জন্মশতবর্ষে সুলতান
অনন্য আলোর ধারায় জীবনের গান
শনিবার বেঙ্গল শিল্পালয়ে আলোচনা সভায় বিশিষ্টজন সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৫ | ০১:১৮ | আপডেট: ১০ আগস্ট ২০২৫ | ১০:১৪
শিল্পচর্চার দীর্ঘ সফরে সারাজীবন শিল্পের ধ্যানেই কাটিয়ে গেছেন এস এম সুলতান। প্রচলিত কাঠামোর বাইরে থেকে সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখেছেন সমাজকে। সেখানে তাঁর সৃষ্টিতে শ্রমজীবী মানুষের শক্তি ফুটে উঠেছে অনন্য দক্ষতায়। নিজস্ব শিল্পভাষায় তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলেছেন গ্রাম, কৃষকের জীবন ও প্রকৃতি। বোহেমিয়ান এই সাধক জীবনকে পাঠ করেছেন একটু ভিন্ন দৃষ্টিতেই, যা তাঁকে অনন্য করে রেখেছে কালের খেয়ায়।
বাংলাদেশের চিত্রকলার ইতিহাসে অনন্য আলোর ধারার নাম এস এম সুলতান। শ্রমজীবী মানুষের গৌরবময় অবয়ব, বাংলার প্রকৃতির বিস্তার ও কল্পনাশক্তির অসাধারণ ব্যবহারে তিনি শিল্পের ভুবনে স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে তুলেছেন। এ কিংবদন্তি শিল্পীর জন্মশতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে গঠিত হয়েছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উদযাপন কমিটি। এবার দুই বছরব্যাপী আয়োজনের মধ্য দিয়ে সুলতানের জীবন, শিল্প ও দর্শনকে তুলে ধরা হবে বিশ্বদরবারে।
উদযাপন উপলক্ষে প্রথম আলোচনা সভার আয়োজন হয় গতকাল শনিবার বেঙ্গল শিল্পালয়ে। বিষয় ছিল ‘শিল্পী সুলতানের উত্তরাধিকার: কল্পনা, সৌন্দর্য ও সহজ মানুষের উত্থানের রাজনীতি’। এতে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন প্রাবন্ধিক, নাট্যকার ও শিল্পসমালোচক ড. শাহমান মৈশান। আলোচক ছিলেন অধ্যাপক আবুল মনসুর, শিল্পী মোস্তফা জামান। স্মৃতিচারণ করেন শিল্প সংগ্রাহক আবুল খায়ের ও শিল্পী বিমানেশ চন্দ্র বিশ্বাস। আরও উপস্থিত ছিলেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।
অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রদর্শিত হয় আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন নির্মিত ভিডিওচিত্র। যেখানে শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার, ভাস্কর হামিদুজ্জামান খান, সমরজিৎ রায়চৌধুরী, কথাশিল্পী হাসনাত আবদুল হাইসহ অনেকেই সুলতানকে নিয়ে স্মৃতিচারণ ও বিশ্লেষণ করেন। সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, প্রতিভাবান মানুষ গৎবাঁধা ছকে চলে না। সুলতানও ছিলেন সেই ছকের বাইরে। একজন স্বশিক্ষিত শিল্পী, যিনি নিজের সাধনায় জ্ঞান আহরণ করেছেন।
উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব ও আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন জানান, সুলতানকে সম্পূর্ণভাবে জানতে আমাদের আরও অর্ধশত বছর অপেক্ষা করতে হবে। তাঁর জীবন ছিল নাটকীয়তায় ভরপুর। বহু গবেষণা হলেও এখনও অনেক কিছু অধরা। আমি নিজেও ১০ বছর অনুসন্ধান করে তাঁকে পুরোপুরি বুঝতে পারিনি।
মূল প্রবন্ধে ড. শাহমান মৈশান বলেন, সুলতান পাঠে জরুরি হচ্ছে শিল্পকে কীভাবে দেখা হয়। শিল্প কেবল জিনিয়াসের মধ্যে সৃষ্টি হয় না। এ অঞ্চলের ইতিহাস ও রাজনীতির ভেতর দিয়েই গড়ে উঠেছে সুলতানের ছবি। লাহোর ও করাচিতে প্রদর্শনী করার সময় সুলতানের ছবি নিজস্ব ভাষা পেয়েছে। উৎপাদনমুখর জৈবিক জীবনযাপন করেছেন। ছবির বিষয় ও ভাষা নতুনভাবে নির্মাণ করেছেন। তাঁর কাজ পেশিবহুল।
উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক মনিরুল ইসলাম বলেন, স্বশিক্ষিত শিল্পী ছিলেন সুলতান। নিজস্ব একটা জগৎ তৈরি করেছেন। ঢাকায় না এলে হয়তো অনেকই তাঁকে চিনত না। শিল্পী বিমানেশ চন্দ্র বিশ্বাস জানান, সুলতানের আঁকা ৬৮ ফুট দীর্ঘ একটি কাজ বর্তমানে সাজু আর্ট গ্যালারিতে রয়েছে।
দুই বছরব্যাপী জন্মশতবর্ষ উদযাপনে সুলতানের জীবন ও শিল্প নিয়ে তিনটি বই প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণা, প্রদর্শনী, ভিডিওচিত্র ও আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে তাঁর কীর্তি বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে।
১৯২৩ সালের ১০ আগস্ট নড়াইলে জন্ম এস এম সুলতানের। তিনি একুশে পদক, বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদের আজীবন সম্মাননা, শিল্পকলা একাডেমি পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর প্রয়াত হন তিনি। এস
- বিষয় :
- জন্মশতবর্ষ
- চিত্রশিল্পী
