ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

বন্যায় দুর্ভোগ বাড়ছে

বন্যায় দুর্ভোগ বাড়ছে
×

ফাইল ফটো

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২০ | ১২:০০

দেশের প্রধান প্রধান নদনদীর পানি বেড়েই চলেছে। ফলে বাড়ছে বন্যার পরিসর। এরই মধ্যে বিভিন্ন নদনদীর ২৩টি পয়েন্টে পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। এর প্রভাবে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত অন্তত ২০টি জেলার নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেছে। চলতি মাস পেরিয়ে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বন্যা স্থায়ী হতে পারে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র এসব তথ্য দিয়েছে। এদিকে, বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদে চরম দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে খাদ্য ও পানীয় জলের তীব্র সংকটে পড়েছেন বানভাসি মানুষ। সরকারি হিসাবে, ইতোমধ্যে প্রায় তিন লাখ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সে হিসাবে ১০ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। বন্যায় সাড়ে ১৪ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর আসছে। বিভিন্ন স্থানে নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, মঙ্গলবার ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও পদ্মার পানি আরও বেড়েছে। আরিচা পয়েন্টে যমুনা বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। তবে তিস্তা ও ধরলার পানি কমতে শুরু করেছে। কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, বগুড়া, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নাটোর, নওগাঁ, মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, রাজবাড়ী ও ঢাকার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। নীলফামারী, লালমনিরহাট, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা এবং রংপুরে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া সমকালকে জানান, ইতোমধ্যে দেশের ২০টি জেলা বন্যাদুর্গত হয়ে পড়েছে। কয়েকদিনের মধ্যে ২৫ জেলায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এ মুহূর্তে যা অবস্থা, তাতে বন্যা পরিস্থিতি আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত থাকতে পারে।
সংস্থাটির পূর্বাভাস, ভারি বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় নদনদীর পানি আরও বাড়বে। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও গঙ্গা-পদ্মা নদনদীগুলোর পানি বাড়ছে। এটা আগামী ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। কুশিয়ারা ছাড়া উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আপার মেঘনা অববাহিকায় প্রধান নদনদীগুলোর পানি কমছে, যা আগামী ৪৮ ঘণ্টা অব্যাহত থাকতে পারে।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ধরলা নদীর কুড়িগ্রাম পয়েন্টে পানি সোমবার ছিল ৮৮ সেন্টিমিটার, গতকাল তা ১০২ সেন্টিমিটার অতিক্রম করেছে। এক দিনের ব্যবধানে ব্রহ্মপুত্রের নুনখাওয়া পয়েন্টে ৫৪ থেকে বেড়ে বিপদসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার অতিক্রম করেছে। এ ছাড়া ব্রহ্মপুত্রের চিলমারীতে ৫১ থেকে বেড়ে ৯০, যমুনা নদীর ফুলছড়ি পয়েন্টে ৬২ থেকে বেড়ে ১০১, বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে ৫৭ থেকে বেড়ে ৯৯, সারিয়াকান্দি পয়েন্টে ৪২ থেকে বেড়ে ৮৩, কাজিপুর পয়েন্টে ২৮ থেকে বেড়ে ৬৯, সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে ৬ থেকে বেড়ে ৩৯, গূড় নদীর সিংড়া পয়েন্টে ২৫ থেকে বেড়ে ৩২, আত্রাই নদীর বাঘাবাড়ি পয়েন্টে ৬ থেকে বেড়ে ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
ধলেশ্বরী নদীর এলাসিন পয়েন্টে পানি ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে এখন প্রবাহিত হচ্ছে, যেখানে সোমবার বিপদসীমার নিচে ছিল। একইভাবে আপার আত্রাই নদীর ভুসিরবন্দর পয়েন্টে ৩৬, আত্রাই নদীর আত্রাই পয়েন্টে ১৩, পদ্মা নদীর গোয়ালন্দ পয়েন্টে ৫ থেকে বেড়ে আজ ৩০, ভাগ্যকুল পয়েন্ট ২ সেন্টিমিটার বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
বিভিন্ন জেলায় পরিস্থিতির অবনতি :এদিকে সারাদেশে বন্যা পরিস্থিতির অবনতির খবর পাঠিয়েছেন সমকাল প্রতিনিধিরা :
