গবেষণা
কচ্ছপের নীরোগ দীর্ঘ জীবনের রহস্য কী
কচ্ছপের শরীরে কোষ বেশি থাকলেও প্রাণীটির রয়েছে ক্যান্সার প্রতিরোধী শক্তি -সংগৃহীত
আবদুস সামাদ আজাদ
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৫১
শতাব্দীর পর শতাব্দী কচ্ছপের দীর্ঘ আয়ুর বিষয়টি মানুষকে অবাক করেছে। নতুন গবেষণায় আরও একটি চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। তা হলো, কচ্ছপের শরীরে ক্যান্সার রোগটি অত্যন্ত বিরল। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই প্রাণীর দেহ নিয়ে মানবদেহে ক্যান্সার প্রতিরোধের ব্যাপারে গবেষণা হতে পারে, যা আশার আলো দেখাবে। গবেষণাটি বায়োসায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. ইলেনিয়া চিয়ারির নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, মাত্র ১ শতাংশ কচ্ছপের দেহে ক্যান্সার রোগটি বাসা বাঁধে। স্তন্যপায়ী প্রাণী বা পাখির তুলনায় এই হার অনেক কম।
গবেষক দলটি যুক্তরাজ্যের চেস্টার চিড়িয়াখানাসহ ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের চিড়িয়াখানাগুলোর প্রাণীদের কয়েক দশকের স্বাস্থ্য রেকর্ড বিশ্লেষণ করেছে। এতে তারা জানতে পারেন, মানুষের ক্যান্সার প্রতিরোধ বা রোগটির বিরুদ্ধে লড়াই করার নতুন উপায় শিখতে সাহায্য করতে পারে কচ্ছপ।
বিশেষজ্ঞরা শত শত চিড়িয়াখানার কচ্ছপের নেক্রোপসি রেকর্ড (মৃত্যুর কারণ) পর্যালোচনা করেছেন। তাতে শূন্য দশমিক ৩৪ শতাংশ কচ্ছপের অস্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি দেখা গেছে। ক্যান্সারের তথ্য আরও বিরল ছিল। কচ্ছপের শরীরে পাওয়া বেশির ভাগ ক্যান্সার খুবই কম ছড়ায়। আক্রান্ত জায়গা থেকে অন্যান্য অঙ্গে ছড়ানোর কোনো স্পষ্ট চিত্র মেলেনি। স্তন্যপায়ী প্রাণীতে ক্যান্সারের হার গড়ে ১০ শতাংশ। পাখিদের হার প্রায় ৩ শতাংশ। বিপরীতে কচ্ছপের ক্যান্সারের হার ধারাবাহিকভাবে ১ শতাংশের নিচে।
কচ্ছপের বিপাক ক্রিয়া ধীর এবং রোগসৃষ্ট দুর্বলতার বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকে। এই বৈশিষ্ট্যগুলো সময়ের সঙ্গে কোষের ক্ষতি কমায়। জিনোমিক গবেষণায় দেখা যায়, বিশেষ করে বড় জাতের গ্যালাপাগোস ও অ্যালডাব্রা কচ্ছপের অনন্য বংশগতিগত পরিব্যক্তি (মিউটেশন) রয়েছে। এই মিউটেশনগুলো টিউমার দমন ক্ষমতাকে উন্নত করে এবং ডিএনএর স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
গ্যালাপাগোস জাতের কচ্ছপের কোষের ওপর কার্যকর পরীক্ষায় দেখা যায়, কোষের মৃত্যুকে প্রাথমিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রয়েছে তাদের, যা ক্ষতিগ্রস্ত কোষগুলোকে ক্যান্সারে পরিণত হতে বাধা দেয়। চাপের মধ্যেও কচ্ছপগুলো শক্তিশালী জারণরোধক (অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট) প্রতিক্রিয়া দেখাতে সক্ষম। কচ্ছপের কম বিপাকীয় হার দেহে ক্ষতিকারক উপজাত জমা করতে বাধা দেয়। এটিই তাদের শক্তিশালী ক্যান্সার প্রতিরোধের মূল কারণ।
কচ্ছপ সাধারণ জৈবিক ধরনকে চ্যালেঞ্জ করে থাকে। বেশি কোষের অধিকারী বৃহৎ ও দীর্ঘজীবী প্রজাতির এই প্রাণীর মধ্যে ক্যান্সারের ঝুঁকি বেশি থাকার কথা।
এরপরও ক্যান্সার হয় না। গ্যালাপাগোস ও অ্যালডাব্রা কচ্ছপের ওজন ৬৬০ পাউন্ডেরও বেশি হয়। অবশ্য কিছু লেদারব্যাক সামুদ্রিক কচ্ছপ ১১০০ পাউন্ডেরও বেশি ওজনের হতে পারে। তবুও তাদের ক্যান্সারের হার অত্যন্ত কম।
ড. চিয়ারি উল্লেখ করেন, দৈত্যাকার গ্যালাপাগোস ও অ্যালডাব্রা জাতের কচ্ছপ দীর্ঘ জীবন পায় এবং এরা বিশাল আকারের জন্য বিখ্যাত। এরপরও তাদের মধ্যে ক্যান্সার অবিশ্বাস্যভাবে বিরল।
বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার প্রধান লেখক ড. স্কট গ্ল্যাবারম্যানের মতে, দৈত্যাকার কচ্ছপের জীবনপ্রণালি থেকে মানুষের জীবনের অনেক সমস্যার সমাধান পাওয়া গেছে। বিশেষ করে বার্ধক্য ও ক্যান্সার সম্পর্কিত গবেষণা আশা জাগিয়েছে। এই গবেষণা জীববৈচিত্র্যকে দ্বিগুণ সুরক্ষা দিতে সহায়ক হয়েছে।
- বিষয় :
- কচ্ছপ
