অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর
শিক্ষা কমিশন হতে হবে আজই
অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন
অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন
প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৫ | ০১:২৮ | আপডেট: ১০ আগস্ট ২০২৫ | ১৫:১৪
দীর্ঘদিন আমরা দাবি করে আসছি, শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ দশমিক ৫ শতাংশ বরাদ্দ দিতে। কেন? কারণ পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা করে দেখেছি, যেসব দেশ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাধর, তাদের মূল ভিত্তি শক্তিশালী শিক্ষা ব্যবস্থা। পৃথিবীতে এমন একটি উন্নত দেশ খুঁজে পাওয়া যাবে না, যার বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র আজ সুপারপাওয়ার। কারণ তাদের হার্ভার্ড, এমআইটি ও স্ট্যানফোর্ডের মতো বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। ব্রিটেনের শক্তির মূলেও অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ ও ইউসিএলের মতো বিশ্ববিদ্যালয়। সিঙ্গাপুরের মতো ছোট দেশও বিশ্বমঞ্চে প্রভাব বিস্তার করছে বিশ্বমানের অন্তত দুটি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে বলে। বর্তমান চীনও বদলে গেছে শিক্ষায় বিপ্লব ঘটিয়ে। তিন দশক আগেও র্যাঙ্কিংয়ে প্রথম ১০০টির মধ্যে যাদের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না, এখন সেরা ২০-এ স্থান করে নিয়েছে।
এখান থেকে সহজেই বোঝা যায়, শিক্ষার মানোন্নয়ন ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ইত্যাদি নামে উন্নয়নের প্রচার চালিয়েছে। অথচ তাদের কাছে উন্নয়নের প্রকৃত ধারণাই ছিল না। উন্নয়নের ধারণা শিক্ষাহীন হলে, তা কেবল অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।
ইউনেস্কোর সুপারিশ হলো, শিক্ষা খাতে জিডিপির অন্তত ৬ শতাংশ বরাদ্দ করা। অথচ অন্তর্বর্তী সরকার বরাদ্দ রেখেছে মাত্র ১ দশমিক ৭২ শতাংশ, যা আগের সরকারের চেয়ে মাত্র শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশ বেশি।
শিক্ষাক্রম নয়, মুখ্য শিক্ষক
পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বারবার শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। বদল করাও হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শিক্ষক দুর্বল হলে শ্রেষ্ঠ কারিকুলামেও কোনো ফল আসবে না। সরকার ফিনল্যান্ডের আদলে কারিকুলাম করল। ফিনল্যান্ডের কারিকুলামে বাংলাদেশের শিক্ষক পড়ালে ফল ভালো হবে না। আবার বাংলাদেশের কারিকুলাম দিয়ে যদি ফিনল্যান্ডের শিক্ষক পড়ান, শিক্ষার মান উন্নত হবে। কারণ, শিক্ষকই শিক্ষার মেরুদণ্ড।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এখন বহু জায়গায় খণ্ডকালীন চাকরি করেন, কোচিং করান। এসব করতে গিয়ে তারা ক্লাস নেওয়ার আগেই ক্লান্ত হয়ে পড়েন। আবার বাস্তবতা এমন, তারা যে বেতন পান, তা দিয়ে সংসার চলে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যেখানে তিন জায়গায় কাজ করে জীবিকা চালান, সেখানে নর্থ সাউথ বা অন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক একই শহরে চার-পাঁচ গুণ বেশি বেতন পান। এ বৈষম্য কীভাবে টিকিয়ে রাখা যায়? যে শিক্ষক একবার নর্থ সাউথে যাবেন, তার তো দিন সেখানেই শেষ। তিনি তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কোনো সেবা দিতে পারলেন না। এ রকম তিনটি জায়গায় কেউ গেলে, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে সেবাটা কী দেবেন? এটি আবার আইন করে বন্ধ করা সম্ভব না। কারণ, যতদিন ক্ষুধা থাকবে, তা নিবারণের চেষ্টা তিনি করবেন।
সত্যেন্দ্রনাথ বোসকে নিয়ে আমরা গর্ব করি। অথচ ইতিহাস বলে, সেই সময় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে বেশি বেতন দেওয়া হয়েছিল বলেই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলেন। রমেশ চন্দ্র মজুমদার, সত্যেন বোস, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষের মতো মেধাবী শিক্ষকরা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে এসেছিলেন বলে সেই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মান এত উন্নত হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন গুণী শিক্ষক আসার কারণ ছিল, মেধার যথাযথ মূল্যায়ন। আজ সে মূল্যায়নের জায়গা শূন্য।
নিয়োগ প্রক্রিয়া হয়ে উঠছে রাজনৈতিক
গত এক বছর শিক্ষা খাতে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির জায়গায় আমি বলব, একদম নেতিবাচক। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে বড় বড় মানুষকে উপাচার্য বানানো হলো, তার আউটকাম কোথায়? আমি তো কোনো পরিবর্তন দেখছি না। শুধু নীলের জায়গায় সাদা দেখছি। আগের মতোই দলীয়ভাবে নিয়োগ পাচ্ছে।