কুড়িগ্রাম :কুড়িগ্রামের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র পাড়ের সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের গারুহারা, বলদীপাড়া, চর পার্বতীপুর, পোড়ার চর, ঝুনকার চর, চর ভগবতীপুর, কালির আলগা, উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের নয়াডারা, কামারটারী, হাতিয়া ভবেশ, হাতিয়া মেলা, নীলকণ্ঠ, দাগারকুটি, গুজিমারী, গাবুরজান, বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের ফকিরের তল, বালাডোবা, মশালের চর, বতুয়াতলী, আক্কেল মামুদ, আফতাবগঞ্জ এবং চিলমারী উপজেলার নয়ারহাট ইউনিয়নের খেরুয়া, উত্তর খাওরিয়া, খেদাইমারী, গয়নার পটল, নাইয়ারচর ও উত্তর ফেচুকাসহ কুড়িগ্রাম জেলার শত শত গ্রাম এখন বানের পানিতে ভাসছে।
গ্রামগুলোর অধিকাংশ বাড়িতে কোথাও হাঁটুসমান কোথাও বুকসমান পানি। এ অবস্থায় ঘরে চৌকি উঁচু করে, মাচা পেতে কেউবা নৌকায় বসবাস করছেন। সেইসঙ্গে পানির তোড়ে বাড়িঘর ভেসে যাওয়ার সংশয়ের পাশাপাশি খাদ্য আর বিশুদ্ধ পানির সমস্যা ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। এ অবস্থায় থাকতে না পেরে অনেকে বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছেন।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুল হাই সরকার জানান, ৯ উপজেলার ৫৬ ইউনিয়নের ৪৫০টি গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা বেড়ে এক লাখ ২০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় ঈদুল আজহা উপলক্ষ করে বন্যার্ত চার লাখ ২৮ হাজার ৫২৫টি পরিবারের প্রত্যেককে ১০ কেজি করে চাল দেওয়ার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দ্রুততম সময়ে এ চাল বিতরণ করার প্রক্রিয়া চলছে।
লালমনিরহাট :লালমনিরহাটে তিস্তার পানি কমতে শুরু করলেও এখনও কমেনি বানভাসিদের ভোগান্তি। ধরলার পানি এখনও বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। মঙ্গলবার বিকেল ৩টায় ব্যারাজ পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ১৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ধরলার পানি বৃদ্ধিতে সদর উপজেলার মোগলহাট ও কুলাঘাট ইউনিয়নের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানি এখনও সরে না যাওয়ায় জেলার পাঁচটি উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের প্রায় ৩৫ হাজার পরিবার এখনও পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে।
চিলমারী (কুড়িগ্রাম) :চিলমারীতে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। অস্বাভাবিকভাবে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের ১০০টি গ্রামের প্রায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। অব্যাহত পানি বৃদ্ধির কারণে রাস্তাঘাট ভেঙে উপজেলার সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজারো মানুষ। বানভাসি মানুষের মাঝে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে।
সিরাজগঞ্জ :সিরাজগঞ্জে যমুনার পানি হু হু করে বাড়তে শুরু করেছে। জেলা পয়েন্টে মঙ্গলবার যমুনার পানি বিপদসীমার ৩৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। কাজিপুর উপজেলা পয়েন্টে বিপদসীমার ৬৯ সেন্টিমিটার ওপরে। এদিকে, যমুনার পানি বাড়ায় নদীতীরবর্তী কাজিপুর উপজেলার ক্ষুদবান্ধি ও সিংগড়াবাড়ি এবং শাহজাদপুর উপজেলার কৈজুরীতে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে।
অন্যদিকে, সদর উপজেলার শিমলায় পাউবোর সেই ক্ষতিগ্রস্ত 'শিমলা স্পার'টির আরও প্রায় ৫০ মিটার পাকা কংক্রিট অংশ গত সোমবার নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এক মাসের ব্যবধানে তিনবার ধস নামে ওই স্পারে। পানির মধ্যে বাকি ৫০ মিটার অবকাঠামো দাঁড়িয়ে আছে।
দিনাজপুর :উজান থেকে নেমে আসা পানি ও টানা বর্ষণের ফলে দিনাজপুর জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। অনেকের বাড়ির সামনে পানি চলে এসেছে। দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১২টার পরিমাপ অনুযায়ী, পুনর্ভবা নদীতে পানি ৩২ দশমিক ৬০ সেন্টিমিটার, আত্রাই নদীতে ৩৯ দশমিক ৯৬ সেন্টিমিটার ও ইছামতি নদীতে ২৮ দশমিক ৯৮ সেন্টিমিটার বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়াও জেলার অন্যান্য ছোট নদীর পানিও বৃদ্ধি পেয়েছে।
