ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

উদ্ভিদ

শঙ্খপুষ্প নাম তার

শঙ্খপুষ্প নাম তার
×

রমনা উদ্যানে দেখা শঙ্খপুষ্প ফুল- লেখক

মৃত্যুঞ্জয় রায়

প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৫ | ০১:১১ | আপডেট: ১৩ আগস্ট ২০২৫ | ০৯:৩৫

একটা গাছের ডালের আগা থেকে কয়েকটা পুষ্পমঞ্জরি ঝর্ণার মতো নেমে এসেছে। প্রায় সব মঞ্জরির ফুল ফুটে ঝরে গেছে। কয়েকটা মঞ্জরিদণ্ডের একেবারে ডগার দিকে জোড়ায় জোড়ায় কয়েকটা ফুল ফুটে রয়েছে। এই অল্প কয়েকটা ফুলই মনে হলো এ বছরের মতো ও গাছ দুটোর শেষ ফুল। কয়েক দিন পরে গেলে আর এ ফুলের দেখা পেতাম না। ফুলগুলোর উজ্জ্বল বেগুনি রং মনকাড়া, শাওন বাতাসে লম্বা শীষের মতো ছড়ায় দোল খাচ্ছে। স্থির না হলে ছবি তোলাও মুশকিল। এমন ফুল আগেও দেখেছি, কিন্তু এমন ডালপালা ছড়ানো ঝোপালো গাছে দেখিনি। ফুলগুলো অপরাজিতা ফুলের মতো। কাছে গিয়ে ফুলের দুলুনিটা থামানোর চেষ্টা করলাম। আলতো করে করপুটে তুলে ইচ্ছা করল, এবার থামো তো বাপু, তোমার চেহারাটা একটু ভালো করে দেখে নিই। আরও কাছে টেনে ফুলজোড়াকে নাকের কাছে নিয়ে এলাম। বাহ্! কী সুন্দর মিষ্টি ঘ্রাণ! শ্রাবণের মেঘমাখা সকালটা যেন অন্য রকম হয়ে গেল!

রমনা উদ্যানে মসজিদের পেছন দিকে একটা সরু পথ চলে গেছে সীমানাপ্রাচীরের কোল দিয়ে। রাস্তার পাশে মাঠের মাটি নরম, বর্ষাভেজা, ঘন ঘাসে আচ্ছন্ন। তার মধ্যে দুই সখির মতো দাঁড়িয়ে আছে দুটো অচিন গাছ। সেসব ঘাসের মধ্য দিয়েই পা চালিয়ে কাছে চলে গেলাম। অনেক ছবি তুলে বাসায় ফিরে এলাম। বইপত্র আর ইন্টারনেট ঘাঁটতে ঘাঁটতে শেষে ইন্টারনেটেই ওর পরিচয় পেলাম। আমাদের দেশের কোনো বইয়ে এ গাছের উল্লেখ পেলাম না।

গাছটি কাষ্ঠল লতানে গুল্ম প্রকৃতির, সাধারণত পাহাড়ি অরণ্যে জন্মে। এ জন্য এ গাছের এক ইংরেজি নাম Mountain clitoria, অন্য নাম Butterfly Pea Tree। দেখতে অবিকল অপরাজিতা। সে জন্য অপরাজিতা এবং এই ফুলের গুণগত নাম একই– Clitoria। 

এ গণের একটি মাত্র প্রজাতি এ দেশে আছে বলে জানতাম। কিন্তু রমনা উদ্যানে গিয়ে তার এই দোসরকে পেলাম। সে গাছের উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Clitorea arborea। খুঁজতে খুঁজতে ভারতীয় বাংলা নাম পেলাম শঙ্খপুষ্প। ফুলের আদল খানিকটা শঙ্খের মতো। এ জন্যই হয়তো এমন নাম। অপরাজিতা গাছের উদ্ভিদতাত্তিক নাম Clitorea ternatea, অর্থাৎ তারা নিকটাত্মীয় গাছ। দুটি গাছই ফ্যাবেসি গোত্রের। কিন্তু দুটি গাছের মধ্যে পার্থক্য অনেক। 

শঙ্খপুষ্প গাছ ছোট গুল্ম প্রকৃতির, গাছ প্রায় ছয় মিটার লম্বা হয়। অপরাজিতা ও শঙ্খপুষ্প গাছের পাতা যৌগিক ও ত্রিপত্রক, অর্থাৎ একটি পাতার বোঁটার দুপাশে দুটি ও শীর্ষে একটি পত্রক থাকে। কিন্তু দুটি উদ্ভিদের পাতার আকার-আকৃতির পার্থক্য রয়েছে। অপরাজিতা গাছের পাতা কোমল, পাতলা, উজ্জ্বল সবুজ, অগ্রভাগ ভোঁতা ও ছোট। অন্যদিকে শঙ্খপুষ্প গাছের পাতা বড়, উপবৃত্তাকার, অগ্রভাগ সুচালো বা তীক্ষ্ণ, চর্মবৎ, মসৃণ ও সবুজ। শঙ্খপুষ্প গাছের কচি পাতা কোমল ও তাম্রবর্ণ। 

অপরাজিতা ও শঙ্খপুষ্প ফুলের গড়ন প্রায় একই রকম হলেও আকারে শঙ্খপুষ্প ফুল অপরাজিতার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বড়। অপরাজিতা ফুলের রং নীল, আকাশি-সাদা, সাদা, গোলাপি রঙের। শঙ্খপুষ্প ফুলের রং ঘন বেগুনি ও চমৎকার ঘ্রাণযুক্ত। অপরাজিতা ফুল বেশি ফোটে শরৎকালে, শঙ্খপুষ্প ফুল ফোটে জুন থেকে জুলাই মাসে। জানি না, অপরাজিতার মতো শঙ্খপুষ্পেরও আর কোনো রঙের ফুল আছে কিনা। গাছটি মূলত ব্রাজিল, বলিভিয়া ও পেরুর দেশীয় গাছ। তবে এ দেশের উদ্ভিদ তালিকায় একে যোগ করা যায়। শাখা কলম করে শঙ্খপুষ্প গাছের চারা তৈরি করা যায়।

আরও পড়ুন

×