শিক্ষক নিয়োগ এখনও ১০০ বছর আগের ধাঁচে চলছে। যেখানে আন্তর্জাতিক মানের পিএইচডির পাশাপাশি পোস্টডকও অপরিহার্য, সেখানে আমাদের শত শত বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্টডকধারী শিক্ষক নেই বললেই চলে। নিয়োগ হয় এক দিনের বোর্ডে, মাত্র ২০ মিনিটের ইন্টারভিউতে। অথচ এ নিয়োগ একজন শিক্ষকের ৩৫ বছরের কর্মজীবনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। যদি ভুল হয়, সে শুধু নিজের ক্ষতির কারণ হন না, অসংখ্য শিক্ষার্থীকে অপটু করে গড়ে তোলেন।
নিয়োগ পদ্ধতির সংস্কার না হলে কোনো উন্নয়ন টেকসই হবে না। নিয়োগ বোর্ডে উপাচার্যের উপস্থিতি একাডেমিক স্বাধীনতার পরিপন্থি। উপাচার্য প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকুক; শিক্ষক নিয়োগ হোক একাডেমিক বোর্ডের মাধ্যমে।
গবেষণার বাস্তব প্রভাব প্রয়োজন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫৬টি রিসার্চ সেন্টার হয়েছে। কিন্তু একটিরও আউটপুট নেই। যেন শুধু পরিচালক নিয়োগই উদ্দেশ্য। বোস সেন্টার আছে। এটি বনসাইয়ের মতো– মাত্র একটি কক্ষ ও দুজন কর্মচারী। অথচ এ সত্যেন বোসের হাত ধরে ঢাকায় কোয়ান্টাম ফিজিক্সের সূত্রপাত হয়েছিল।
আমাদের প্রয়োজন অল্পসংখ্যক, কিন্তু বিশ্বমানের কার্যকর গবেষণা কেন্দ্র। বিশ্বমানের একটি ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ সেন্টার ও একটি সেমিকন্ডাক্টর রিসার্চ সেন্টার গড়ে তোলা উচিত। বিশ্ব এখন প্রযুক্তিনির্ভর। কিন্তু প্রযুক্তিকে চালিত করে বিজ্ঞান। বিজ্ঞানকে শক্তিশালী না করে শুধু আইটি শিক্ষা দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয়।
দেরিতে হলেও শিক্ষা কমিশন হোক আজই
আমার খুব দুঃখ লাগে, এক বছরেও সরকার একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করল না! শিক্ষা খাতের কি তাহলে সংস্কার দরকার নেই? শিক্ষা নিয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি আনার জন্য আমাদের দরকার একটি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক, স্বাধীন ও পেশাগতভাবে দক্ষ শিক্ষা কমিশন।
একমাত্র এই কমিশনই পারবে সমন্বিতভাবে বাংলা মাধ্যম, ইংলিশ মিডিয়াম, মাদ্রাসা শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষাকে এক ছাতার নিচে এনে কার্যকর দর্শন দাঁড় করাতে।
অতীতে আমাদের দেশে অনেক শিক্ষা কমিশন গঠন হলেও, সেগুলোর প্রতিবেদন বাস্তবায়ন করা হয়নি। কারণ, শিক্ষার নিয়ন্ত্রণ থাকে মন্ত্রণালয়ের হাতে, যা রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিচালিত হয়। এটি বন্ধ করা দরকার। শিক্ষা কমিশনের সুপারিশ হতে হবে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক।
বর্তমান সরকার বলছে, তাদের কোনো রাজনৈতিক উচ্চাশা নেই। তবে এটিই তো সুযোগ! অন্তত একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করে, শিক্ষায় গুণগত বরাদ্দ নিশ্চিতের মাধ্যমে শিক্ষকদের মানোন্নয়ন ও গবেষণাকে প্রাধান্য দিয়ে তারা ইতিহাসে জায়গা করে নিক।
একটি দেশকে দীর্ঘ মেয়াদে উন্নত করতে হলে প্রথম কাজ হবে শিক্ষায় বিপ্লব। কোনো বিপ্লবই সম্ভব নয়, যদি আমরা শিক্ষক, পাঠ্যক্রম ও গবেষণাকে পেছনে ফেলে শুধু একের পর এক ভবন বানিয়ে যাই। তাই দেরি হলেও, শিক্ষা কমিশন হতে হবে আজই।
ভবন নয়, দর্শন চাই
বিগত সরকারের আমলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় না চাইলেও, সেখানে উন্নয়নে এক হাজার ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের গাছ কেটে, জলাভূমি-খাল সব ভরাট করে উঠতে থাকল ভবন। মুনাফা হলো ঠিকাদারের, শিক্ষার কী লাভ হলো জানি না!
চাহিদা ও পরিকল্পনা ছাড়া ঢালাওভাবে ভবন নির্মাণ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় মানে শুধু ভবন নয়, এটি হলো চিন্তার কৌটায় আলো জ্বালানো। এটা হতে হবে শতবছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যানে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সকালে ঘুম থেকে উঠে শুনতাম– আজ একটি নতুন বিভাগ খোলা হয়েছে। কোনো চিন্তাভাবনা ছাড়াই এসব হতো। অথচ একটি বিভাগ খোলার আগে বিশদ যাচাই দরকার– দেশের প্রয়োজন, শিক্ষার্থীদের আগ্রহ, পেশার চাহিদা, অবকাঠামো ইত্যাদি বিবেচনায়। এসব উদ্ভট কর্মকাণ্ড পরিহার করতে হবে।
সব শেষে বলব, নেভার টু লেট টু ফর্ম এডুকেশন কমিশন। নেভার টু লেট। কারণ, অন্তর্বর্তী সরকার করলে একটি অরাজনৈতিক ভালো শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে শিক্ষা কমিশন হবে। তারা এটি করে গেলে, কাজ চলতে থাকবে। সময় লাগে লাগুক, দীর্ঘ সময় নিয়ে ভেবেচিন্তে তারা একটি প্রতিবেদন দিক, যা সত্যিই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উপকারে আসবে।
- বিষয় :
- শিক্ষা
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- শিক্ষা কার্যক্রম