গাইবান্ধা :ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় গাইবান্ধায় সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। জেলার সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও সদর উপজেলার ২৬টি ইউনিয়ন পুনরায় বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে। ওইসব এলাকার এক লাখ ২৫ হাজার মানুষ এখন পানিবন্দি। এর আগে যেসব এলাকা থেকে পানি নেমে গিয়েছিল সেসব এলাকা আবারও নতুন করে বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে। ফলে ঘরবাড়িতে বন্যার পানি ওঠায় পানিবন্দি পরিবারগুলো চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছে। শুকনো খাবার ও জ্বালানির অভাবে খাদ্য সংকটে পড়েছেন বন্যার্ত মানুষ। অনেকে বাড়িঘর ছেড়ে গরু-ছাগল নিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও উঁচু স্থানে আশ্রয় নিতে শুরু করেছেন। রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, চার উপজেলার বন্যার্তদের মধ্যে বিতরণের জন্য নতুন করে ১০০ টন চাল, চার লাখ টাকা, এক হাজার ৮০০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং শিশুখাদ্যের জন্য দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেছুর রহমান জানান, বন্যার পানি আরও দু'দিন বাড়বে।
সাঘাটা (গাইবান্ধা) :নদনদীর পানি বৃদ্ধিতে সাঘাটার উপজেলার হলদিয়া, জুমারবাড়ী, ভরতখালী, ঘুড়িদহ ও সাঘাটা ইউনিয়নের পালপাড়া, চিনিরপটল, চকপাড়া, পবনতাইড়, থৈকরপাড়া, বাশহাটা, মুন্সিরহাট, গোবিন্দি, দক্ষিণ সাথালিয়া, উত্তর সাথালিয়া, বাঁশহাটা, নলছিয়াসহ ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ঘুড়িদহ ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোক্তা রোস্তম আলী জানান ঘুড়িদহ ইউনিয়নের চিনিরপটল গ্রাম, চিনিরপটল দাখিল মাদ্রাসা, একটি মসজিদসহ অনেক ঘরবাড়ি যমুনা নদীর পানির তীব্র স্রোতে যে কোনো সময় নদীতে বিলীন হতে পারে।
ফুলছড়ি (গাইবান্ধা) :প্রথম দফার বন্যায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ফুলছড়ির তিস্তামুখঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ৮২ সেন্টিমিটার ওপর প্রবাহিত হলেও দ্বিতীয় দফার বন্যায় বিপদসীমার ১০০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে গাইবান্ধার ফুলছড়ি-উল্লাবাজার সড়ক ডুবে গেছে। এ ছাড়া ফুলছড়ি উপজেলার এরেন্ডবাড়ি, কঞ্চিপাড়া, ফজলুপুর, উড়িয়া, ফুলছড়ি, উদাখালী ও গজারিয়া ইউনিয়নের চরাঞ্চলের বেশিরভাগ বাড়িতে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। ডুবে গেছে সব রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
নেত্রকোনা :নেত্রকোনায় প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় নিম্নাঞ্চলে পানি প্রবেশ করেছে। লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন। নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে জেলার দুর্গাপুর, কলমাকান্দা, বারহাট্টা, সদর উপজেলার শতাধিক গ্রামে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে খালিয়াজুরী, কলমাকান্দা ও দুর্গাপুরে ২০ টন করে চাল ও ২০০ প্যাকেট করে শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল।
সারিয়াকান্দি (বগুড়া) :সারিয়াকান্দিতে যমুনা ও বাঙ্গালী নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি ৪৪ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৯৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধির ফলে উপজেলার চালুয়াবাড়ী, কাজলা, কর্ণিবাড়ী, বোহাইল, চন্দনবাইশা, হাটশেরপুর, কুতুবপুর, সারিয়াকান্দি সদর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সূত্রে জানা গেছে, বন্যায় উপজেলার ১২৩টি গ্রামের ২৫ হাজার ৭৫০ পরিবারের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
সুনামগঞ্জ :উজানের পানি কমলেও গতকাল মঙ্গলবার সুরমা নদীর সুনামগঞ্জ পয়েন্ট দিয়ে বিপদসীমার ১৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। নদীর পানি কমলেও হাওরেও জনবসতিতে পানি বেড়েছে। এ কারণে দুর্ভোগ বেড়েছে এসব এলাকায়। টিউবওয়েল ডুবে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির সংকট, হাওরের আফালের ঢেউ থেকে বাড়ি রক্ষা, নদীর পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে নদীভাঙনের তীব্রতা থেকে গ্রাম জনবসতি রক্ষার লড়াই করছেন হাওরপাড়ের মানুষ। এদিকে সুনামগঞ্জ শহর ও শহরতলির অন্তত ২০ হাজার মানুষের কারও ঘরে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি। কারও ঘর থেকে বের হলেই কোমরসমান পানি। পানিবন্দি এসব মানুষের যাতায়াত ভরসা ছোট ছোট নৌকা কিংবা কলাগাছের ভেলা।
