেমে এসেছিল।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত ২৪ জুন পর্যন্ত সরকারের গুদামে খাদ্যশস্য মজুদ ছিল ১২ লাখ টন। গত বছর এই সময়ে মজুদ ছিল প্রায় ১৬ লাখ টন। প্রতিবছর জুন মাসে বোরো সংগ্রহ সবচেয়ে বেশি হয়। অতীতের তুলনায় এবার সবচেয়ে কম হয়েছে। ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ধান-চাল সংগ্রহের সময়সীমা থাকলেও জুলাই-আগস্ট বর্ষাকাল হওয়ায় খাদ্য সংগ্রহে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না বলেই মনে করছেন সংশ্নিষ্টরা।
হাওরের উপজেলা মিঠামইনের চারিগ্রামের কৃষক জিয়ারুল মিয়া ও ইটনার মোশারফ হোসেন সমকালকে জানান, সরকারের গুদামে ধান বিক্রি করতে হলে ১৪ শতাংশ আর্দ্রতা থাকতে হয়। প্রতি মণে দাম পাওয়া যায় ১০৪০ টাকা। এ ছাড়া সরকারের কাছে ধান বিক্রি করতে নানা ধরনের ভোগান্তিও হয়। অথচ খোলা বাজারে ধান বিক্রি করতে নির্দিষ্ট কোনো আর্দ্রতা লাগে না। প্রতি মণের দাম পাওয়া যায় ৯৮০ টাকা থেকে ১০৫০ টাকা পর্যন্ত।
জানা যায়, ধান-চালের সংগ্রহ বাড়াতে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত অনলাইন বৈঠক করছেন খাদ্যমন্ত্রী ও সচিব। বৈঠকে খাদ্যমন্ত্রী কড়া নির্দেশনা দিলেও তাতে কোনো কাজ হচ্ছে না। কর্মকর্তারা চেষ্টা করলেও কৃষক সরকারের গুদামে ধান বিক্রি করছেন না।


আরও পড়ুন

×