ট্রাইব্যুনালে প্রথম সাক্ষী
সেদিন যাত্রাবাড়ীতে পুলিশ ‘পাখি মারার মতো’ গুলি ছোড়ে
রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। ছবি: বিটিভির ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৫ | ১৯:৪৬ | আপডেট: ০৩ আগস্ট ২০২৫ | ১৯:৫১
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে করা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রথম একজন সাক্ষ্য দিয়েছেন। রোববার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এ এই সাক্ষ্য দেন খোকন চন্দ্র বর্মণ নামের একজন মাইক্রোবাসচালক।
জবানবন্দিতে খোকন চন্দ্র বর্মণ বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় পুলিশ তার মাথা লক্ষ্য করে গুলি করে। গুলি তার চোখ, নাক ও মুখে লাগে। এ সময় সাক্ষী খোকন চন্দ্র বর্মণ মাস্ক খুলে মুখ দেখান। দেখা যায়, তার বাঁ চোখ, নাক ও মুখ পুরোটাই বিকৃত হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, আমার বাঁচার কোন আশা ছিল না। দেশে চিকিৎসার পর রাশিয়াতেও পাঠানো হয়।
গত বছরের ১৮ জুলাই নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় ছাত্র আন্দোলনে যোগ দেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেদিন স্লোগানে আন্দোলন করে বাসায় ফিরে যাই। পরদিন ১৯ জুলাই সকালে আন্দোলনে অংশগ্রহনের জন্য বের হয়ে ভুঁইঘর থেকে জালকুঁড়ির দিকে যাই। সেখান থেকে চাষাঢ়ার দিকে যেতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু যেতে পারিনি। পথে বিজিবি ক্যাম্পের সামনে পুলিশ ও বিজিবি গুলি করে। চোখের সামনে আন্দোলনরত একজনের বুকে গুলি লেগে পেছন দিয়ে বের হয়ে যায়। সাথে সাথে তিনি মারা যান। আরও অনেকে আহত ও নিহত হন।
এরপর ৫ আগস্ট সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যে আন্দোলনে যোগ দিতে সাইনবোর্ড মোড়ে যাই উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে অনেকক্ষণ স্লোগান দেই ও মিছিলে অংশ নেই। পরে সেখান থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিই। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে যাত্রাবাড়ী এলাকায় পৌঁছালে পুলিশ ও বিজিবি বাধা দেয়।
খোকন বলেন, যখন আমরা যাত্রাবাড়ী পৌঁছাই তখন পুলিশ আমাদের ওপর গুলি করে। তখন একজনের মাথায় একপাশ দিয়ে গুলি লেগে অন্য পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়। এমনভাবে রক্ত বের হচ্ছিল যেন গরু জবাই করা হয়েছে। ওই গুলিটা আরেকজনের গায়ে লাগে এবং সেও আহত হয়। যার মাথায় গুলি লাগে সে তখনই মারা যায়।
জবানবন্দিতে খোকন বলেন, তখন সেনাবাহিনী এসে ফাঁকা গুলি করে এবং পুলিশকে থানায় চলে যেতে বলে। এরপর পুলিশ সদস্যরা যাত্রাবাড়ী থানায় চলে যায়। হঠাৎ শুনতে পাই- শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। তখন সেখান থেকে সেনাবাহিনীও চলে যায়।
তিনি বলেন, সেনাবাহিনী চলে যাওয়ার পর থানা থেকে পুলিশ বেরিয়ে এসে ‘পাখি মারার মতো’ গুলি করতে থাকে। তখন যে যেখানে পেরেছেন আশ্রয় নিয়েছেন। আমি যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে পিলারের পেছনে লুকাই।
এক পর্যায়ে পুলিশ সেখানে গিয়ে ‘টার্গেট করে’ গুলি করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে যারা ছিলেন অধিকাংশই গুলিবিদ্ধ হন। একপর্যায়ে আমি ফ্লাইওভারের নিচে থাকা ড্রামের পেছনে আশ্রয় নিই। সেখানে একজন পুলিশ আমার ‘মাথা টার্গেট করে’ গুলি করেন। সেই গুলি লাগে তার হাতে-পায়ে ও মুখমণ্ডলে।
গুলি লাগার কষ্টের অনুভূতির কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আমার বাঁচার কোন আশা ছিল না। এ সময় মুখ থেকে মাস্ক সরিয়ে ট্রাইব্যুনালে নিজের ক্ষতিগ্রস্ত চেহারা দেখান খোকন।
খোকন চন্দ্র বর্মণ বলেন, ‘যারা হাজার হাজার মানুষকে মেরেছিল, তাদের জন্য শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন ও সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান—তারা দায়ী এবং আমি তাদের বিচার চাই।’
শেখ হাসিনার পাশাপাশি এই মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও আসামি। পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন এই মামলায় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায় স্বীকার করে নিয়েছেন। সেই সঙ্গে তিনি এই মামলায় ‘অ্যাপ্রুভার’ (দোষ স্বীকার করে ঘটনার সত্য বিবরণ প্রকাশ করেন যে আসামি; সাধারণত তিনি রাজসাক্ষী হিসেবে পরিচিত) হয়েছেন।
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। সূচনা বক্তব্যে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা সব অপরাধের নিউক্লিয়াস।
সূচনা বক্তব্যের আগে ট্রাইব্যুনালে বক্তব্য দেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। ট্রাইব্যুনালে তিনি বলেন, এ মামলার আসামিদের প্রচলিত আইনে সর্বোচ্চ সাজা চান।
মামলার বিচারের কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছে। মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছে।
- বিষয় :
- আদালত
- সাক্ষ্য
- সাক্ষ্যগ্রহণ
- শেখ হাসিনা
- জুলাই গণহত্যা