হবিগঞ্জ :হবিগঞ্জের সবক'টি হাওরে পানি বেড়েই চলেছে। এতে হবিগঞ্জ-বানিয়াচং সড়কের কালারডুবা সেতু পানির নিচে তলিয়ে গেছে। সাধারণ লোকজনদের অভিযোগ, কয়েক দিন ধরেই সেতুর সমানে সমানে পানি ছিল। কিন্তু সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের ব্যবস্থা না নেওয়ায় মঙ্গলবার সেতুটি পানির নিচে তলিয়ে যায়। ফলে বানিয়াচং ও আজমিরীগঞ্জ উপজেলা থেকে জেলা শহরে আসা সাধারণ লোকজনের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে।
বাঘা (রাজশাহী) :পদ্মায় পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভাঙন শুরু হয়েছে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চকরাজাপুর ইউনিয়নের কালিদাসখালী ও লক্ষ্মীনগর এলাকায়। প্রায় দুই কিলোমিটার ভাঙনে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে শতাধিক একর জমিসহ গাছপালাও। ভাঙনের কবলে পড়ে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে কালিদাসখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। হুমকিতে রয়েছে লক্ষ্মীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
বাউফল (পটুয়াখালী) :বাউফলে ব্যাপক নদীভাঙন শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে উপজেলার ১৪টি গ্রাম বিলীন হয়েছে তেঁতুলিয়া ও লোহালিয়ার নদীর গর্ভে। উজানে বন্যার পানি, অস্বাভাবিক বৃষ্টি ও প্রবল তোড়ে প্রতিদিনই নদীতে হারিয়ে যাচ্ছে উপজেলার কোনো না কোনো এলাকা। জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি ভাঙছে ধুলিয়া, কনকদিয়া, কাছিপাড়া, বগা ধাউরাভাঙ্গা, বামনীকাঠি, কেশবপুর, নাজিরপুর ও চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়ন। এসব ইউনিয়নের প্রায় ২০-২৫টি গ্রাম নদীতে হারিয়ে গেছে। সহায়-সম্বল হারিয়ে প্রায় ১০-১৫ হাজার মানুষ অসহায় হয়ে পড়েছেন।
শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) :শাহজাদপুরের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। ফলে দ্বিতীয় দফার এই বন্যার কবলে পড়ে পানিবন্দি প্রায় ৪০ হাজার মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। বন্যার পানিতে যমুনার চরাঞ্চলে নলকূপ ডুবে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির সংকট সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলার পৌর এলাকাসহ ১৩টি ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থান বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় গবাদি পশু নিয়ে বন্যার্তরা বিপাকে পড়েছেন। অনেকেই সহায়-সম্বল নিয়ে যমুনা তীরবর্তী বাঁধসহ উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর দিনযাপন করছেন।
ছাতক (সুনামগঞ্জ) :ছাতকে বন্যা পরিস্থিতি উন্নতি হলেও সুরমা নদীর পানি এখনও বিপদসীমার ওপর দিয়েই প্রবাহিত হচ্ছে। মঙ্গলবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত সুরমা ৭০ সেন্টিমিটার, পাহাড়ি নদী চেলা ও ইছামতি নদীর পানি বিপদসীমার ৯০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উপজেলায় ৩১৫টি গ্রামে এক লাখ ১৬ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। উপজেলায় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে এখন কয়েক হাজার বন্যাদুর্গত মানুষ অবস্থান করছেন।
ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ) :ব্র?হ্মপুত্র নদের ভাঙনের কবলে পড়ে ময়মনসিংহের গৌরীপুর ও ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দারা ভিটে ছাড়া হচ্ছেন। এর মধ্যে গৌরীপুর উপজেলার ভাংনামারী ইউনিয়নের ভাটিপাড়া, খোদাবক্সপুর, উজান কাশিয়ারচর এলাকায় ব্র?হ্মপুত্র নদের ভাঙন দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে অন্তত ১০ পরিবার গৃহহারা হয়েছে। অন্তত ২০০ পরিবার গৃহহীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এদিকে ঈশ্বরগঞ্জের উচাখিলা ইউনিয়নের মরিচারচর গ্রামের বাসিন্দারা তীব্র ভাঙনের কবলে পড়েছেন। ইতোমধ্যে অন্তত ৪০টি পরিবারের ঘরবাড়ি নদে বিলীন হয়েছে। ঝুঁকির মুখে রয়েছে শতাধিক পরিবার।

আরও পড়ুন

×