ডিক্যাব টকে চীনের রাষ্ট্রদূত
পাল্টা শুল্কের বিষয়ে ঢাকাকে সহযোগিতা করবে বেইজিং
ডিক্যাব টকে চীনের রাষ্ট্রদূত। ছবি-সংগৃহীত
কূটনৈতিক প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৫ | ২৩:২৬
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কারোপকে আধিপত্য বিস্তার চেষ্টার অংশ হিসেবে দেখছে চীন। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের পাল্টা শুল্কের ক্ষতি মোকাবিলায় ঢাকাকে সহযোগিতা করবে বেইজিং। মঙ্গলবার এ কথা জানিয়েছেন ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন।
সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে কূটনৈতিক সংবাদদাতাদের সংগঠন ডিপ্লোম্যাটিক করেসপনডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (ডিক্যাব) ‘ডিক্যাব টক’ অনুষ্ঠানে ইয়াও ওয়েন সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। ডিক্যাব সভাপতি এ কে এম মঈনউদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আরিফুজ্জামান মামুন।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কারোপ নিয়ে এক প্রশ্নে রাষ্ট্রদূত বলেন, চীন এ ধরনের পাল্টা শুল্কের বিপক্ষে। এ শুল্কারোপ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য সহায়ক নয়। এটি অযৌক্তিক, অন্যায্য ও অন্যায়। তিনি বলেন, ডব্লিউটিওর আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া মোকাবিলায় বাংলাদেশকে সহযোগিতা দেবে চীন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজারের সম্প্রসারণ ও রপ্তানি-দক্ষতা বাড়ানোর ওপরও জোর দেন রাষ্ট্রদূত।
ইয়াও ওয়েন জানান, ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ২০২৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা অব্যাহত রাখবে চীন।
অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আশা
অন্তর্বর্তী সরকার একটি অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে বলে আশা করেন ইয়াও ওয়েন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে জাতীয় সরকার গঠন হবে কিনা কিংবা নির্বাচন কবে হবে, তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশ এখন সংস্কার ও উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। চীন বাংলাদেশে একটি নির্বিঘ্ন, সফল এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে চায়। আর কবে নির্বাচন হবে, সে সময় নির্ধারণের দায়িত্ব বাংলাদেশের জনগণের; বাইরের কোনো দেশের নয়।
ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগ, পক্ষবিরোধী জোট নয়
চীন, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগ কোনোভাবেই তৃতীয় পক্ষবিরোধী জোট নয় বলে মন্তব্য করেন ইয়াও ওয়েন। তিনি বলেন, যেহেতু এ উদ্যোগ কোনো পক্ষবিরোধী নয়, তাই এ নিয়ে অন্য কোনো দেশের উদ্বেগের কারণ নেই।
চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশ, চীন ও পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা চলছে। এ উদ্যোগের কেন্দ্রে রয়েছে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি। এটি কোনোভাবেই তৃতীয় কোনো পক্ষবিরোধী জোট নয়; দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশ এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক উদ্বেগও প্রকাশ করেনি।
রাষ্ট্রদূত জানান, চীন বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে আগ্রহী। এই ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতার মূল লক্ষ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা। বাংলাদেশ, চীন ও পাকিস্তানের সম্পর্ক স্বাভাবিক। এই তিন দেশ ইতোমধ্যে ১২ খাতে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রকল্পের সহযোগিতা মাথায় রেখে মহাপরিচালক পর্যায়ে দেশগুলোর মধ্যে আলোচনা হবে। তিন দেশের বৈঠকের পর দক্ষিণ এশিয়ার বাকি দেশকে এ বিষয়ে জানানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো দেশ এ নিয়ে আপত্তি করেনি।
বিগত সরকারের সময় বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি
ইয়াও ওয়েন বলেন, বিগত সরকারের শেষ ১০ বছরে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি চীন। এ দুই দলের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সে সময় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছিল।
সম্প্রতি বিএনপি ও জামায়াতের প্রতিনিধি দল চীন সফর করেছে। এ বিষয়ে অনুষ্ঠানে চীনের রাষ্ট্রদূতের কাছে জানতে চাওয়া হয়। জবাবে তিনি বলেন, গত ১০ বছরে বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা যায়নি। এখন সময় এসেছে, তাই তারা পুনর্যোগাযোগ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হতে কীভাবে বাধা দেওয়া হতো– জানতে চাইলে ইয়াও ওয়েন বলেন, গত কয়েক বছরের পরিস্থিতি কেমন ছিল, সেটি উপস্থিত সাংবাদিকরা অনুধাবন করতে পারেন। আমি সুনির্দিষ্ট কিছু বলতে চাই না।
মাইলস্টোনের ঘটনায় তদন্তে সহায়তা
রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা তদন্তে সহায়তার জন্য চীনের একটি বিশেষজ্ঞ দল ঢাকায় আসবে। রাষ্ট্রদূত বলেন, মূলত দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে সহায়তার জন্য চীনের কারিগরি বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশ আসবেন। দুর্ঘটনার একটি সমন্বিত ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
রোহিঙ্গাদের এখনই প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে তিনি বলেন, তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোই একমাত্র টেকসই সমাধান। এ বিষয়ে চীন বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয় পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখছে। তবে রাখাইনের বর্তমান পরিস্থিতির কারণে এখনই প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়।
তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে চীন প্রস্তুত
তিস্তা নদী পুনর্বাসন ও বহুমুখী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়নে চীন সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়ে ইয়াও ওয়েন বলেন, বাংলাদেশ সরকার সিদ্ধান্ত নিলে চীন দ্রুত প্রকল্পের কাজ শুরু করতে পারবে। রাষ্ট্রদূত বলেন, তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে চীন সব ধরনের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা দিতে প্রস্তুত। এখন সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ সরকারের হাতে।
চিকিৎসা নিতে যাচ্ছেন মাসে ৪০ ৫০ রোগী
ইয়াও ওয়েন জানান, বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনীতিক সম্পর্কের ৫০ বছরপূর্তি উপলক্ষে বাংলাদেশের সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা জোরদার করেছে চীন। বর্তমানে প্রতি মাসে ৪০ থেকে ৫০ বাংলাদেশি রোগী চিকিৎসা নিতে চীন যাচ্ছেন। আগে বাংলাদেশিদের চিকিৎসার জন্য পাঁচটি হাসপাতাল নির্ধারণ করা হলেও এখন চীনের সব হাসপাতালে সেবা নেওয়া যাচ্ছে। এক প্রশ্নে তিনি বলেন, বাংলাদেশে হাসপাতাল স্থাপন করবে চীন।
- বিষয় :
- ডিক্যাব
- চীন
- রাষ্ট্রদূত
- শুল্ক
